বনগাঁ বা লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালের ভিড়ে ঠেলতে ঠেলতে মফস্সল থেকে শহরে পাড়ি জমান বহু গৃহ সহায়িকা। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে তাঁদেরই মধ্যে উঠে এল এক ব্যতিক্রমী মুখ। কলিতা মাঝি। গৃহ সহায়িকা থেকে পৌঁছে গেলেন বিধানসভায়। তাতে কি এই শ্রেণির মেয়েদের অবস্থান আদৌ বদলাবে? প্রশ্ন তুললেন মঞ্জীরা সাহা।
থ্রি এইট ওয়ান ফোর ডাউন বনগাঁ লোকাল ভোর চারটে বেজে পঁচিশ মিনিটে দু’নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে। ঘোষণা হচ্ছে বারবার। হর্ন দিচ্ছে ট্রেনটা। বনগাঁ স্টেশনে অন্ধকার তখনও ভালো করে কাটেনি। প্ল্যাটফর্মের ভিতরে রাত থেকে জ্বলে থাকা টিউব লাইটগুলো তখনও জ্বলছে। দপদপ করছে একটা। ছুটে আসছে সাত-আট জন। ছুটছে...ছুটছে... ওরা। কোমরে আঁচলগুলো গোঁজা। কাঁধে ব্যাগ। হাতে ব্যাগ। কারও দুই কাঁধে দু’খানা। কোনোটা রেশন ব্যাগ। কোনোটা ফোমের ব্যাগ। কোনোটার চেন কাটা, সেফটিপিন দিয়ে জোড়া। কোনোটা মুচির থেকে সেলাই করে জোড়াতালি দেওয়া। ট্রেনটা হালকা স্পিডে ছাড়ছে। ছুটে এসে লেডিস কামরায় পা দিয়ে দিল একজন। কামরার ভিতর লাইটগুলো বন্ধ। বেশ অন্ধকার। পিছনের মেয়েরা একে একে উঠে পড়ছে। এবার স্পিড বাড়ছে। লেডিস কামরার ভিতরের সিটগুলো প্রায় ফাঁকা। হাঁপাচ্ছে ওরা। হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে বসে পড়ল উলটো দিকের গেট জুড়ে মেঝেতে। জ্যৈষ্ঠের গুমোট গরম চলছে। আকাশে মেঘ। বৃষ্টির দেখা নেই। গলার ঘাম শুকিয়ে চ্যাটচ্যাট করছে চামড়া। পোশাকেও ঘামের ছোপ। দরজা দিয়ে হাওয়া আসছে এবার। উড়িয়ে দিচ্ছে ওদের খোঁপার বাইরের উশকোখুশকো ডগাফাটা চুলগুলো।
‘বাপরে! কি ছোটা না ছুটলাম রে! উফ! ভাগ্যিস দুই মিনিট লেট করল! নাইলে আজ হত ঠেলা।’
‘হ্যাঁ! তোর কাজের বাড়ির বউদিটার যা মুখ!’
‘হ্যাঁ। যদি দেরি হত, মুখ করে আমার গুষ্টির তুষ্টি উদ্ধার করে দিত এক্কেবারে। ওদের অফিসে লেট হলে অসুবিধা নেই। ওদের অসুখবিসুখ থাকতে পারে, জ্বরজারি হতে পারে। আমাদের বেলাই শুধু...!
স্পিডটা কমে আসছে। হর্ন দিচ্ছে। ট্রেনটা ঢুকছে পরের স্টেশন। ঠাকুরনগর। আরও মেয়ে উঠছে কামরাটায়। সঙ্গে ফুলের ঝুড়ি। রজনীগন্ধার গন্ধে ভরে যাচ্ছে কামরাটা। টিফিনবক্সের চচ্চড়ি, বেগুনপোড়া, কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে রজনীগন্ধা গোলাপের গন্ধ। ওই দরজার কাছে বসে থাকা মেয়েদের ব্যাগ থেকে স্টিলের টিফিনকারিগুলো বেরিয়েছে বাইরে। ঢাকনা খুলে খেতে শুরু করেছে ওরা। টিফিনবক্সের ভিতরের খাবারগুলো সবাই দেখতে পাচ্ছে। কাঁচা লংকার নীচে ভাত। কোথাও ভাতের পাশে একটু চচ্চড়ি। কোথাও কাঁচা পেঁয়াজ। জল ঢালা ভাতে। হাত দিয়ে কচলে মেখে খাচ্ছে
ওরা ওই গেটের ধুলো হাওয়ার মাঝে। রাত আড়াইটা তিনটে থেকে কেউ রান্না করেছে। কেউ আগের দিনের বাসি ভাত এনেছে সঙ্গে করে। কেউ তার ইশকুলে পড়া মেয়ের উপর ভরসা করে ফেলে এসেছে সংসার রান্নাবান্না বাসন ধোয়া। কেউ ফিরবে হয়তো সন্ধের ট্রেনে। কেউ ফিরবে হয়তো রাত করে শেষ বনগাঁ লোকালে।
ঠাকুরনগর স্টেশনে নতুন মেয়েরা ওঠায় ঝগড়াঝাঁটির পালা। ঝগড়াটা ওই গেটের সামনে বসার জায়গা নিয়ে। ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছাড়তে আবার সব কেমন মিলমিশ হয়ে গেল। চাপাচাপি করে বসে পড়ল সবাই। গেটের ডানে বাঁয়ে যা যতটুকু ফাঁক-ফোকর ছিল ভরাট হয়ে গেল। দু’-চারজন খোঁপা খুলে পিঠে মেলে দিল তেলতেলে ভেজা ভেজা গন্ধওয়ালা চুলগুলো। পুরোনো জর্দার কৌটো খুলে চুন সুুপুরি দেওয়া পান বের করে দু’-একজন চিবতে লাগল। ট্রেন পেরতে লাগল পরপর স্টেশন। দত্তপুকুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আবার উলটোদিকে বলে নতুন মহিলাযাত্রী আর ওই বসে থাকা মেয়েদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলল খানিক। তারপর আবার যে যার মতো। ভিড় বেড়ে যাওয়ায় ওই বসে থাকা মেয়েদের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে অনেকে। এরই মাঝে একখানা মোবাইল খুলে গান বাজিয়ে দিয়েছে ওদেরই কেউ, ‘মন বলেছে আমার তুই সঙ্গে যাবি চল’। ট্রেন চলেছে সবুজ মাঠ, সারি সারি কলাগাছ, নারকেল গাছ ছাড়িয়ে উঁচু উঁচু ফ্ল্যাট বাড়ির পাশ দিয়ে। মধ্যমগ্রাম, বিরাটি, দমদম ক্যান্টনমেন্ট...। গানের কথার সঙ্গে সঙ্গে কথার শব্দগুলো মিশে যেতে লাগল।
‘কাল বউদি সেই কী মুখ ঝামটা দিল! যদি শুনতিস রে আহ্লাদি! বলছে, ছুটি কেন নিবি? বোনপোর বিয়ে তো তিন দিনের ছুটি! মামাবাড়ির আবদার! যা না এই লোকের বাড়ি ঝিগিরি ছেড়ে বোনপোর বাড়িতে গিয়ে থাক না! বোনপো ফোকোটিয়া খাওয়ায় কত দেখব! শোন অত কামাই চলবে না। আমাদের অফিস কাছারি আছে না! এই মাসেই তো ছেলের পেটে ব্যথার দোহাই দিয়ে তিন দিন ছুটি নিলি। আবার ছুটি! এবার মায়না কাটব!’ সে কী ঝাল ঝাড়ল!’
‘তুই কী বললি!’
‘কী বলব ! সত্যি সত্যিই টাকা কেটে নিলে আমাদের চলবে? হিসেবের টাকা। ওই ক’টা টাকা কেটে নিলে মাস টানব কীভাবে! ছেলে মেয়ের প্রাইভেটের মায়না দেব কোত্থেকে? দেনা আছে কত! আমাদের কি সেই রকম শখ আহ্লাদ করা চলে?’
ট্রেনটা শিয়ালদহের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে আছে নারকেলডাঙা কারশেডে। দিনের আলো ফুটে গেছে বাইরে। দমদম, বিধাননগর শিয়ালদহ স্টেশনে ভিড় বাড়ছে আস্তে আস্তে। প্ল্যাটফর্মগুলোতে নেমেই ছুটবে যে যার মতো।
ওই যে গেট জুড়ে বসে আসছে কলকাতার দিকে, শুধু বনগাঁ লোকালেই কেবল ওরা আসে এমন নয়, রাতের অন্ধকার থাকতে নানা স্টেশন থেকে কলকাতা শহরের দিকে ট্রেন ছাড়ে। বনগাঁ হাসনাবাদ লক্ষ্মীকান্তপুর গেদে কাটোয়া শান্তিপুর নামখানা। ওই লোকাল ট্রেনের মেঝেতে-সিটে বসে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ে। চলে যায় যাদবপুর বালিগঞ্জ গড়িয়াহাট আরও আরও সব ঠিকানায়। আবার নিজের এলাকায় কেউ যায় পায়ে হেঁটে, কেউ যায় সাইকেল চালিয়ে নিজের পাড়ায় অন্য বাড়িতে কাজ করতে। কেউ যায় দুটো পাড়া ছেড়ে অন্য পাড়ায়। কেউ যায় বসতি ছেড়ে উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ির রান্নাঘরে। ওদের কথায় সেগুলো ‘কাজের বাড়ি’। লোকে ওদের বলে ‘কাজের মেয়ে’।
ভোর হয়। লোকের বাড়ির ধুলো ঝাঁট দিয়ে কাঁচিয়ে তোলে ডাস্টবিনে। পরের বাড়ির ফেলে দেওয়া ন্যাকড়া ভিজিয়ে সাদা মার্বেলের মেঝে ঝকঝকে চকচকে করে দেয়। পরিষ্কার করে অন্যের শোয়া বিছানার চাদর। অন্যের খাওয়া থালা থেকে আগের দিনের লেগে থাকা তেল তোলে ঘষে ঘষে। ময়লা ফেলার বালতি নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায় রাস্তার ধারের আস্তাকুঁড়ের দিকে। কাজের শেষে হয়তো বা পড়ে থাকা ভাত কিংবা দুটো রুটি-চা। একটু ঝগড়া। মায়নার টাকার হিসেব থেকে টাকা কাটা। কিংবা কাজ ছেড়ে চলে যাওয়া আবার অন্য কোনো ‘কাজের বাড়ি’।
ওই যে ট্রেনে করে আসছে, ওদের ওভাবেই দেখতে অভ্যস্থ আমরা শিয়ালদহ, হাওড়া বারাসত, বারাকপুর স্টেশনের ভিড়ে। আমাদের চেনা ছবি।
হঠাৎ একটা অচেনা ছবি দেখা গেল এবছর। বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬। ভোটের প্রচারে অনেক অনেক হোর্ডিংয়ের ভিতর একটা অন্যরকম মুখের ছবি। বেশ করে তেল দিয়ে আঁট করে বাঁধা খোঁপার এক ভদ্রমহিলা। কে এই প্রার্থী? ওই যে যারা রোজ ভোর থেকে অন্যদের সংসারে গিয়ে বাসন ধোয়, ঘর মোছে, কাপড় কাচে, রান্না করে, বাচ্চা রাখে তাদেরই একজন তিনি। ভোটের ময়দানে ঝকঝকে চকচকে হেভিওয়েট প্রার্থীদের ভিতর এমন একজনের ছবি? হয়তো প্রশ্ন জেগেছিল দর্শকদের মনে। তারপর এল চৌঠা মে। ভোটের রেজাল্ট। ভোটে জিতে গেলেন সেই গৃহ সহায়িকা। যাকে আশপাশের বাড়ির মেয়েরা দেখেছিল তাদের কলতলায় রান্নাঘরে, তাকেই দেখা গেল বিধানসভায়। শপথবাক্য পাঠ করতে একটু হয়তো গলাটা কেঁপে উঠছিল। একটু আড়ষ্টতা হয়তো জড়িয়ে ধরছিল জিভ। সেই ছবির প্রার্থীটি আসলে কে এতক্ষণে নিশ্চয়ই আন্দাজ করা গিয়েছে। আউশগ্রাম বিধানসভার প্রার্থী কলিতা মাঝি।
নিত্যদিনের চেনা রুটিনের মাঝে তাঁর জন্য এর পরের দিনগুলি একেবারে আলাদা। কলতলায় ডাঁই করা এঁটো বাসন নেই, বালতিতে বালতিতে সার্ফে ভেজানো ময়লা জামাকাপড় নেই, কাজের বাড়ির বউদির রাগ ঝাল নেই। চারপাশে সারি সারি সিটে বসা সব মান্যগণ্য মানুষ। বড়ো বড়ো লাইট। পালিশ করা চেয়ার। যাদের এতদিন দেখা গিয়েছিল টিভির পর্দায় আজ তাঁরা পাশের সিটে। আর সেই বিধানসভা হল-এর বাইরে? মানুষ আর মানুষ। যে ছিল খেটে খাওয়া মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়া একজন, সেই ভিড় আজ তাকিয়ে আছে তাঁরই দিকে। তাঁর কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করে আছে।
ওই যে আজও ভোর থেকে যারা আসছে অন্যের এঁটো লাগা থালাগুলো মাজতে, চড়া রোদে সাইকেল চালিয়ে এক বাড়ি থেকে অন্য কাজের বাড়ি, একটার পর একটা সিঁড়ি উপুড় হয়ে মুছতে মুছতে তিনতলা থেকে একতলায়, সিঁড়ি বেয়ে উঠছে কোনো সাততলার ফ্ল্যাটবাড়িতে রান্নার কাজে— তাদের কথা কি উচ্চারিত হবে ওঁর মুখ দিয়ে বিধানসভার অন্দরে! আর বিধানসভার বাইরে? লেডিস কামরায়, বাজারে, প্ল্যাটফর্মে, মুদির দোকানে, রাস্তায় ঘাটে, রান্নাঘরে, কলতলায়, সিঁড়ির কোণে বদলাবে কি এবার ওদের অভিযোগের সুর? কাজের বাড়ির বউদি আর কাজের মেয়ের মধ্যে কথোপথনের সুর কি বদলাবে খানিক? কেটে যাওয়া বেতনের হিসেব করা থামবে কি? একটু গলা উঁচু করে বলবে কি এবার, ছুটি আমার চাই। আর ওই ছুটি মঞ্জুর করার মালকিন বউদিদের বুক সামান্য কেঁপে উঠছে কি এবার?
আজ ভোর অন্ধকারে ট্রেন ধরার জন্য ছুটতে ছুটতে, কড়াইয়ের কালি ঘষতে ঘষতে, সার্ফের ফেনা হাতে মেখে কেউ কি নিজেকে ভেবেছিল কিঠিক ওই হোর্ডিংয়ের ছবির মতো করে?