শেষরক্ষা হল না! ৬০ আসনের মণিপুর বিধানসভায় বিজেপির বিধায়ক ৩৭ জন। তবু এন বীরেন সিংয়ের উত্তরসূরি হিসেবে গ্রহণযোগ্য একজনকেও খুঁজে পেল না কেন্দ্রের শাসকদল! বাধ্য হয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদে বীরেনের পদত্যাগের চার দিন পর উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে আপাতত মুখরক্ষা করলেন নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা। বীরেনের পদত্যাগের পর যেহেতু রাজ্যপাল বিধানসভা ভেঙে না দিয়ে তাকে ‘জিইয়ে’ রেখেছেন, তাই আইন মেনে আগামী অন্তত ছ’মাস দর কষাকষির মাধ্যমে নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করে সরকারে ফেরার সুযোগ পাবে বিজেপি। হতে পারে, দলে আজ যাঁরা বীরেন বিরোধী বলে সোচ্চার, তাঁদের দুধ-কলা দিয়ে শান্ত করে ফের বীরেনকেই হয়তো মুখ্যমন্ত্রী পদে বসাবেন অমিত শাহরা। ভবিষ্যতে যাই হোক, মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ থেকে রাষ্ট্রপতি শাসন—গত চার দিনের ঘটনা পরম্পরায় এটা পরিষ্কার যে, মণিপুরে সরকার চালাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বিজেপি। শুধু তাই নয়, ব্যর্থ হয়েছে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল থামাতেও। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের সাফল্যের প্রচার যে অন্তঃসারশূন্য তাও প্রমাণিত হয়েছে। গত ২১ মাস ধরে অশান্ত মণিপুরে স্বাভাবিক জীবন ফেরাতে যদি গোড়াতেই এই পদক্ষেপ করতেন মোদি-শাহরা তাহলে হয়তো এই পাহাড়ি রাজ্যে বহু জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা পেত। কিন্তু ইগো আর নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে রাজ্যের শত ক্ষতিতেও কোনও কিছুতেই কর্ণপাত করেননি দিল্লির নেতারা। নেতৃত্বের হাত মাথায় নিয়ে গদি আঁকড়ে পড়েছিলেন বীরেনও। শেষ পর্যন্ত অবশ্য দলের একটা অংশের প্রকাশ্যে বিদ্রোহের চাপে পিছু হটতে হল ‘স্নেহধন্যকে’। যদিও রাষ্ট্রপতি শাসন মানে রাজ্যপালের মাধ্যমে ব-কলমে কেন্দ্রের ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ। ফলে অগ্নিগর্ভ মণিপুর কবে, কীভাবে শান্ত হবে, ফিরবে স্বাভাবিক জীবন—সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন।
Advertisement
রাষ্ট্রপতি শাসন অবশ্য মণিপুরে এই প্রথম নয়। গত ৫৭ বছরে এই রাজ্য ১১ বার রাষ্ট্রপতি শাসনের কবলে থেকেছে। শেষবার ছিল ২০০১ সালের ২ জুন থেকে ২০০২-এর ৬ মার্চ পর্যন্ত। সাধারণ নিয়মে কোনও রাজ্য যদি সংবিধান মেনে সরকার চালাতে ব্যর্থ হয় তখন রাজ্যপালের রিপোর্টের ভিত্তিতে ৩৫৬ ধারায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয় সেই রাজ্যে। মণিপুরেও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এর অর্থ খুব পরিষ্কার। ২০২৩-এর ৩ মে থেকে ২১ মাস ধরে অরাজক অবস্থা চলেছে এই মণিপুরে। এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং-এর দিকে আঙুল উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর নিজের সম্প্রদায়ের হয়ে অন্য সম্প্রদায়কে উস্কেছেন—এমন গুরুতর অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। শুধু বিরোধী নয়, শাসক বিজেপি ও তার সহযোগী দলের একটা বড় অংশও বীরেনের পদত্যাগের দাবিতে বারবার দরবার করেন মোদি-শাহদের কাছে। মণিপুরের ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মাথা হেঁট হয় ভারতের। প্রায় সকলেই বুঝতে পারেন, মণিপুর স্বাভাবিক নেই। সে রাজ্যে জাতি দাঙ্গা থামাতে হলে প্রথম ও প্রধান কাজ হল মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে বীরেন সিংকে সরিয়ে দেওয়া। অদৃষ্টের পরিহাস হল, এতদিন এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়নি গেরুয়া শিবির। পরিস্থিতি প্রায় হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝেও প্রধানমন্ত্রী মোদি ছিলেন নীরব! এরমধ্যে একটি বারের জন্যও মণিপুরে তাঁর পদার্পণ ঘটেনি। অথচ এখন রাষ্ট্রপতি শাসন জারির কারণ হিসেবে সেই বীরেন সিংয়ের নেতৃত্বে চলা সরকারকেই ব্যর্থতার জন্য কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। যা দেখে বিরোধীরা সঙ্গতভাবেই বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত এত পরে নেওয়া হল যখন মণিপুরি সমাজের বাঁধন পুরোপুরি তছনছ হয়ে গিয়েছে।
তবু বলতেই হবে, ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’। বীরেন সিংয়ের পদত্যাগ কিংবা রাষ্ট্রপতি শাসনের যে দাবি ঘরে-বাইরে প্রবলভাবে আছড়ে পড়েছিল, পরিস্থিতির চাপে হলেও তা পূরণ হওয়াটা নিঃসন্দেহে মণিপুরের পক্ষে ইতিবাচক ঘটনা। গত প্রায় দু’বছরের ঘটনায় আড়াইশো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লক্ষাধিক মানুষ এখনও গৃহহীন। বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ ও আহত। এই পরিস্থিতিতে মণিপুরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির দৌরাত্ম্য দমন করতে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাবাহিনী কোনও আনুগত্য ছাড়াই বিনা বাধায় কাজ করতে পারবে বলে আশা করা যায়। এই মুহূর্তে সেই রাজ্যের মানুষের মনে আস্থা ফেরানো, শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ ফেরানোটা বড় কাজ। রাজ্যপাল দেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব, তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত। অতএব তাঁর নেতৃত্বে মণিপুর ফের আলোর পথ খুঁজে পাবে এমনটা আশা করা যেতেই পারে।
তবু বলতেই হবে, ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’। বীরেন সিংয়ের পদত্যাগ কিংবা রাষ্ট্রপতি শাসনের যে দাবি ঘরে-বাইরে প্রবলভাবে আছড়ে পড়েছিল, পরিস্থিতির চাপে হলেও তা পূরণ হওয়াটা নিঃসন্দেহে মণিপুরের পক্ষে ইতিবাচক ঘটনা। গত প্রায় দু’বছরের ঘটনায় আড়াইশো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লক্ষাধিক মানুষ এখনও গৃহহীন। বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ ও আহত। এই পরিস্থিতিতে মণিপুরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির দৌরাত্ম্য দমন করতে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাবাহিনী কোনও আনুগত্য ছাড়াই বিনা বাধায় কাজ করতে পারবে বলে আশা করা যায়। এই মুহূর্তে সেই রাজ্যের মানুষের মনে আস্থা ফেরানো, শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ ফেরানোটা বড় কাজ। রাজ্যপাল দেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব, তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত। অতএব তাঁর নেতৃত্বে মণিপুর ফের আলোর পথ খুঁজে পাবে এমনটা আশা করা যেতেই পারে।


