শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: ১৭ বছর বাদে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের উপ নির্বাচনে প্রার্থী আরও এক সন্তানহারা মা। তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিহত আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথ। তিনিই বিজেপি প্রার্থী। ২০০৯ সালে শহিদ জননী ফিরোজা বিবি নন্দীগ্রাম উপ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছিলেন। নন্দীগ্রামের তৎকালীন সিপিআই বিধায়ক মহঃ ইলিয়াস শেখ স্টিং অপারেশনের ফাঁদে পড়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ায় সে বার উপ নির্বাচন হয়েছিল। ঘটনাচক্রে দু’ই সন্তানহারা মা শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরেই ভোটের লড়াইয়ে শামিল হলেন। বিরোধী দলের নেতা হিসেবে শুভেন্দু ২০০৯ সালের চ্যালেঞ্জ উতরে গিয়েছিলেন। সেই ভরা বাম জমানায় ফিরোজা বিবি ৩৯ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছিলেন। এবারের ভোট শুভেন্দুর কাছে স্রেফ মার্জিন বাড়ানোর লড়াই বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।
গত ১১ মে শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরের বিধায়ক হিসেবে শপথ নিয়ে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন। তারপর শুরু হয় উপ নির্বাচনের কাউন্ট ডাউন। নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী কে হবেন তা নিয়ে কৌতূহলের শেষ ছিল না। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নন্দীগ্রামের তিন প্রথমসারির বিজেপি নেতার নাম আলোচনায় এসেছিল। দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক মেঘনাদ পাল ও দুই জেলা সহ সভাপতি প্রলয় পাল, অঞ্জন ভারতীকে নিয়ে তাঁদের অনুগত নেতাকর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারও চালিয়েছিলেন। কিন্তু, দলের পক্ষ থেকে মনোনয়নের আগে পর্যন্ত প্রার্থী ঘোষণা না করে শেষমুহূর্ত পর্যন্ত জল্পনা জিইয়ে রাখা হয়েছিল। মঙ্গলবার সকালে হাসিরানি রথ গেরুয়া উত্তরীয় জড়িয়ে চণ্ডীপুরের বিধায়ক পীযূষকান্তি দাসকে সঙ্গে নিয়ে রেয়াপাড়া শিবমন্দির এবং নন্দীগ্রাম জানকীনাথ মন্দিরে পুজো দিতে যাওয়ার সময়ই বোঝা যায় যে, তিনিই এবার উপ নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হতে চলেছেন। কিন্তু, দলের তরফে সে কথা ঘোষণা হয় সকাল ১১টার পর।হাসিরানিদেবীর বাড়ি চণ্ডীপুর থানার কুলুপ গ্রামে। এবছর বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরনোর দু’ দিন বাদেই ৬ মে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মধ্যমগ্রামে নিজের বাড়ি ফেরার পথে রাত সাড়ে দশটা নাগাদ দুষ্কৃতীদের গুলিতে খুন হয়েছিলেন হাসিরানিদেবীর ছেলে চন্দ্রনাথ। সেই চন্দ্রনাথের মাকে দল প্রার্থী করায় নন্দীগ্রামের বিজেপি কর্মীদের একটা অংশ অভিমানী। দলের জেলা সহ সভাপতি প্রলয় পাল হলদিয়া মহকুমা শাসক অফিসে মনোনয়নে যাননি। মঙ্গলবার দুপুরে ফেসবুক ভিডিয়োতে তাঁর গলায় অভিমানের সুর ঝরে পড়েছে। পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষকে ‘দার্শনিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসকে সারা দেশে প্রার্থী দিতে হয় না। প্রার্থী বাছাই নিয়ে ঝক্কি নেই। বাড়ির চাকরবাকরকেও প্রার্থী করে দিলে চলে।’ পঞ্চায়েত মন্ত্রীর এই মন্তব্য নিয়েই প্রলয় পাল ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে ‘দার্শনিক’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।
তবে, নন্দীগ্রামের অপর দুই জেলাস্তরের নেতা মেঘনাদ পাল এবং অঞ্জন ভারতী মনোনয়ন জমা উপলক্ষ্যে উপস্থিত ছিলেন। জানকীনাথ মন্দিরে পুজো দেওয়ার সময়ও মেঘনাদবাবু দলীয় প্রার্থীর সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলেন। হাসিরানিদেবেী বলেন, এখানকার সংগঠনের কাছে সহযোগিতা চাইব। আমি সংগঠন এবং এখানকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগতে চাই। নন্দীগ্রাম নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুবাবুর যে স্বপ্ন, তা পূরণ করতে চাই। মুখ্যমন্ত্রী এখানকার বেশিরভাগ কাজটাই করে ফেলেছেন। তিনি আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে নন্দীগ্রামকে খুশি করার চেষ্টা করব। আমাদের দল এক লক্ষ ১০ হাজার ভোটে জেতার লক্ষ্য নিয়েছে। আমিও মনে করি, লক্ষাধিক মার্জিনে এই আসনে আমাদের জয় হবে।