আনন্দমঠ, ভারতমাতা ও দুর্গাপুজো
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত

Advertisement

ভারতমাতা • স্বদেশকে মাতা হিসাবে গণ্য করা ঠিক কবে থেকে শুরু হল? সবথেকে বেশি আলোচিত চর্চা, সম্ভবত প্রত্যক্ষভাবে জন্মভূমিকে জননী হিসাবে বিবেচনা করার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল ‘বন্দেমাতরম’ রচনাই। কিন্তু ‘বন্দেমাতরম’ রচনার কিছু বছর আগেই ১৮৬৮ সালের ১১ এপ্রিল কলকাতায় ‘হিন্দুমেলা’ উপলক্ষ্যে জোড়াসাঁকোর সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন একটি গান, ‘মিলে সব ভারত সন্তান।’ এই গানের একটি পংক্তি রয়েছে, ‘ছিন্ন ভিন্ন হীন বল, ঐক্যেতে পাইবে বল/ মায়ের মুখ উজ্জ্বল করিতে কী ভয়?/ হোক ভারতের জয়।’ অর্থাৎ নাগরিকদের স্বদেশের সন্তান আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। একজোট হয়ে বলবান হয়ে মায়ের মুখ উজ্জ্বল করার আহ্বান। মা, অর্থাৎ ভারত। 
এই যে ভারতকে মাতা হিসাবে অভিহিত করার প্রবণতা, লক্ষ্য করা গেল বঙ্গসংস্কৃতির মধ্যেও কয়েক বছরের মধ্যেই তা বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। কবি, নাট্যকাররা গ্রহণ করছেন এই প্রবণতা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে বছর বন্দেমাতরম রচনা করেছেন, সেই ১৮৭৫ সালের ১ মার্চ দ্য গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটকের নাম সুরেন্দ্র বিনোদিনী। এই নাটকে বিপ্লবের একটি তীব্র আখ্যান দেখানো হয়। ইংরেজ এক ম্যাজিস্ট্রেট বিদ্রোহী বন্দিদের আক্রমণে নিহত হয়েছিলেন। এই নাটক ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম এক পথিকৃৎ। কারণ, এখানে একটি সংলাপ ছিল, ‘এই ইংরাজের অত্যাচার আর সওয়া যায় না। হয় পায়ের শিকল ছিঁড়ব, না হয় মরব’। আবার এই নাটকেরই একটি গানের কথা ছিল, ‘শোক সাগরেতে ভাসি/ ভারত মা দিবানিশি...কে এখন নিবারিবে জননীর অশ্রুজল’। এখানেও ভারতকে সরাসরি মাতা আখ্যা দেওয়া হল। স্বাভাবিকভাবে এই নাটক সহ্য করেনি ব্রিটিশরাজ। তিনদিনের মধ্যে ৪ মার্চ নাট্যকার উপেন্দ্রনাথ দাস, অভিনেতা অমৃতলাল বসুদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে। বোঝাই যাচ্ছে, ভারতকে মাতা হিসাবে ভাবছে বাঙালি এবং বিদ্রোহের আভাস দিচ্ছে, এই বার্তায় যথেষ্ট শঙ্কিত হয়ে যায় ব্রিটিশরা। ১৮৮০ সালে আনন্দমঠ নামে এক ধারাবাহিক উপন্যাসে বন্দেমাতরম গানকে অন্তর্ভুক্ত করে বঙ্কিমচন্দ্র কার্যত বঙ্গহৃদয়ে প্রোথিত করেন স্বদেশ চেতনাকে। মন্ত্রের নাম— ‘বন্দেমাতরম’। শ্লোক হয় ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী।’ এই প্রবণতায় প্রভাবিত হয়েছিলেন জোড়াসাঁকোর কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৮৫ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যা জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গাওয়া হয়, তা ছিল রবীন্দ্রনাথের লেখা। সেই গানেও ভারতমাতার আহ্বান। গানটি ছিল, ‘আমরা মিলেছি মায়ের ডাকে’।  
ক্রমেই স্বদেশ ও জন্মভূমিকে জননী হিসাবে পরিগণিত করা একটি ধর্মে পরিণত হল যেন। রজনীকান্ত সেনের ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই/ দীন দুখিনী মা যে তোদের তার বেশি আর সাধ্য নাই’ গানের মধ্যে দীন দুখিনী হিসাবে যখন স্বদেশকে বর্ণনা করা হচ্ছে, তখন বোঝাই যাচ্ছে এটি হল স্বদেশি কাপড় ব্যবহারের এক আকুল আহ্বান। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই বাংলার রেনেসাঁকালে জননী হিসাবে যখন জন্মভূমিকে গ্রহণ করা হয়েছিল, তখন কি সকলেই ভারতমাতা ভেবেছেন? নাকি বঙ্গমাতার রূপও অঙ্কন করা হয়েছে হৃদয়ে? এই প্রশ্ন সঙ্গত। কারণ, সত্যিই বহু কবিতা, গানে, স্লোগানে বিভিন্ন সময়ে নিছক ভারতমাতা নয়, বঙ্গমাতাও সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ রচনায় স্পষ্ট যে, বঙ্গদেশ তাঁর কাছে মাতা।
ভারতমাতা শব্দটি অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর চিত্রটির কারণে। যে ‘ভারতমাতা’রূপী এক নারীচিত্র ১৯০৫ সালে তিনি অঙ্কন করেছেন, তাঁর পোশাক গেরুয়া। চার হাতে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও ধ্যানের প্রতিচ্ছবি। অবনীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন, এই চিত্র তিনি প্রথমে বঙ্গমাতার কল্পনায় সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু পরে স্বদেশচেতনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারতমাতা আখ্যা দেন। সুতরাং জন্মভূমিকে জননী হিসাবে কল্পনা করার সেই যুগে বঙ্গমাতারই যেন সম্প্রসারিত রূপ পরিগ্রহ করেছিল ভারতমাতা। এই প্রবহমান ধারায় অন্যতম জোরালো এক উচ্চারণ ছিল, কাজী নজরুল ইসলামের ‘কান্ডারি বলো ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র’ তীব্র বার্তা।  
বঙ্গভঙ্গের সময় রবীন্দ্রনাথ সরাসরি ভারতকে শুধু মাতা নয়, দেবী হিসাবেও যেন কল্পনা করলেন। তাই ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ গানে তিনি লিখলেন ‘ডান হাতে তোর খড়্গ জ্বলে বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ’। সেই বছরই সঞ্জীবনী পত্রিকায় কৃষ্ণকুমার মিত্রের একটি প্রতিজ্ঞাপত্র প্রকাশিত হয়। তা হল বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে আমরা বাঙালিরা শুধুই স্বদেশি পণ্য ব্যবহার করব, এমন একটি শপথ। তাতে বলা হয়, ‘আমরা স্বদেশের কল্যাণের জন্য মাতৃভূমির পবিত্র নাম স্মরণ করিয়া এই প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আমরা অতঃপর দেশজাত দ্রব্য পাইতে কোনও বিদেশি দ্রব্য ক্যয় করিব না...।’ লক্ষ্যণীয়, এই প্রতিজ্ঞাপত্রে বলা হচ্ছে মাতৃভূমির নামে শপথ করতে। 
বিপিনচন্দ্র পাল আরও স্পষ্ট করে লিখলেন, আমাদের ইতিহাস আমাদের মায়ের আত্মজীবনী। আমাদের দর্শন আমাদের মায়ের হৃদয়েরই উন্মোচন। আমাদের শিল্প সংস্কৃতি সবই আমাদের মায়ের আবেগের স্ফূরণ। বহির্বিশ্ব তাঁকে চেনে ভারত নামে। বিপিনচন্দ্র পালের অভিমত যেন, ভারতবাসীর আত্মা আসলে ভারতেরই আত্মা।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ প্রসঙ্গে অরবিন্দ ঘোষ ১৯২০ সালে ‘দেশ ও জাতীয়তা’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ রচনা করেছিলেন। সেখানে তাঁর আক্ষেপ ছিল, এই ভারতমাতাকে যেভাবে আমরা বন্দনা করেছি, সেটা ছিল কল্পিত এক রূপ। যাকে ব্রিটিশ দখল করে রেখেছে। সেই মূর্তি যেদিন আমাদের সামনে পূর্ণাঙ্গভাবে উদ্ভাসিত হবে, স্বাধীনতা, ঐক্য এবং প্রগতি তাঁকে বরণ করে নেবে। সুতরাং বঙ্গমাতা, ভারতমাতা এবং স্বাধীনতা যেন ওতপ্রোতভাবে মিলে গিয়েছিল তাঁদের প্রত্যেকের মনন চিন্তন ও স্বপ্নে। 

আনন্দমঠ • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতমাতা এবং আনন্দমঠের সন্তান দলের জননী জন্মভূমিশ্চ ভাবনার মধ্যে সাদৃশ্য আছে? নাকি দু’টি ভিন্নধর্মী? আনন্দমঠ উপন্যাসের প্রতিপাদ্য কী? কেনই বা সেখানে স্বদেশকে মাতারূপে অনুভব করার দীক্ষা দেওয়ার হল? ছিয়াত্তরের মন্বন্তর হিসাবে পরিচিত সময়কাল, সেই ১১৭৬ বঙ্গাব্দের দুর্ভিক্ষের সময় বাংলার একাংশে চলছিল চরম অনাহার, মৃত্যু, অন্নের জন্য ভিক্ষা ও হাহাকার। এই প্রেক্ষাপটে স্বদেশমাতাকে এই ভিক্ষুক অবস্থা থেকে রক্ষা করে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে স্বদেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের কাহিনি হল আনন্দমঠ। এই কাহিনির তিনটি পক্ষ রয়েছে—মুসলমান নবাব, ইংরেজ বণিক এবং সন্তান দল। সন্তান দল চেয়েছিল যুদ্ধ করে মুসলিমদের রাজত্ব থেকে বঙ্গদেশকে উদ্ধার করে আবার হিন্দুরাজত্ব প্রতিষ্ঠা। কিন্তু যুদ্ধশেষে সন্তান বাহিনির সত্যানন্দ দুঃখিত চিত্তে নিজের নিরাশা প্রকাশ করে জানায় যে, মুসলিমদের পরাজয়ে তাদের রাজত্ব অবসান হলেও হিন্দুদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা গেল না! তাহলে কি আমাদের চেষ্টা ব্যর্থ? কারণ, এখন তো ইংরেজদের হাতে গেল মাতৃভূমি! তাহলে কেন এত কষ্ট করে এই যুদ্ধ-রক্তপাত? সত্যানন্দ শপথ করে বলেছিলেন, তাঁর কাজ শেষ হয়নি। ‘শত্রশোণিতে সিক্ত করিয়া মাতাকে শস্যশালিনী করিব’। তাঁকে বলা হয়, শত্রু কে? শত্রু তো আর নেই! ইংরেজ মিত্ররাজা!  
একথা কিন্তু সত্যানন্দ মেনে নেয়নি। ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধ করার শক্তি কারও নেই, একথা যখন তাঁকে মহাপুরুষ বলেছিলেন, তখন পালটা সত্যানন্দ জানিয়ে দেন যে, যদি সেই শক্তি না থাকে, তাহলে, মাতৃপ্রতিমার সামনে তিনি দেহত্যাগ করবেন। অর্থাৎ সত্যানন্দ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁর লক্ষ্য নিছক মুসলিম রাজত্বের অবসান নয়, মুসলিমদের সরিয়ে ইংরেজের হাতে শাসনক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য সন্তান দল বিদ্রোহ করেনি! প্রকৃত স্বাধীনতা এল না! অতএব তিনি যে নিরাশ, একথাও স্পষ্ট করে দেন। তাঁর এই আশা নিরাশার দ্বন্দ্বের মাধ্যমে কাহিনির সমাপ্তি। মহাপুরুষের সঙ্গে সত্যানন্দ হিমালয় শিখরে চলে গিয়েছিলেন। এবং সেই সমাপ্তির মধ্যে রয়েছে এক সংকেত। বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন, সত্যানন্দ প্রতিষ্ঠা, মহাপুরুষ বিসর্জন। বিসর্জন আসিয়া প্রতিষ্ঠাকে লইয়া গেল। 
ওই যে মাতৃপ্রতিমার সামনে দেহত্যাগ করতে চাইলেন সত্যানন্দ, সেরকম মাতৃপ্রতিমা  ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে বারংবার আবির্ভূত হয়েছে। সেখানেও রয়েছে সংকেত। জন্মভূমিকে মাতৃভূমি হিসাবেই বন্দনা করেছে সন্ন্যাসী দল। কিন্তু সেই রূপের মধ্যে যেন রয়েছে পৃথক স্তর। একক নয়। আনন্দমঠের বিখ্যাত গান বন্দেমাতরম নিয়ে আলোচনায় স্পষ্টভাবেই বলা হয় যে, জন্মভূমিকে বঙ্কিমবাবু সম্পূর্ণভাবে দেবীমূর্তি হিসাবেই কল্পনা করেছেন।  প্রথমে দেখা গেল, স্ত্রী এবং কন্যাকে হারিয়ে ফেলে উন্মাদপ্রায় মহেন্দ্র যখন তাদের সন্ধান করছিল, তখন তাকেই ডাকাত ভেবে আটক করে সেপাই। এরপর মহেন্দ্রকে উদ্ধার করে সন্তান দল। কিন্তু যারা তাকে উদ্ধার করেছে তাদের আচার আচরণ ও কথা শুনে মহেন্দ্রর নিশ্চিত ধারণা হয় যে এরা ডাকাত। কিন্তু সে নিজেকে বিযুক্ত করতে পারল না। কারণ সন্তানদের অন্যতম ভবানন্দ তাকে বললেন, তোমার স্ত্রী কন্যার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে পারব। মহেন্দ্র শিহরিত। এরপর তো আর কথা চলে না। সঙ্গে যেতেই হবে। অতএব মহেন্দ্র ভবানন্দকে অনুসরণ করল। একটি প্রান্তর পেরনোর সময় ভবানন্দ চেষ্টা করলেন, মহেন্দ্রর সঙ্গে কিছু কথোপকথনের। কিন্তু মহেন্দ্র আগ্রহ না দেখানোয় নিজের মনেই ভবানন্দ একটি গান গাইতে শুরু করে। সেই গানই হল, বন্দেমাতরম। 
প্রথমাংশ শুনে মহেন্দ্র বিস্মিত হয়ে জানতে চায়, মাতা কে? ভবানন্দ উত্তর দেয়নি। পরবর্তী স্তবক শুনে মহেন্দ্র যেন আরও বিস্মিত হল। সে বলল, ‘এ তো দেশ, এ তো মা নয়’...। ভবানন্দ বললেন, আমরা অন্য মা মানি না। জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী। তিনি জানালেন, আমাদের মা-বাবা-ভাই-বন্ধু কেউ নেই। আছে শুধু সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা শস্যশ্যামলা। তিনিই মা। এই গানের মধ্যেই স্পষ্টভাবে পরবর্তী স্তবকগুলিতে বলে দেওয়া হল, স্বদেশমাতার রূপ কেমন হবে। ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী। কমলা কমল-দলবিহারণী। বাণী বিদ্যাদায়িনী নমামি ত্বাং। 
মহেন্দ্র এরপর প্রশ্ন করে, তোমরা কারা? ভবানন্দ উত্তর দেন, আমরা সন্তান। মহেন্দ্র আবার বলল, সন্তান কী? কার সন্তান? ভবানন্দ এবার জানালেন, মায়ের সন্তান।
মনে হ঩তেই পারে সন্তানদের কাছে, বঙ্কিমবাবুর কাছেও জন্মভূমি এবং দশভুজা দুর্গা একই। কিন্তু এটাই সম্পূর্ণ রূপ নয়। অবশেষে মহেন্দ্র যখন ‘আনন্দমঠ’ নামক এক আশ্রমসদৃশ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিল, তখন তাঁকে একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সে দেখল এক বিষ্ণুমূর্তি। যাঁর কোলে এক মোহিনী মূর্তি। বঙ্কিমচন্দ্র লিখছেন,‘লক্ষ্মী সরস্বতীর অধিক সুন্দরী, লক্ষ্মী সরস্বতীর অধিক ঐশ্বর্যান্বিতা। গন্ধর্ব, কিন্নর, দেব, যক্ষ, রক্ষ তাঁকে পূজা করিতেছে।’ এবার এক ব্রহ্মচারী তাকে প্রশ্ন করছেন, বিষ্ণুর কোলে কী আছে দেখেছ? মহেন্দ্রর উত্তর, হ্যাঁ  দেখেছি, কে উনি? সেই ব্রহ্মচারী বলেছিলেন, মা, আমরা যাঁর সন্তান। আবার মহেন্দ্র বলে, কে তিনি? ব্রহ্মচারী বলেন, সময়ে চিনবে। বলো বন্দেমাতরম! 
আবার আনন্দমঠে জন্মভূমিকেই তিনটি রূপে প্রতিভাত করলেন বঙ্কিমচন্দ্র।  একটি ঘরে অপরূপ এক অলংকার পরিহিতা জগদ্ধাত্রী দেবীকে দেখে মহেন্দ্রর আবার প্রশ্ন, ইনি কে?
এবার ব্রহ্মচারী সংকেতময় বাক্যে বললেন, মা, যা ছিলেন। আবার অন্য এক সুড়ঙ্গ পেরিয়ে একটি ভিন্ন ঘরে তমসাচ্ছন্ন নগ্নিকা কঙ্কালমালিনী বিবরণ দিয়ে একটি প্রতিমাকে দেখিয়ে সেই ব্রহ্মচারী বললেন, মা যা হইয়াছেন। 
তারপর সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন যেন রাত্রিকাল পেরিয়ে হঠাৎ সূর্যরশ্মিতে উজ্জ্বল এক স্থানে অন্য এক প্রতিমার সামনে উপস্থিত হয়ে বললেন, এই, মা যা হইবেন। এই প্রতিমাটি ছিল চিরকালীন দূর্গাপ্রতিমা। দশভূজে ১০টি অস্ত্র। দুই দিকে লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক ও সরস্বতী। বঙ্কিমের ভাষায়,  কেউ ভাগ্যরূপিণী, কেউ বিদ্যাবিজ্ঞানদায়িনী, কেউ বলদানকারী এবং গণেশ কার্যসিদ্ধিরূপী। এই প্রতিমা সন্তানদের কাছে স্বাধীন জন্মভূমি। কারণ, ওই যে বলা হল, এই হল সেই মূর্তি, যা মা হবেন! মনে রাখতে হবে, এই ভাবটিই কিন্তু কমবেশি অরবিন্দ ঘোষের সেই নিবন্ধের উপজীব্য ছিল। পার্থক্য হল, অরবিন্দ ঘোষ ব্রিটিশের হাতে বন্দি দেশমাতার মুক্তি চেয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপের কল্পনা করেছিলেন। আর বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠে দেখাচ্ছেন সন্তান দলের লক্ষ্য দেশমাতৃকাকে মুসলিম শাসন থেকে উদ্ধার করা।
১৭৭০ সালে যখন দুর্ভিক্ষ ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ হয়, সেই সময় খাজনা আদায় করার দায়িত্ব হাতে দিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু কাগজে কলমে নবাবি ছিল মুবারক আলি খানের হাতে। সেই কার঩ণেই হয়তো বঙ্কিম নবাবি থেকে মুসলিম শাসনের অবসানের উদ্দেশ্যে বিদ্রোহ দেখাতে চেয়েছেন।  কিন্তু আদতে মুবারক আলি খান ছিলেন স্রেফ পুতুল। সব অধিকার কেড়ে প্রকৃত শাসক ছিলেন গভর্নর জন কার্টিয়ার। 
মহেন্দ্র সেদিন প্রত্যক্ষ করলেন, এই জ্যোতির্ময়ী দেবীকে স্বদেশভূমি হিসাবে কল্পনা করেও কোনো পৃথক মন্ত্র রচনা না করে দশভূজার সামনে সেই ব্রহ্মচারী সরাসরি উচ্চারণ করেছিলেন, সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে/ শরণ্যে ত্রম্ব্যকে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে!
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতমাতা গেরুয়াবসনধারী অন্ন, বস্ত্র, জ্ঞান, ধর্মের প্রতিমূর্তি। আর বঙ্কিমচন্দ্রের স্বদেশভূমি দশপ্রহরণধারিণী।

দুর্গামাহাত্ম্য • প্রবল প্রতাপশালী প্রতিপক্ষকে পরাভূত করতে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীন কাহিনিতে বারংবার দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে। দেবতাদের প্রয়োজন পড়েছে কখনো মহামায়ার। যিনি মধূ কৈটভ নামক দু‌ই অসুরকে মায়ার আচ্ছন্ন করবেন। এবং বিষ্ণুকে সহায়তা করবেন তাদের বধ করতে। আবার রক্তবীজ থেকে শুম্ভ নিশুম্ভের অবসানে ত্রাতা হয়েছেন দেবী। অসুর মানেই অত্যাচারী। অসুর অর্থাৎ দুষ্ট। সেই দুষ্টের দমন করা দরকার। অত্যাচারী শাসকরা সর্বদাই  অমরত্ব চায়। রম্ভাসুর এবং এক সুন্দরী মহিষীর সন্তান মহিষাসুরও প্রবল প্রতাপশালী। সে অমর হতে চায়। সেই লক্ষ্যে তপস্যা। কঠোর তপস্যায় প্রজাপতি ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে যথারীতি বর প্রদানে রাজি হলেও অমরত্ব বর প্রদান করা যে সম্ভব নয়, সেকথা জানিয়ে দেন। মহিষাসুর ভুল করে নারীশক্তিকে তাচ্ছিল্য করে ফেলেন। ক্ষমতার মদমত্তে আবেদন করলেন, কোনো পুরুষ যেন আমাকে হত্যা করতে না পারে। ব্রহ্মা তাঁকে আশ্বস্ত এবং সতর্ক করে বলেছিলেন, কোনো পুরুষের হাতে তোমার মৃত্যু হবে না। হবে নারীশক্তির হাতে। স্বাভাবিকভাবে অসুররাজ হয়ে  থাকবে কেন মহিষাসুর! সে ইন্দ্রত্ব দাবি করল। দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য দখল করল। পরাজিত দেবতারা অসুরের এই চরম আস্ফালন ও নিজেদের স্বর্গচ্যূত হওয়ার সুরাহা চেয়ে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের দ্বারস্থ হলে তাঁদের মধ্যে প্রবল এক ক্রোধের সঞ্চার হয়। আর সেই ক্রোধোদ্দীপ্ত তেজে মুখমন্ডল থেকে বাইরে প্রকট হল ক্রোধবহ্নি। যা ধীরে ধীরে পরিণত হল এক জ্যোতির্ময়ী দেবীমূর্তিতে। যেখানে তাঁর উজ্জ্বল শরীর আবির্ভূত হয়েছিল, সেটি ছিল হিমালয়ের এক নির্জন তপাশ্রম। কাত্যায়ন ঋষির তপস্যাস্থল। সেই কারণে সেই আদ্যাশক্তির অন্যতম পরিচয় কাত্যায়নী। শুধু ত্রিশক্তি নয়, সব দেবতার তেজই নির্গত হয়ে সেই দেবীকে করল শক্তিময়ী। এরপর অস্ত্রপ্রদান। দেবতাদের থেকে আয়ূধ এবং যুদ্ধসজ্জা পাওয়া সেই দেবী এরপর যে হুংকার দিলেন, তা শুনে কেঁপে উঠলেন স্বয়ং মহিষাসুর। এই সূত্রপাত দেখেই ত্রিকালদর্শী দেবতারা বুঝে গেলেন, এই দেবীশক্তির জয় অবশ্যম্ভাবী। তাই যুদ্ধ শুরুর আগেই তাঁর নামাঙ্কন হল, জয়া!
এরপর কীভাবে একের পর অসুরকে পরাজিত করে আবার সেই দেবী মহিষাসুরমর্দিনী আখ্যা পেলেন সেই কাহিনিও শ্রীশ্রী চণ্ডীর মাধ্যমে সকলে অবগত। এই যে অত্যাচারী শাসক ও বহিরাগত শক্তি স্বদেশভূমিকে দখল করে স্বদেশবাসীকে পদানত করে রাখার পর, এক দেবীশক্তি আবির্ভূত হয়ে সেই অন্যায় ও অত্যাচারের অবসান ঘটালেন, এই কাহিনি থেকেই স্বদেশকে নারীশক্তির সঙ্গে কল্পনা করার সূত্রপাত। এবং নারীশক্তি এই জগতে মাতার তুল্য কে আছে? অতএব মাতাই স্বদেশ। মাতাই দেবীশক্তি। বহিরাগত বা অন্তর্গত শত্রুকে পরাভূত করতে পারেন নারীশক্তি। সেই শক্তি স্বয়ং স্বদেশমাতা। 
হেমচন্দ্র মল্লিক ও বিপিনচন্দ্র পাল এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। অনুরোধ করলেন, দুর্গামূর্তির সঙ্গে মাতৃভূমির দেবীরূপের সাদৃশ্য কল্পনা করে এমন একটি গান যেন কবি রচনা করে দেন, যেটি শারদীয়া পূজার অনুষ্ঠানে ভক্তি ও উদ্দীপনের সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের অনুরোধে যে গানটি রচনা করেছিলেন, সেটি ছিল,
অয়ি ভূবনমনমোহিনী, মা,
অয়ি নির্মলসূর্যকরোজ্জ্বল ধরণী জনকজননিজননী। 
এই গানের শেষাংশই যেন দুর্গা ও জন্মভূমির মাহাত্ম্যকে এক আবহমানের রূপ উপহার দিয়েছে— ‘চিরকল্যাণময়ী তুমি ধন্য, দেশবিদেশ বিতরিছ অন্ন/ জাহ্নবীযমুনা বিগলিত করুণা পুণ্যপীযুষস্তন্যবাহিনী’
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র