যা হওয়ার ছিল তাই হয়েছে। সংসদের দুই কক্ষ লোকসভা ও রাজ্যসভায় গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনার পর সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিতর্কিত ওয়াকফ বিল পাস করিয়ে নিয়েছে মোদি সরকার। মুসলিম মহিলাদের উপকারের নামে তিন তালাক নিষিদ্ধ করার আইনের পর এবার আরএসএসের আরও একটা এজেন্ডা পূরণ হতে চলেছে। এবারেও সেই সংস্কারের নামে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপকারের তত্ত্ব খাড়া করা হয়েছে। যা আসলে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের নামান্তর। সম্মিলিত বিরোধীদের অভিযোগ, সংসদে পাস হওয়া বিলের মাধ্যমে মুসলিমদের সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত আইনে দখলদারি নিতে চাইছে কেন্দ্রীয় শাসক দল। এও হল মুসলিম সম্প্রদায়কে আরও কোণঠাসা করে দেওয়ার চেষ্টা। হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এইভাবে একে একে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দিকেও হয়তো মোদিবাহিনী হাত বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। আসলে সংখ্যালঘুদের নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের কৌশল খুব স্পষ্ট। মোদি জমানায় গত এগারো বছরে একদিকে সংঘ্যালঘু, বিশেষত মুসলিমদের বিরুদ্ধে লাগামছাড়া বিদ্বেষ, কুৎসার প্রচার চালানো হচ্ছে। কারণে-অকারণে তাদের কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে। কখনও বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লাভ জেহাদের অভিযোগ তুলছে পদ্মশিবির। এমনকী দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার জন্য মুসলিমদের দায়ী করতেও ছাড়েননি কেউ কেউ। অন্যদিকে, তিন তালাক বা ওয়াকফ বিল এনে দেখানো হচ্ছে, আমরাই তোমাদের আসল ‘মিত্র’। যদিও বাস্তব সত্য হল, এই ‘মিত্র’ মোদির মন্ত্রিসভায় এই মুহূর্তে কোনও মুসলিম প্রতিনিধি নেই।
ওয়াকফ নিয়ে কেন এই বিতর্ক? ইসলামিক আইনে পরিচালিত ওয়াকফ হল ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে দান করা সম্পত্তি। যা মসজিদ, দরগা, কবরস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র গরিব ও অসহায়কে সাহায্য করার কাজে লাগানো হয়। এক্ষেত্রে লিখিত ডিড বা মৌখিকভাবে কেউ কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ বলে ঘোষণা করতে পারেন। ভারতে প্রথম ওয়াকফ আইন তৈরি হয়েছিল ১৯১৩ সালে। ১৯৯৫ সালে তা শেষবার সংশোধন হয়েছিল। মোদি সরকার ফের তা সংশোধন করায় বিতর্ক বেঁধেছে। প্রশ্ন হল, বিরোধী থেকে সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন সংগঠন কেন এই বিলের বিরোধিতায় সরব হয়েছে? প্রথমত, নতুন বিলে বলা হয়েছে পাঁচ বছর ইসলাম ধর্ম পালন করলে তবেই কেউ কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ বলে ঘোষণা করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, বহু পুরনো ওয়াকফ সম্পত্তি আছে যা স্রেফ মৌখিকভাবে ঘোষিত। নতুন বিলে এই বিপুল সম্পত্তির চরিত্র নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কালেক্টরের হাতে। এর ফলে বহু মসজিদ, দরগা, কবরস্থান, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অভিযোগ। তৃতীয়ত, বিলে বলা হয়েছে কেন্দ্রের ওয়াকফ কাউন্সিলে বাধ্যতামূলকভাবে দু’জন অ-মুসলিম সদস্য রাখতে হবে। প্রশ্ন উঠেছে, দেশে তাহলে হিন্দু বা শিখ বা অন্য সম্প্রদায়ের সমতুল্য কোনও বোর্ডে কেন শুধু সেই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি থাকবেন? চতুর্থত, ওয়াকফ বোর্ডে দু’জন মহিলা সদস্য রাখতেই হবে। ঘটনা হল, সেই নিয়ম এখনও আছে। পঞ্চমত, এতদিন ওয়াকফ সম্পত্তি সমীক্ষার দায়িত্ব ছিল সার্ভে কমিশনারের হাতে। নতুন বিলে কালেক্টরকে সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠত, কোনও সরকারি সম্পত্তি ওয়াকফ গণ্য হয়ে থাকলে তা আর ওয়াকফ থাকবে না। এ বিষয়ে কালেক্টর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সপ্তমত, এতদিন ওয়াকফ নিয়ে শেষ কথা বলার মালিক ছিল ওয়াকফ বোর্ড। নতুন নিয়মে কার্যত তাদের হটিয়ে কালেক্টরকে যাবতীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের আশঙ্কা, সরকারি আধিকারিক এই কালেক্টরকে শিখণ্ডী করে ওয়াকফ সম্পত্তি হাতাতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাই এই বিলের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কথা ভাবছে কোনও কোনও রাজনৈতিক দল।
দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। নতুন বিল এনে সরকার পক্ষ দাবি করেছে, ওয়াকফ বোর্ডের হাতে যে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি আছে তা একমাত্র রেল ও সেনাবাহিনী ছাড়া আর কারও হাতে নেই। ওয়াকফের হাতে রয়েছে ৯.৪ লক্ষ একর জমি। এও প্রচার করা হয়েছে, মুসলিম সম্প্রদায় দেশের সম্পত্তি বেআইনিভাবে দখল করে রেখেছে। যদিও এই সম্পত্তির সিংহভাগই কবরখানা, মসজিদ, যা কোনও ব্যক্তির দখলে নেই। পাল্টা প্রশ্ন উঠেছে, শুধু তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানাতেই হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থার হাতে ১০ লক্ষ একরের বেশি জমি রয়েছে। এক্ষেত্রে তাহলে মোদিবাহিনী চুপ কেন? আসলে অঙ্ক খুব পরিষ্কার। একদিকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দুনিয়ার হিন্দু এক হও—স্লোগানে শান দেওয়া। অন্যদিকে ‘উন্নয়নের’ নামে সংখ্যালঘুদের আরও কোণঠাসা করা। এই লক্ষ্যে তিন তালাক, ওয়াকফের পর পরের ধাপ গোটা দেশে অভিন্ন দেওয়ানি নীতি চালু করা। তাহলেই হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে গেরুয়াবাহিনীর ষোলোকলা পূর্ণ হবে।