প্রাচীনকালে চীন দেশে কোদাল কিংবা ছুরির আকৃতির মুদ্রা প্রচলিত ছিল! এমনকি চাবির আকারের মুদ্রাও লেনদেনে ব্যবহার হত। অভিনব প্রাচীন মুদ্রা নিয়ে লিখেছেনকালীপদ চক্রবর্তী।
প্রাচীনকালে চীন দেশে কোদাল কিংবা ছুরির আকৃতির মুদ্রা প্রচলিত ছিল! এমনকি চাবির আকারের মুদ্রাও লেনদেনে ব্যবহার হত। অভিনব প্রাচীন মুদ্রা নিয়ে লিখেছেনকালীপদ চক্রবর্তী।
পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো চীনেও একসময় বিনিময় প্রথা ছিল। আজকের মতো কাগুজে বা ধাতব মুদ্রার প্রচলন তখনও হয়নি। মানুষ নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করত। খাদ্যশস্য, ধাতব সামগ্রী, এমনকি রেশম কাপড়ও লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হত। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত কিছু জিনিস যেমন— বিভিন্ন হাতিয়ারও একসময় মুদ্রার কাজে ব্যবহৃত হত। এমনকি আমাদের দেশের মতো চীনেও প্রাচীনকালে কড়ি ব্যবহার করা হত বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে।
ইতিহাসবিদ জি ম্যাকডোনাল্ডের মতে, সম্ভবত চৌ রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক চেং ওয়াংয়ের আমলেই (খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতক) চীনে প্রথম মুদ্রার ব্যবহার শুরু হয়। অবশ্য অনেকের মতে, এই মুদ্রা প্রচলন হয় আরও পরে। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম কিংবা ষষ্ঠ শতকে।
প্রাচীন চীনে মুদ্রা তৈরি করতে প্রথমে ধাতু গলানো হত। তারপর সেই গলিত ধাতুকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢেলে বিভিন্ন আকারের মুদ্রা বানানো হত। চীনের মুদ্রার বিশেষত্ব ছিল—এগুলোর আকৃতি অন্য অঞ্চলের মুদ্রার তুলনায় ছিল একেবারেই আলাদা। তখন কোদাল আকৃতির মুদ্রা, ছুরি আকৃতির মুদ্রা, গোলাকার ছিদ্রযুক্ত মুদ্রা, এমনকি চাবির মতো দেখতে মুদ্রাও
চালু ছিল।
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম কিংবা ষষ্ঠ শতকে কোদালের মতো দেখতে এক ধরনের মুদ্রা চালু হয়। যা মূলত ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি হত। শুরুতে এগুলো দেখতে প্রায় আসল কোদালের মতোই ছিল। মুদ্রার হাতলে একটি ছিদ্র থাকত, যাতে সহজে ঝুলিয়ে রাখা যায়। পরে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের দিকে এই মুদ্রাগুলো আকারে ছোটো হয়ে আসে এবং আসল কোদালের সঙ্গে মিলও কমে যায়।
কোদাল মুদ্রার মতোই দেখতে আরেক ধরনের মুদ্রা উত্তর চীনে বেশ জনপ্রিয় ছিল, যাকে বলা হত ‘পু’ মুদ্রা। ধারণা করা হয়, এটি কোদাল মুদ্রা থেকেই বিকশিত হয়েছিল। এই মুদ্রার একপাশে ওজন ও অন্যান্য তথ্য খোদাই করা থাকত। অন্য পাশে লেখা না থাকলেও তিনটি লম্বা দাগ দেখা যেত। আকারে ছোটো হলেও
এর হাতল তুলনামূলকভাবে
চওড়া ছিল।
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা শুনলে অবাক হবে যে, একসময়ে চীনে ছুরি আকৃতির মুদ্রারও প্রচলন ছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে চীনে এই ছুরির মতো দেখতে মুদ্রার প্রচলন ছিল। এগুলোকে বলা হত ছুরি মুদ্রা। যদিও সেগুলো দেখতে ছুরির মতো ছিল কিন্তু তাতে ধার থাকত না। কোদাল মুদ্রার মতোই এর হাতলেও ছিদ্র থাকত। সাধারণত ৫ থেকে ৭ ইঞ্চি লম্বা এই মুদ্রাগুলোর গায়ে টাঁকশালের নাম, আঞ্চলিক শাসকের নাম বা প্রতীক চিহ্ন খোদাই করা থাকত।
চীনের সম্রাট কিন শি হুয়াং (খ্রিস্টপূর্ব ২২১–২২০) পুরানো মুদ্রার পরিবর্তে গোলাকার এবং মাঝখানে ছিদ্রযুক্ত এক নতুন ধরনের মুদ্রা চালু করেন। ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি এই মুদ্রার গায়ে এর মূল্য বা মান লেখা থাকত। সাধারণত ২ থেকে ৩ ইঞ্চি ব্যাসের এই মুদ্রার ওজন ছিল ৬ থেকে ১০ গ্রাম।
খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে ওয়াং মাং নামে এক শাসক তাঁর রাজ্যে চাবির মতো দেখতে এক ধরনের মুদ্রা চালু করেন। এগুলো সাধারণত সোনার তৈরি ছিল এবং দৈর্ঘ্যে প্রায় তিন ইঞ্চি হত।
প্রাচীন চীনের বেশিরভাগ মুদ্রাই ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি হত। একটা সময় আবার মুদ্রায় ছবি বা প্রতীক ব্যবহার করা হত না, বরং খোদাই করা লেখার মাধ্যমেই মুদ্রা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানা যেত। সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রাচীন চীনের মুদ্রাগুলো ছিল অত্যন্ত বৈচিত্রপূর্ণ এবং ইতিহাসের দিক থেকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।