রাহুল চক্রবর্তী, কলকাতা: অদ্ভুত এক আলোআঁধারি এ রাস্তায়! মৃদু আলোয় অবশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দৈত্যাকার পাহাড়টাকে। সামনে পাথরের ফটক। তাতে খোদাই করা দেবী মূর্তি। উপরে বসা মহাদেবের বাহন নন্দী। সবটাই নিকষ কালো। কানে আসছে জলস্রোতের ধাক্কা খাওয়ার শব্দ। ফটক পেরতে না পেরতেই থমকে যেতে হল। সামনে দেবী চামুণ্ডা। ভয়াল দর্শন সেই মূর্তি যেন বলির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। পাশেই অঘোরী গণেশ। দেখেই গা ছমছম করে ওঠে। ততক্ষণে নজরে পড়ে যাবে একটু দূরে ডানদিকে আদিযোগী মহাদেব! পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ঝর্ণাধারা। চারপাশে কালো পাথরের গায়ে খোদাই করা দেবনাগরী হরফ, মন্ত্র-শ্লোক। পাশেই কালো পাহাড় খোদাই করে তৈরি মন্দিরে পুজো হচ্ছে দেবী দশভুজার। কুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক পাশে রেখেই। কানে ভেসে আসছে কোনও তান্ত্রিকের জলদমন্দ্র কণ্ঠ... অঘোরী! চলছে শিবতাণ্ডব। গোটা মণ্ডপজুড়ে।
পুজোর বাজারে ব্যস্ত গড়িয়াহাটের অদূরে এই অঘোরী তান্ত্রিকদের ডেরা। রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ধরে সেখানে পৌঁছনোর আগেই বাঁদিকে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে। ত্রিভুজাকৃতি সেই মোড়ে গা ছমছমে পরিবেশে দেবী ‘আরাধনা’য় ত্রিধারা সম্মিলনী। এবার ৭৯তম বর্ষে পা রেখেছে দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম বিগ বাজেটের এই দুর্গাপুজো। নতুন কিছু দেখার তাগিদে তাই তারা উপস্থাপন করছে একেবারে অন্য কিছু। থিমের চাকচিক্যের থেকেও বড়... সৃষ্টির আদিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা। মানবসভ্যতার প্রথম পর্যায়ে পাহাড় কিংবা গুহার মধ্যেই পুজো হতো। কেমন ছিল সেসব দিন, তার রূপায়ণ করেছেন শিল্পী গৌরাঙ্গ কুইলা। ডাক দেওয়া হয়েছে— ‘চলো ফিরি।’
নিকষ কালো পাহাড় এবং গুহার আদলে তৈরি মণ্ডপের আলোআঁধারিতে অঘোরীদের শিবতাণ্ডবই ত্রিধারার মূল আকর্ষণ। ৩২ জন অঘোরী তান্ত্রিক নিজস্ব ছাইমাথা বেশভূষায় হাজির এখানে। চলছে সাধনাও। দেবী দুর্গাও এখানে বৌদ্ধ তন্ত্রের ‘মা তারা’ রূপে আবির্ভূতা। চারপাশে পাহাড়ের কালো পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, শ্লোক, মন্ত্র। ঝুলছে লাল, হলুদ সুতো কিংবা চেলি কাপড় বাঁধা। ঠিক যেভাবে মানত করা হয়। আবার কোথাও পাহাড়ের গায়ে বাঁধা শাখা-পলা। অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যে দিয়ে দর্শনার্থীরা যত এগিয়ে যেতে থাকবেন, ততই তাঁদের সামনে ভেসে উঠবে নানা পৌরাণিক কাহিনি।
গোটা পরিকল্পনাটি শিল্পী গৌরাঙ্গ কুইলার মস্তিষ্কপ্রসূত। কোনও কিছু অনুকরণে নয়, তাঁর ২৫-৩০ জনের টিম পরিবেশের সঙ্গে বিষয়ভাবনাকে মিলিয়ে দিয়েছেন। প্রতিমাও গৌরাঙ্গবাবুর তৈরি। পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস কুমারের বক্তব্য, ‘আমাদের এবারের পরিবেশনা পাহাড়ি পরিবেশে দেবভূমি। ফিরে দেখা। একেবারে আদিম যুগে পৌঁছে যাওয়া।’ পুজো কমিটির মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর গার্গী মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘অনুকরণ নয়, আমরা শিল্পীর নিজস্ব ভাবনায় মন ভালো করা দৃশ্যের উপস্থাপনা করছি।’