সবাই চায় এমন হাসি, যে হাসি হবে উত্তম কুমারের মতো ভুবন ভোলানো বা সুচিত্রার মতো বিস্ময় জাগানো! চিকিত্সকরা বলছেন পুরোটা না হলেও অনেকটাই করা সম্ভব কেকটা উপায় মানতে পারলে! কী কী সেই উপায়? জানাচ্ছেন রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানের দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সপ্তর্ষি দত্ত।
সকলেই চান মুক্তোর মতো দাঁত আর ম্যাজিকের মতো হাসি। তবে দেখা যায় ধূমপান, গুটকা সেবন, মিষ্টি খাওয়ার অভ্যেস, সঠিকভাবে ব্রাশ না করার ফলে দাঁত হলুদ বা কালো আকার ধারণ করে। দাঁতে পাথর জমে। হাসলেই দেখতে খারাপ লাগে। আবার জন্মগতভাবে অনেকের দাঁত আঁকাবাঁকা হতে পারে। অনেকের উপরের চোয়ালের তুলনায় নীচের চোয়াল বাইরের দিকে বেরিয়ে থাকে। এমন সমস্যারও সমাধান করা যায়।
একজন ব্যক্তির হাসি সুন্দর করে তোলার পদ্ধতিকে বলে স্মাইল ডিজাইন। একাধিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে স্মাইল ডিজাইন করা যায়।
অ্যালাইনার: এবড়োখেবড়ো দাঁত সুন্দর করে গড়ে তোলা যেতে পারে দু’ভাবে। একটি হচ্ছে ব্রেস দ্বারা, যার আগে খুব প্রচলন ছিল।
এখন ব্রেসের মতো একই কাজ করা সম্ভব হচ্ছে অ্যালাইনারের মাধ্যমে এবং আরও ভালোভাবে। এই নতুন ধরনের অ্যালাইনার সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। ফলে কেউ অ্যালাইনার পরে থাকলে বাইরে থেকে দেখে বোঝাও যায় না রোগী দাঁতে কিছু পরে আছেন।
অ্যালাইনার খোলার জন্য চিকিত্সকের সাহায্যের প্রয়োজন হয় না। রোগী নিজে খুলতে বা পরতে পারেন। চিকিত্সকের সাহায্যেরও প্রয়োজন হয় না। তবে রোগীকে অ্যালাইনার দেওয়ার পাশাপাশি দাঁতের কিছু পরিবর্তন করার দরকার পড়ে। একে ইন্টারপ্রক্সিমাল রিডাকশন বলে।
এই সমগ্র পদ্ধতিটি করা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল টেকনোলজি দ্বারা। তাই প্রসিডিওর করার আগেই রোগীকে দেখিয়ে দেওয়া যায় যে তাঁকে ঠিক কেমন দেখতে লাগবে। এই কারণে অ্যালাইনারের গ্রহণযোগ্যতা এখন অনেক বেশি!
টুথ হোয়াটেনিং: যাঁরা প্রচুর ধূমপান করেন, গুটকা খান, তাঁদের দাঁতের রং সম্পূ্র্ণ কালো বা হলুদ হয়ে যায়। এমনকী নেশা ছেড়ে দেওয়ার পরও দাঁতের রং-এর পরিবর্তন হয় না। এমন ক্ষেত্রে দাঁতের রং পরিবর্তন করে দেওয়া যায়। দাঁত সাদা করারও কতগুলি পদ্ধতি আছে।
দাঁতে খুব বেশি স্টেইন বা ছোপ পড়লে আসল দাঁতকে সামান্য একটু রিডাকশন করে ল্যামিনেশন বা ভিনিয়ার করে স্মাইল ডিজাইন করা যায়। সেক্ষেত্রে দাঁত ঝকঝকে হয়ে যায়।
ব্লিচিং: ব্লিচিং-এর মাধ্যমে দাঁতের একটা বা দুটো শেড হোয়াইট করে দেওয়া যায়।
ইমপ্লান্ট ও ক্রাউন: দু্র্ঘটনার কারণে দাঁত পড়ে গিয়েছে বা সামনের দাঁত ভেঙে গিয়েছে এমন ঘটনা আকছার দেখা যায়! হাসলে রোগীকে দেখতে অত্যন্ত খারাপ লাগে।
সেক্ষেত্রে রোগীকে দাঁত তুলেও ফেলতে হয় অনেকক্ষেত্রে। দাঁত তুলে ফেলতে বাধ্যও হন বহু রোগী। এমন অবস্থায় দাঁত তোলা অংশে ইমপ্লান্ট বসিয়ে তার উপরে ক্রাউন করে স্মাইল ডিজাইন করা হয়।
লেজার: অনেকের হাসার সময় মাড়ি বেড়িয়ে আসে। দেখতে খারাপ লাগে। সেক্ষেত্রে লেজার দিয়ে গামি স্মাইলের কারেকশন করা সম্ভব। প্রসিডিওর শেষ হলে হাসি সত্যিই দেখতে সুন্দর হয়ে যায়।
কসমেটিক লাইট কিওর কম্পোজিট: ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে দাঁতের কোণ ভেঙে যাওয়া বা হঠাত্ করে দাঁতের একটা অংশ ভেঙে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে কসমেটিক লাইট কিওর কম্পোজিট করে দাঁতের ওই ত্রুটি সংশোধন করা যায়। দাঁতের সঠিক আকারও ফিরে আসে। মাত্র আধঘণ্টার চিকিত্সায় কাজ হয়ে যায়।
স্কেলিং: নিয়মিত স্কেলিং করা উচিত। দাঁতের স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি বিষয় হল স্কেলিং।
অনেকেরই ধারণা স্কেলিং করলে দাঁত নড়ে যায়, ক্ষয়ে যায়, ফাঁকা হয়ে যায়। তা একেবারেই নয়। স্কেলিং করলে দাঁত ফাঁকাও হবে না, নড়েও যাবে না। স্কেলিং করালে দাঁত ভালো থাকে। মুখে গন্ধ হয় না। দাঁত ঝকঝকে থাকে, দাঁতে পাথর জমে না।
নড়বড়ে দাঁত: অনেকের দাঁত নড়বড়ে হয়। দাঁতে ফাঁক তৈরি হয়। হাসলে দেখতে খারাপ লাগে। বোন গ্রাফ্টিং করে দাঁতের অবস্থান শক্ত করা যায়। তবে এই সার্জারির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সার্জারি করে ফার্স্ট ডিগ্রি মোবিলিটিকে সঠিক করা যায়। তবে সেকেন্ড ডিগ্রি, থার্ড ডিগ্রি মোবিলিটি হলে সেই মোবিলিটির কারেকশন করা জটিল হয়ে পড়ে।
সেকেন্ড ডিগ্রি মোবিলিটিকে তাও ডেন্টাল স্প্লিন্ট করে দাঁতের নড়াচড়া বন্ধ করা যেতে পারে। তবে থার্ড ডিগ্রি মোবিলিটি হয়ে গেলে তখন দাঁত তুলে ফেলাই বাঞ্ছনীয়। এরপর ইমপ্লান্ট করে মুখের গঠন ঠিক করা যায়।
রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট বা আরসিটি: চলতি ভাষায় দাঁতে পোকা লাগা বলে একটা কথা আছে। আসলে তো তা নয়, সমস্যাটির নাম কেরিজ। দাঁতের এই ক্ষয় অনেকখানি হওয়ার পর মাড়ি পর্যন্ত সংক্রমণ চলে যায় ও একসময় রোগীর প্রবল ব্যথা শুরু হয়। তারপর রোগী ডেন্টিস্ট-এর কাছে যান। এরপর চিকিত্সক যদি দেখেন, দাঁত ভালো আছে তাহলে খারাপ দাঁতের গোড়ায় মাড়ির ভিতরে থাকা নার্ভগুলিকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয় বা পাল্প বাদ দিয়ে ড্রেসিং করা হয়। এরপর দাঁতের ক্ষয়ের অংশে গাটা পার্চা বলে এক ধরনের উপাদান দিয়ে তার উপর ফিলিং করিয়ে ক্রাউন বসিয়ে দেওয়া হয়।
তবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে দাঁতের ক্ষয় এতখানিই বেশি হয় যে দাঁত তুলে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
এখন তুলে দিলেই মাড়িতে ওই অংশটা ফাঁকা হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ওই ফাঁকা অংশের দুই পাশের দাঁতকে একটু ট্রিটমেন্ট করে ওই দুটি দাঁতের সহায়তায় মাঝখানে দাঁত বসানো হয়। ব্যাপারটা অনেকটা হাওড়া ব্রিজের নিজের অবস্থানে অটুট থাকার মতোই ব্যবস্থা।
নদীর দুই প্রান্তে খুঁটির সহায়তায় ব্রিজ যেমন দাঁড়িয়ে থাকে তেমনই মাড়ির ফাঁকা অংশের দুপাশের দাঁতের সহায়তায় ব্রিজের দাঁতটি থাকে।
ব্রিজের একটাই সমস্যা, তা হল পাশের দুটি দাঁতকে ছোট করে দেওয়া হয়। তাই অনেকই চান না এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে।
তখনই চলে আসে ইমপ্লান্টের ব্যাপারটা।
ইমপ্লান্টে পাশের দাঁতকে স্পর্শ করা হয় না। সেক্ষেত্রে টাইটেনিয়াম ধাতুর স্ক্রু-এর সাহায্যে ইমপ্লান্ট বসানো যায়। তার উপর ক্রাউন বসানো হয়। তাতেই কাজ হয়।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক