নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আবারও নির্বাচন আসছে বাংলায়। আবারও বঙ্গভঙ্গের উসকানি হাতিয়ার কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির। বছর ঘুরলেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার কথা। তার আগে আচমকা পাহাড়-ডুয়ার্সের মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিল মোদি সরকার। সেটাও একতরফাভাবে, রাজ্য সরকারের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আলোচনা না করে। বর্ষাশেষের বিপর্যয় থেকে সবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পাহাড়-ডুয়ার্স। সেই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে ফের গোর্খাল্যান্ডে জিগির তোলার কৌশল বলেই মনে করা হচ্ছে। এত চরম ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের তীব্র প্রতিবাদ করে শনিবার সরাসরি চিঠি লিখেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে পাহাড়ের ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের’ কথা বলেছিল বিজেপি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাগাতার আন্দোলনে কার্যত ‘ব্যাকফায়ার’ করে সেই প্ল্যান। পরবর্তীতে ফের বঙ্গভঙ্গের জিগির তোলেন মোদি-অমিত শাহের দলের নেতারা। কিন্তু তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে পদ্মপার্টি এব্যাপারে উচ্চবাচ্য করার সাহস পায়নি। কিন্তু তলায় তলায় যে বাংলা ভাগের চক্রান্ত চলছিলই, তা ফের প্রমাণিত হল শুক্রবার রাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকায়। সেই নির্দেশিকায় জানানো হয়, ১৯৮৮ ব্যাচের আইপিএস অফিসার, প্রাক্তন ডেপুটি জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা পঙ্কজ কুমার সিংকে পাহাড়-ডুয়ার্সের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিযুক্ত করেছে মোদি সরকার। এর আগে ২০০৯ সালে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের আবহে একই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সেবার প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিজয় মদনকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে তৎকালীন ইউপিএ সরকার। কিন্তু, এবার একেবারে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সে কাজ করা হয়েছে, যা কার্যত নজিরবিহীন এবং রাজ্য ভাগের আশঙ্কা আরও জোরদার করেছে। সেই ইঙ্গিত মিলেছে দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে। তাঁর বার্তা, ‘ইতিহাসে প্রথমবার এমন ঘটনা ঘটেছে যখন কোনও রক্তপাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কোনও প্রাণহানি না হওয়া সত্ত্বেও মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত করল কেন্দ্র। এটা পাহাড়, তরাই এবং ডুয়ার্সের মানুষের জয়।’
তার প্রতিবাদেই গর্জে উঠেছেন মমতা। প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘বর্তমানে শান্তি বিরাজ করছে পাহাড়ে। কষ্টার্জিত এই শান্তির বাতাবরণ ধরে রাখতে গোর্খা সম্প্রদায় বা গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সংক্রান্ত যে কোনও সিদ্ধান্ত, রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া প্রয়োজন। এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে কেন্দ্রের একতরফাভাবে নেওয়া সিদ্ধান্ত শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে, এমনটা হতে পারে না। ফলে দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের অর্ডার বাতিল করা হোক।’ মুখ্যমন্ত্রীর সাফ কথা, ‘পাহাড়ে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি সরাসরি জিটিএ-র প্রশাসনিক কাজকর্ম, শান্তি এবং প্রশাসনিক স্থায়িত্বের সঙ্গে জড়িত। আর জিটিএ রাজ্যের অধীন একটি স্বশাসিত সংস্থা। ফলে কেন্দ্রের একতরফা এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো বিরোধী।’
কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তে খুশি গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে লড়াই করা গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট। জানা যাচ্ছে, দীর্ঘ তিন বছর পর গত ৩ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে গোর্খা প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই। উপস্থিত ছিলেন রাজু বিস্তাও। সেখানেই গোর্খাল্যান্ড নিয়ে স্থায়ী সমাধানের দাবি নতুন করে আলোচিত হয় বলে সূত্রের খবর। তারপরই এই পদক্ষেপ। বিষয়টিকে ভোটের আগে নির্বাচনী চমক আখ্যা দিয়েছেন দার্জিলিং পাহাড়ের তৃণমূল সভাপতি এল বি রাই।