Bartaman Logo
৬ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আর কবে?

দফা এক, দাবি এক—জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। আপাতত এই দাবিতে গোটা দেশ উত্তাল। ২ অক্টোবর, গান্ধী জয়ন্তীতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছে, ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলের সঙ্গে সঙ্গে তার ঝাঁঝ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।

আর কবে?
  • ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দফা এক, দাবি এক—জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। আপাতত এই দাবিতে গোটা দেশ উত্তাল। ২ অক্টোবর, গান্ধী জয়ন্তীতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছে, ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলের সঙ্গে সঙ্গে তার ঝাঁঝ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। কখনো দিল্লি, কখনো মুম্বই বা অন্য কোনো শহরে আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। শয়ে শয়ে গ্রেপ্তার করে, বলপ্রয়োগ করে আন্দোলনকারীদের ভয় দেখানোর চেষ্টা হলেও তা দ্বিগুণ হয়ে আছড়ে পড়ছে রাজপথে। ওরা অকুতোভয়। ককরোচ জনতা পার্টির অভিজিৎ দিপকে হোক বা বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরা—এঁদের নেতৃত্বে জ্ঞানেশ হটাও স্লোগাল তুলে হাজার হাজার জেন জি পথে নেমেছে। এই বাঁধভাঙা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের ডানায় ভর করে ককরোচ পার্টির সুপ্রিমো অভিজিৎ দিপকে আওয়াজ তুলেছেন, ‘নাও অর নেভার’। এটাই সময় এককাট্টা হওয়ার। গোটা দেশের বিরোধীদের। কিন্তু জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবির সঙ্গে ‘ভোট চুরির’ অভিযোগে সরব সব বিরোধী রাজনৈতিক দল হলেও এক জেন জি নেতার এই উদাত্ত আহ্বান তাঁরা মর্মে অনুভব করছেন বলে মনে হয় না। বরং অতীতের মতো এখনও তারা দলীয় স্বার্থে সংকীর্ণ রাজনীতির শিকল পরে এককাট্টা হওয়ার বদলে দূরত্ব রেখে চলেছেন! এতে যে আখেরে শাসক বিজেপিরই সুবিধা তা বহু মানুষ বুঝলেও এই বিরোধী নেতারা না বোঝার ভান করে চোখ বন্ধ করে রেখেছেন!

Advertisement

২০২৫-এর জুন মাসে এসআইআর শুরুর সময় থেকে কংগ্রেস, বাম, তৃণমূল সহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ‘নির্বাচন কমিশন ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কখনোই একজোট হয়ে সম্মিলিতভাবে তাদের লড়াইয়ের ময়দানে দেখা যায়নি। এর নিট ফল হল, গত দেড় বছরে একাধিক রাজ্যের বিধানসভা ভোটে বিরোধীদের একের বিরুদ্ধে একাধিক প্রার্থীর লড়াইয়ের সুযোগ নিয়ে তার ফায়দা তুলেছে বিজেপি। এর পরিণতিতে জ্ঞানেশ কুমার বা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। বিস্ময়ের কথা হল, এখন পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতো একটি সর্বভারতীয় ইংরাজি দৈনিকের তদন্তমূলক প্রতিবেদন সেই সুযোগকে সামনে এনে দিলেও বিরোধী ইন্ডিয়া মঞ্চ এবারও একজোট হয়ে লড়াইয়ের ময়দানে নেই! গত সপ্তাহে দিল্লিতে এই জোট জ্ঞানেশের ইস্তফা, এসআইআর স্থগিত রাখার মতো একগুচ্ছ দাবিতে পথে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্বের কারণে সেই বৈঠকে ছিলেন না আপ বা ডিএমকের কোনো প্রতিনিধি। আজ মঙ্গলবার সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন দফতরের উদ্দেশে ইন্ডিয়া জোটের সাংসদরা যে মহামিছিলের ডাক দিয়েছেন, তাতে যাবে না ওই দুটি বিরোধী দলের কোনো প্রতিনিধি। ঘটনা হল, গত কয়েকদিন দিল্লি, মুম্বই সহ বিভিন্ন শহরে পথে নেমে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে সেখানেও একত্রিত না হয়ে পৃথকভাবে বিক্ষোভ দেখাতে দেখা যাচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে। শোনা যাচ্ছে, ককরোচ পার্টির নেতা এককাট্টা হয়ে লড়াইয়ের আহ্বান জানালেও তাদের সঙ্গে কংগ্রেসের ইতিমধ্যে বিস্তর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বলা বাহুল্য, ইস্যু এক হলেও বিরোধী দলগুলির মধ্যে ঐক্যের অভাবেই রাজনৈতিকভাবে লাভ হচ্ছে শাসক শিবিরের। 
কথায় আছে, পাগলেও নিজের ভালো বোঝে। ২০২৪-এ লোকসভা ভোটের আগে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জন্ম নিয়েছিল বিরোধীদের ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চ। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে, প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই বিরোধী দলগুলি একে-অপরের বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়ে নরেন্দ্র মোদিদের তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতার আসার পথ সুগম করে দিয়েছিল। অর্থাৎ তারা এককাট্টা হতে পারেনি। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আদৌ কতটা আগ্রহী বিরোধীরা? এবারে পরিস্থিতি আরও অনুকূল। কারণ দেশের তরুণ প্রজন্ম ক্ষোভে ফুঁসছে। জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা, নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের মতো একাধিক দাবিতে পথে নেমেছে জেন জি। ককরোচ ছাড়াও বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠনের ডাকে এই আন্দোলনে সাধারণ নাগরিকরাও হাজারে হাজারে পথে নেমেছেন। এই অবস্থায় বিরোধী দলগুলিরও এক হয়ে লড়াইয়ের বার্তা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। তাদের সামনে বড়ো সুযোগ এসেছে। একদিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণে জেরবার হওয়া, অন্যদিকে ভোটাধিকার হারানোর কারণে বহু মানুষের মনে সরকার বিরোধী ক্ষোভ উত্তরোত্তর বাড়ছে। দুর্ভাগ্যের কথা হল, এখনও সেই বিরোধীদের এক হওয়ার সেই সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না! সন্দেহ নেই, সমাজের বিভিন্ন স্তরের চাপে এই মুহূর্তে আদৌ স্বস্তিতে নেই জ্ঞানেশ কুমার। যেভাবে জেন জি’র আন্দোলন বাড়ছে তাতে চাপে পড়েছে কেন্দ্রের সরকারও। জ্ঞানেশ কুমার যদি শেষপর্যন্ত ইস্তফা দিতে বাধ্য হন তাহলে তার সিংহভাগ কৃতিত্ব সংগত কারণেই দাবি করতে পারবে জেন জি। কিন্তু বিরোধীদের মূল লক্ষ্য তো এখানেই থেমে থাকতে পারে না। যদিও জ্ঞানেশ কুমারের মনিবদের ক্ষমতাচ্যুত করাই তাদের ‘পাখির চোখ’ বলে দাবি করেন বিরোধী নেতারা। সেটা সম্ভব করতে গেলে নিজেদের মধ্যে লড়াই, মতভেদ আপাতত সরিয়ে রেখে একযোগে ময়দানে নামা দরকার। কিন্তু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এসবই কা কস্য পরিবেদনা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ