আনন্দ সাহা, মুর্শিদাবাদ: গত বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ আসনে বিজেপি প্রার্থীর জয়ের নেপথ্যে তাঁদের ভূমিকা নেহাত কম ছিল না। মিটিং, মিছিলে যাওয়ার পাশাপাশি ইভিএম মেশিনে বোতাম টিপে গেরুয়া শিবিরকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু, এসআইআর প্রক্রিয়ার পর সদ্য প্রকাশিত নতুন ভোটার তালিকায় তাঁদের মধ্যে অনেকেরই নাম নেই। অর্থাৎ, পাঁচ বছর আগে যাঁদের ভোটে মুর্শিদাবাদ আসনে বিজেপি জয়লাভ করেছিল, এসআইআরে তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁরা এখন আর এদেশের নাগরিক নন। ভোটাধিকার হারানো মানুষগুলি ক্ষোভে ফুঁসছেন। তাঁদের পরিবার আগামী ২৩ এপ্রিল জবাব দেওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে।
গত বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ আসনে বিজেপির জয়ে মুর্শিদাবাদ ও জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পুরসভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিধানসভার ৮টি অঞ্চলে ভাল ফল করলেও ওই দুই পুরসভায় তৃণমূলের ভরাডুবি হয়। প্রাপ্ত ভোটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দুই পুরসভা মিলিয়ে গেরুয়া শিবির ১৯ হাজারের বেশি ভোটে লিড দেয়। ফলে তৃণমূলের শাওনি সিংহরায় ২৪৯১ ভোটে পদ্ম প্রার্থী গৌরীশংকরের কাছে পরাজিত হন। জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পুরসভার ৭ নম্বর এবং ৮ নম্বর ওয়ার্ডে শাসক দলের মোট ঘাটতি ছিল প্রায় ১৭০০। ৭ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপির লিড ছিল প্রায় ১২০০। রাজ্য সরকারের সমস্ত প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও ওই ওয়ার্ডের ভোটারদের অধিকাংশ তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়ে বিজেপিকে সমর্থন করেছিলেন। এই ৭ নম্বর ওয়ার্ডেই ১৮০ জনের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সমর্থক।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিগঞ্জের বাসিন্দা রামচন্দ্র সরকার এবং লক্ষ্মণ সরকার দুই ভাই। তাঁদের পরিবারে মোট সদস্য সংখ্যা ১৩। দুই ভাই সহ ছ’জনের নাম বাদ গিয়েছে। রামচন্দ্রবাবু বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আক্ষেপের সুরে বলেন, গত বিধানসভা নির্বাচনে আমাদের পরিবারের সকলেই বিজেপিকে সমর্থন করেছিল। তা করে কী লাভ হল? সমস্ত নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও আমাদের পরিবারের ছ’জনের নাম বাদ গিয়েছে।
৮১ বছরে পা দিয়ে ভোটাধিকার হারিয়েছেন গণেশ হালদার। রবিবার সকালে পাড়ার চায়ের দোকানে বসেছিলেন। নাম উঠেছে কি না জিজ্ঞাসা করতেই মেজাজ হারালেন। কিছুটা আতঙ্কের সুরে বললেন, ভরসা করে যাদের ভোট দিয়েছিলাম তারাই নাম কেটে দিল। এই বয়সে নাগরিকত্ব হারালাম।
পঁচাত্তরের হরিলাল চৌধুরী, একাশির রুপবালা বিশ্বাস এবং ছিয়াশির শ্রীদাম সরকারও ভোটাধিকার হারিয়েছেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার জন্য তাঁরা সকলেই প্রকারান্তে বিজেপিকে দুষছেন। নাম বাদ যাওয়া নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। ৮ নম্বর বৈদ্যনাথ বিশ্বাস, শ্যামলাল হালদারের নাম বাদ গিয়েছে। শ্যামলাল বলেন, আমরা দিদির সমর্থক বলে বিজেপির অঙুলিহেলনে নির্বাচন কমিশন আমাদের নাম বাদ দিয়েছে।
যদিও বিজেপির মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সৌমেন মণ্ডল বলেন, এসআইআরে এরাজ্যের কর্মীরাই কাজ করেছেন। বেছে বেছে বিজেপির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল প্রার্থী শাওনি সিংহরায় বলেন, নির্বাচনে জেতার পর বিজেপি বিধায়ক কোনো কাজ করেননি। মানুষ তাদের ভুল বুঝতে পেরে বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বুঝতে পেরে নাম বাদ দিয়েছে। আর নাম কাটার কাজটা বিজেপির নির্দেশে যে নির্বাচন কমিশনই করেছে, সেটা সবাই জানে।