কেন কার কোন অসুখ হবে তার নির্দেশ থাকে জিনে। জিন তৈরি হয় প্রোটিন দিয়ে। আর প্রোটিন সঠিকভাবে ভাঁজ না হলে প্রাণের উদ্ভই ঘটবে না! অবাক লাগছে? বিখ্যাত মলিকিউলার বায়োলজিস্ট সাইরাস ল্যাভিন্থালের গবেষণাই ছিল জিন এবং প্রোটিন নিয়ে। তাঁর দেখানো পথেই মানবজীবনের রহস্য উন্মোচন করেন বিজ্ঞানীরা। লিখেছেন অভিজিৎ দাস।
১৯৬৯ সাল। মানবদেহের প্রোটিন নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত এক আমেরিকান মলিকিউলার বায়োলজিস্ট। নাম সাইরাস ল্যাভিন্থাল। তাঁর হুঁশ উড়িয়ে দিল মানবদেহে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লেষণের এক প্রক্রিয়া। প্রোটিন ফোল্ডিং। সহজ কথায় বললে, প্রোটিন হল ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অব লাইফ’ বা ‘জীবনের ভাষা’। মা-বাবার কাছ থেকে আমরা যে ডিএনএ পাই, সেগুলিতে নির্দিষ্ট কোড সেট করা থাকে। এই কোডগুলো রূপান্তরিত হয় আরএনএ-তে। আর সেই আরএনএ গুলি নির্দিষ্ট কিছু অ্যামাইনো অ্যাসিডের রূপান্তর। অনেকগুলি অ্যামাইনো অ্যাসিড মালার মতো একসঙ্গে হয়ে তৈরি করে প্রোটিন। সেই প্রোটিন আমাদের শরীরে এক্সপ্রেশন ঘটিয়ে আমাদের একেকটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। যেমন, বাবা-মায়ের চুলের রং নির্ধারণ করে সন্তানের চুলের বর্ণ কেমন হবে। সন্তানের চুলের বর্ণ নির্ধারণের এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নির্দেশ সেট করা থাকে ডিএনএ-তে। শিশু তার মা-বাবার কাছ থেকে বংশানুক্রমে তা অর্জন করে। আর হ্যাঁ, কোনও প্রোটিনকে সক্রিয় হতে হলে তাকে নিশ্চিতভাবেই একটি নির্দিষ্ট আকার ও আয়তনে প্যাঁচানো (ফোল্ডিং) থাকতে হবে। দীর্ঘ গবেষণায় এই সবটার উপর আলোকপাত করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন বিজ্ঞানী।
ল্যাভিন্থালের জন্ম ১৯২২ সালের ২ মে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথমে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ও পরে পিএইচডি করেন। এরপর মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো শুরু করেন। সাত বছর পর ১৯৫৭ সালে যোগ দেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি)। ১৯৬৮ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত করা হয় ল্যাভিন্থালকে। ১৯৬৯ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য চালু হওয়া বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক হন তিনি। ১৯৯০ সালের ৪ নভেম্বর ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ল্যাভিন্থালের। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন তিনি। এমআইটিতে থাকাকালীন ল্যাভিন্থাল ডিএনএ প্রতিলিপির প্রক্রিয়া, জিন ও প্রোটিনের মধ্যে সম্পর্ক এবং মেসেঞ্জার আরএনএ-এর প্রকৃতি সম্পর্কিত আণবিক জেনেটিক্সে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার করেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তিনি কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক ইমেজিং তৈরি করেছিলেন। তাঁকে প্রোটিন গঠনের কম্পিউটার গ্রাফিক্যাল ডিসপ্লের জনক বলা হয়।
ফিরে দেখা যাক ল্যাভিন্থালের গবেষণা। তিনি লক্ষ্য করেন, মানবদেহে উপস্থিত প্রোটিন অনেকগুলো অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি। সেখান থেকে শুধুমাত্র ১০০ অ্যামাইনো অ্যাসিডের একটি চেন নেওয়া হলে, তা দিয়ে অসংখ্য (প্রায় ৩১০০) প্যাঁচানো গঠন বা ফোল্ডেড স্ট্রাকচার বানানো সম্ভব। আশ্চর্যের বিষয়, এত বিশাল সংখ্যার মধ্যে শুধুমাত্র একটি স্ট্রাকচারই গ্রহণযোগ্য। বাকিগুলির দরকার নেই। কিন্তু এত ভিন্ন সংখ্যক ফোল্ডিংয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেহ সবকিছু পরখ করে মিলি সেকেন্ডের মধ্যেই সঠিক কাজটা করে ফেলে। দেহে কত দ্রুত ফোল্ডিং হয় প্রোটিন? বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত গতির রাসায়নিক বিক্রিয়া হচ্ছে জলে হাইড্রোনিয়াম আয়ন গঠনের প্রক্রিয়া। যদি সেই গতিতেও প্রোটিন ফোল্ডিং সম্পন্ন হতো, তাতেও শরীরের সব প্রোটিন ফোল্ড করতে ১০২৭ বছর লেগে যেত। এই ‘প্যারাডক্স’ ব্যাখ্যার জন্য ল্যাভিন্থালের কাছে একটি মাত্র রাস্তাই খোলা ছিল। তা হল, প্রোটিন কীভাবে নিজের সঠিক আকৃতিকে বাছাই করে নেয়। সেজন্য ল্যাভিন্থাল শুরু করলেন জিন নিয়ে গবেষণা। বলে রাখা ভালো, ডিএনএ-র পুরো অংশটুকুই কার্যক্ষম নয়। যে অংশ নির্দিষ্ট বার্তা বহন করে, সেটুকু অংশই হল জিন। এই জিনগুলোই প্রোটিনে রূপান্তরিত হয়। মজার বিষয়, পুরো ডিএনএ’র মাত্র ১ শতাংশ জিন। তাই জিনকে বোঝার অর্থ প্রোটিনকে বোঝা। ডিএনএ-কে তুলনা করা যায় এক প্রকার রেসিপি বইয়ের সঙ্গে। প্রোটিনের কাঠামো কেমন হবে, তার নির্দেশ থাকে জিনে। এখানেই আসল রহস্য। ল্যাভিন্থাল তাঁর জীবদ্দশায় এই রহস্যের কিনারা করতে পারেননি। জটিল এই সমস্যা সমাধানের জন্যই পৃথিবীর তাবড় বিজ্ঞানীকে একত্রিত হতে হয়। ল্যাভিন্থালের দেখানো পথেই চলে দীর্ঘ ১৩ বছরের কঠোর পরিশ্রম। ‘হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট’-দেখে আশার আলো। অর্থাৎ, হোমো স্যাপিয়েন্সদের পুরো ডিএনএ সিকোয়েন্স সম্পন্ন করেছিলেন গবেষকরা। কোন প্রোটিনের জন্য দায়ী কোন জিন, সেটাও তাঁরা জানতে পারলেন। কিন্তু প্রোটিন ফোল্ডিং সঠিকভাবে না হলে তাকে বলে মিসফোল্ডেড প্রোটিন। আর এই মিসফোল্ডেড প্রোটিনই নানা ধরনের জিনগঠিত অসুখের জন্য দায়ী। প্রোটিন মিসফোল্ডিংয়ের কারণে সৃষ্ট পারকিনসনস ও অ্যালঝাইমার্স রোগ নিয়ে চর্চা দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে এসেছে। তবে, এগুলি প্রতিরোধের কোনও পদ্ধতি আবিষ্কার করা যায়নি। সেটা ১৯৯৪ সাল। ল্যাভিন্থালের মৃত্যুর পর কেটে গিয়েছে চার বছর। তাঁর গবেষণাকে বিশদভাবে পর্যবেক্ষণের পর জন মোল্ট তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ‘সিএএসপি’ (ক্রিটিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট অব প্রোটিন স্ট্রাকচার প্রেডিকশন) নামে একটি কর্মসূচি চালু করেন। উদ্দেশ্য ছিল, কোনও প্রোটিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা। এবং সেই সঙ্গেই ওই প্রোটিনের ফোল্ডিং সম্পর্কে প্রেডিকশন বা ভবিষ্যদ্বাণী করা। ডিপমাইন্ড নামে এক টেক কোম্পানি ‘আলফাফোল্ড’ নামের এক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কর্মসূচি নিয়ে তাতে অংশ নেয়। কিন্তু প্রোটিন ফোল্ডিংয়ের প্রক্রিয়া এতটাই জটিল, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সও সেই সময় ৩০ শতাংশের বেশি সঠিক প্রেডিকশন করতে পারেনি। মূলত এই ‘সিএএসপি’ প্রতিযোগিতাটির আয়োজন করা হয়েছিল একটি ফাংশনাল প্রোটিনের ফোল্ডিং প্রেডিক্ট করার জন্য। এর দু’টি অংশ ছিল। প্রথমটি প্রেডিকশন স্টেজ। সেখানে প্রতিযোগীরা অ্যামাইনো অ্যাসিড সিকোয়েন্সের ফাংশনাল ফোল্ডেড স্ট্রাকচার প্রেডিক্ট করবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রেডিক্টেড প্রোটিনের অ্যাকুরেসি টেস্ট করা হবে। এভাবে প্রায় ২০ বছরে একটা প্রোটিনের ফোল্ডিংকেও ৬০ শতাংশের বেশি প্রেডিক্ট করা যায়নি।
২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘সিএএসপি -১৪’ প্রতিযোগিতাতে ‘আলফাফোল্ড’ ৯০ শতাংশ অ্যাকুরেসি অর্জন করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই ওই ঘটনা ছিল প্রোটিন ফোল্ডিং প্রেডিকশনের এক মাইল ফলক। এখনও পর্যন্ত সিএএসপি সিএএসপি-এর সর্বোচ্চ অ্যাকুরেসির রেকর্ড ৯২.৪ শতাংশ। জিন থেকে প্রোটিন হওয়ার প্রক্রিয়া যেমন জটিল, এর চেয়ে অধিক জটিল হল প্রোটিন ফোল্ডিং হওয়াটা। প্রতিটি প্রোটিনের মাঝে আলফা হেলিক্স, বিটা শিট নামে দুটি চেন রয়েছে। এরা আরও প্যাঁচিয়ে বানায় সেকেন্ডারি, টার্শিয়ারি, কোয়ার্টেনারি স্ট্রাকচার। প্রোটিন ফোল্ডিংয়ের মাত্রা যত বেশি, সেটা তত বেশি স্থিতিশীল। আবার প্রোটিন কার্যক্ষম হওয়ার জন্যও তাকে ফোল্ডিং হতে হয়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ, আমাদের রক্তে থাকা হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনের যদি জটিল কোয়ার্টেনারি স্ট্রাকচার না থাকত, তবে মানবদেহে রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন পরিবহণই সম্ভব হত না। থাকত না মনুষ্যজাতির অস্তিত্ব। আবার সরল ভাইরাসের গঠন শুধুমাত্র ডিএনএ ও আরএনএ দিয়ে তৈরি।
ভাইরাসের ডিএনএ, আরএনএ-ও প্রোটিন দ্বারাই সুরক্ষিত থাকে। এই সুরক্ষা প্রোটিনকে ক্যাপসিড বলা হয়। ল্যাভিন্থালের প্যারাডক্স অনুসারে, যদি ১০০ অ্যামাইনো অ্যাসিডযুক্ত একটি সরল সিকুয়েন্সওয়ালা প্রোটিন নেওয়া হয়, তা দিয়ে ওই ক্যাপসিড প্রোটিন তৈরির সম্ভাবনা খুবই কম। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রত্যেকটি অ্যামাইনো অ্যাসিড শুধুমাত্র তিনটি অবস্থায় থাকতে পারে।
এই ১০০ অ্যামাইনো অ্যাসিডের চেইন থেকে তাহলে ৩১০০ ফোল্ডেড স্ট্রাকচার তৈরি হওয়া সম্ভব। সেটি থেকে শুধুমাত্র একটি স্ট্রাকচারই ফাংশনাল হবে। আর এই যুক্তিকে যদি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন রুবিস্কোর ক্ষেত্রে খাটানো হয়, সেক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ লক্ষ করা যায়। রুবিস্কো এনজাইম হল উদ্ভিদে পাওয়া সবচেয়ে পরিচিত এক প্রোটিন। এই প্রোটিন না থাকলে উদ্ভিদ কখনওই গ্লুকোজ তৈরি করতে পারত না। কারণ এটি সালোকসংশ্লেষণে সাহায্য করে। খাদ্য শৃঙ্খলের ডমিনো এফেক্ট বলে, রুবিস্কো না থাকলে উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি করতে পারবে না। উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি না করলে মানুষের মতো জটিল ডিএনএ, আরএনএ ভিত্তিক জীবের অস্তিত্বও সম্ভব নয়। রুবিস্কো প্রোটিনে অ্যামাইনো অ্যাসিডের সংখ্যা ৪৭০টি। ল্যাভিন্থাল প্যারাডক্সের হিসেবে, রুবিস্কোর ৩৪৭০ টি সিকোয়েন্স সম্ভব। আধুনিক বিবর্তন তত্ত্ব অনুসারে, পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি ও এমন জটিল বিবর্তন সম্ভব হয়েছে ভাগ্যক্রমে, বহুতর জটিল পর্ব পেরিয়ে। এর মধ্যে একটা পর্ব সঠিকভাবে সম্পন্ন না হলে জীবজগত্ এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত না।