ইন্দ্রজিৎ রায়, বোলপুর: শান্তিনিকেতনের রতনপল্লিতে আবাসিক ছাত্রদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠল। আতঙ্কে ভুগছেন বিশ্বভারতীর তান হস্টেলের আবাসিকরা। তাঁদের অভিযোগ, হস্টেল প্রাঙ্গণে অনেকদিন ধরে স্থানীয় সমাজবিরোধীদের দাদাগিরি চলছে। বহিরাগতদের উপদ্রবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ। বিষয়টি প্রোক্টর অফিস ও শান্তিনিকেতন থানায় জানানো হয়েছে বলে পড়ুয়াদের দাবি। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে শান্তিনিকেতন থানা।
রতনপল্লির ডেলিব্রেড রোডে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রাচীন তান হস্টেল। এটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মিত কোনও হস্টেল নয়। এই হস্টেলের সঙ্গে বিশ্বভারতীর ঐতিহ্যবাহী চীনা ভবনের বিশেষ যোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস থেকে জানা গিয়েছে, বিশ্বভারতীর পড়ুয়াদের চীনা ভাষা শেখানোর জন্য চীনা পণ্ডিত থান য়ুন শানকে ১৯২৮ সালে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর ৩০ এর দশকে রবীন্দ্রনাথ ও থান য়ুন শানের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় চীনা ভবন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ছাত্র-ছাত্রীরা চীনা ভাষা রপ্ত করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ওই ভবনের ডিরেক্টর পদেও ছিলেন। দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গেও তাঁর অত্যন্ত সখ্য ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। এই সময়েই চীন-ভারত মৈত্রী সঙ্ঘের উদ্যোগে দু’দেশে দু’টি কার্যালয় স্থাপিত হয়। শান্তিনিকেতনে সেই কার্যালয়টি ডেলিব্রেড রোডে তৈরি হয়। সেখানেই পরবর্তীতে থান য়ুন শান বসবাস শুরু করেন। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে বুদ্ধগয়ায় চলে যান। সেই সম্পত্তি বিশ্বভারতীর দখলে আসে। নামকরণ হয় তান হস্টেল। কিন্তু মাঝের সময়ে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটি কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সেই সুযোগে স্থানীয় বাসিন্দারা হস্টেলের ফাঁকা জায়গায় আবর্জনা ফেলা শুরু করেন। ক্রমেই হস্টেলের ঘরগুলি সমাজ বিরোধীদের আড্ডা হয়ে ওঠে। গাঁজা, মদের নেশা সহ অন্যান্য অসামাজিক কাজকর্ম চলে ওই হস্টেলে। কয়েক বছর আগে বিশ্বভারতী সেটিকে পুনরায় বাসযোগ্য করে তোলে। বর্তমানে সেখানে ভাষাভবনের প্রায় ২৫ জন পড়ুয়া বসবাস করেন। সম্প্রতি হস্টেলের সীমানা বরাবর পাঁচিল দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আর তাতেই স্থানীয় সমাজ বিরোধীদের স্বার্থে ঘা লাগে। আবাসিক পড়ুয়াদের মধ্যে সংস্কৃত-পালি-প্রাকৃত বিভাগের স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষের অর্পণ ভট্টাচার্য, হিন্দি ভবনের অনীশ আনন্দ, অনন্ত মণ্ডল বলেন, বিশ্বভারতীর সম্পত্তি হলেও এই হস্টেল দখল করার জন্য সমাজবিরোধীরা কার্যত উঠেপড়ে লেগেছে। তাদের তালে তাল মেলাচ্ছে প্রতিবেশীদের একাংশ। আবর্জনা ফেলে তারা হস্টেল প্রাঙ্গণ আস্তাকুঁড়ে পরিণত করছে। সমগ্র জায়গা স্থানীয় বাসিন্দাদের গবাদি পশুর চারণভূমি হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যা হলেই দুষ্কৃতীরা হস্টেলের ফাঁকা জায়গায় মদ ও গাঁজার আসর বসাচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছি। হস্টেলে আমাদের নিরাপত্তা নেই। বাইরে থেকে পড়াশোনা করতে এসে আমরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। শনিবার রাতে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের পাশাপাশি হস্টেল থেকে বেরলেই মারধর করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ ও শান্তিনিকেতন থানায় জানানো হয়েছে। শান্তিনিকেতন থানার পুলিস জানিয়েছে, অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু হয়েছে। বিশ্বভারতীর ভারপ্রাপ্ত কর্মসচিব অশোক মাহাত বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।