মৃণালকান্তি দাস: আমেরিকার বিরাট সংখ্যক নাগরিক এখনও তাঁর নামটাই ঠিকঠাক উচ্চারণ করতে পারেন না। রাজনীতিতে নেমে ওয়াল স্ট্রিট ও ক্লিন্টন পরিবার অনুগত ডেমোক্র্যাটদেরও চক্ষুশূল হয়েছেন তিনি। তাদের প্রোপাগান্ডা মিডিয়া তাঁর বিরুদ্ধে সীমাহীন অপপ্রচার চালিয়ে গিয়েছে। তবুও তিনি সেই ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিশাল ভোটে হারিয়ে দিয়েছেন অ্যান্ড্রু কুয়োমোকে। যে কুয়োমো কিছুদিন আগেও ছিলেন নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর। যিনি ক্লিন্টনদের মতো ক্ষমতাশালী রাজনীতিকদের ঘরের লোক।
কে এই জোহরান মামদানি? সঙ্গীতে শুরু, রাজনীতিতে উত্থান— বহুমাত্রিক প্রতিভা জোহরানের। ভারতীয় বংশোদ্ভূত জোহরানের জন্ম ১৯৯১ সালে উগান্ডার কাম্পালায়। তবে তাঁর বেড়ে ওঠা নিউ ইয়র্ক শহরে। জোহরানের পিতা উগান্ডার খ্যাতনামা লেখক মাহমুদ মামদানি। মাহমুদেরও শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে ভারতেও। মা প্রখ্যাত ভারতীয় চলচিত্র পরিচালক মীরা নায়ার। ৩৩ বছরের যুবক এহেন জোহরানকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন নিউ ইয়র্কের নাগরিকরা। কারণ, জোহরানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা রাজনৈতিক ভাবনা শুধু তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষকে ঘিরে বিকশিত হয়নি। তিনি উদারনৈতিক মানুষ। তাঁর পরিচয় বা কর্ম শুধু নিজের ধর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। মুসলিমদের জন্য আলাদা কোনও এজেন্ডা তাঁর নেই। তিনি নিউ ইয়র্ক সিটির সব মানুষের সাধারণ সমস্যাগুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। যেমন— বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা, পুলিসি কাঠামোর সংস্কার করা, জলবায়ু, ন্যায়বিচার ইত্যাদি। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে এগুলিই প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে। তিনি শুধু মুসলিমদের প্রতিনিধি নন, সব নাগরিকের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আর এ রকম মনোভাবই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে ভোটারদের বিশ্বাস। নির্বাচনে ভোট চেয়েছেন হিন্দি, বাংলাতেও। রীতিমতো বলিউডি সংলাপ আওড়ে প্রচার করেছেন।
কিন্তু তার জন্য তাঁকে অপমানিত হতে হচ্ছে প্রতি পদে পদে। সেই ধারা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, আমেরিকার কুৎসিত মুখোশ খসে পড়ছে। কেউ কেউ বলছেন, এ আসলে ‘সভ্য’ দেশের ‘অসভ্য’ সমাজ! যেমন— রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ব্র্যান্ডন গিল জোহরানের একটা পুরনো ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন, ও হাত দিয়ে ভাত মেখে খায়! কী অসভ্য লোক! ‘আমেরিকায় সভ্য লোকেরা এ ভাবে খায় না! পশ্চিমি আদবকায়দা রপ্ত করতে না চাইলে তৃতীয় বিশ্বে ফিরে যাও!’ ব্র্যান্ডনের ভারতীয় বংশোদ্ভূত স্ত্রী ড্যানিয়েল ডি সুজা স্বামীর সমর্থনে লিখেছেন, ‘আমি বরাবর কাঁটাচামচ ব্যবহার করি। আমার বাবার পরিবারের অনেকে ভারতে থাকেন। তাঁরাও খ্রিস্টান এবং তাঁরাও কাঁটাচামচ দিয়ে খান।’ কিন্তু নেটিজেনরা অনেকেই খুঁজে বার করেছেন ড্যানিয়েলের বাবা দীনেশ ডি সুজার ছবি। দিব্যি হাত দিয়ে খাচ্ছেন! আর একজন দিয়েছেন ব্র্যান্ডনেরই পিৎজা খাওয়ার ছবি। সেই ছবি দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ‘টাকোস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বার্গার খেলে কীভাবে খান দাদা?’ এরপরও রিপাবলিকান ব্রিগেড হাল ছাড়ছে না। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’-এর হয়ে কাজ করা লরা লুমার বলেছেন, তাঁর কুকুরও নাকি জোহরানের চেয়ে বেশি পরিষ্কার আর সভ্যভব্য!
রিপাবলিকান ব্রিগেডের সঙ্গে তাল মিলিয়েছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ফক্স নিউজ উপস্থাপক মারিয়া বার্টিরোমোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ধরা যাক যদি মামদানি জিতেও যান, আমি তো প্রেসিডেন্টই আছি। ওঁকে ঠিক রাস্তায় আসতেই হবে। নইলে কোনও টাকাপয়সা দেওয়া
হবে না। আমি বলতাম যে, আমাদের দেশে কখনও কোনও সমাজতান্ত্রিক থাকবে না। এখন তো দেখছি আমাদের লড়তে হচ্ছে একজন কমিউনিস্টের সঙ্গে! ভাবতেই পারি না একজন কমিউনিস্ট নিউ ইয়র্কের মেয়র হবেন!’
জোহরান মামদানি ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর চেহারা, বাচনভঙ্গি, তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তাঁর পরিচয় কী— এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। কারণ, জোহরান যেসব ইস্যুতে লড়ছেন, সেসব থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে চাইছেন ট্রাম্প। এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বলেছেন, ‘না, আমি কমিউনিস্ট নই।’ তাঁর অনুপ্রেরণা মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। যিনি বলেছিলেন, ‘আপনি একে গণতন্ত্র, ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিজম— যে নামেই চিনুন না কেন, এই দেশে ঈশ্বরের সব সন্তানের জন্য সম্পদের সঠিক বণ্টন দরকার।’ নিউ ইয়র্কের শীর্ষ ধনী ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের উপর কর বাড়ানোর যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা জোহরান নিয়েছেন, তা একদিকে যেমন বাস্তবসম্মত, তেমনই শহরের শ্রমজীবী মানুষের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা। এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিনা মূল্যে বাস পরিষেবা, ঘণ্টায় ৩০ ডলার ন্যূনতম মজুরি দেওয়া এবং ভাড়া স্থিতিশীল রাখা। কারণ, নিউ ইয়র্ক বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ধনী দেশের সবচেয়ে ধনী শহর। অথচ, প্রতি চারজন নিউ ইয়র্কবাসীর একজন দারিদ্র্যের যন্ত্রণার মধ্যে বাস করেন। আর বাকিরা একধরনের দুশ্চিন্তার জালে আটকে। তাঁর কথা স্পষ্ট, আমেরিকার বিলিয়নিয়ার এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষক স্বৈরতান্ত্রিক নেতারাই মার্কিন গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। তাঁদের কারণেই আমেরিকার গণতন্ত্র আজ বিপদের মুখে।
একথা ঠিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অবস্থান আজ আর নেই। রিপাবলিকান পার্টির মতোই তারা বিলিয়নিয়ার ও ইজরায়েল লবির খপ্পরে। গাজা প্রশ্নে বাইডেন আর ট্রাম্পের তেমন কোনও পার্থক্য নেই। কমলা হ্যারিসও দুই কুল রক্ষা করে কথা বলেছেন। সেই তুলনায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য হয়েও জোহরান এসব বিষয়ে অনেক স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। গাজায় ইজরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে জোহরানের সরাসরি সমালোচনা তাঁকে মূলধারার ডেমোক্র্যাট নেতাদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। এই অবস্থানের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও তিনি সেটা মানতে নারাজ। ‘দ্য বুলওয়ার্ক’ নামে এক রাজনৈতিক পডকাস্টে জোহরানকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি ‘ইন্তিফাদার আন্তর্জাতিককরণ হোক’, এমন প্যালেস্তিনীয়পন্থী স্লোগানের নিন্দা জানাবেন কি না। অনেক ইহুদি এই স্লোগানকে ইহুদিবিদ্বেষী ও হিংসাত্মক আহ্বান হিসেবে দেখেন। কিন্তু জোহরান
এ নিয়ে কোনও নিন্দা জানাতে রাজি হননি। তবে
এও বলেন, এই ধরনের ভাষা তিনি ব্যবহার
করেন না। অন্যরা কী বলবে, সেটাও তিনি ঠিক
করে দিতে চান না। তাঁর অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট
ট্রাম্প প্যালেস্তিনীয়পন্থীদের মুখ বন্ধ করতে গিয়ে সেটাই করছেন।
জোহরান বিলিয়নিয়ারদের দ্বারস্থ না হয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটে গিয়েছেন, তাঁদের চাহিদার কথা শুনেছেন, সেভাবে ইস্তাহার সাজিয়েছেন। এখন ফ্রি বাস, ফ্রি চাইল্ডকেয়ার, সরকারি গ্রোসারি— এসব ধারণা ইউরোপ বা বিশ্বের অনেক দেশেই আছে, কিন্তু আমেরিকায় সেই ভাবনা নিঃশব্দ বিপ্লব তো বটেই। স্বাভাবিকভাবেই জোহরানকে নিয়ে ডেমোক্র্যাট দলেরও একাংশের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকে মনে করছেন, জোহরানের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের চিন্তাধারা রিপাবলিকানদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিতে পারে। এতে আগামী বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের ‘অতি বামপন্থী’ হিসেবে আক্রমণ করার সুযোগ পাবে রিপাবলিকানরা। ডেমোক্র্যাট পার্টির নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল, সেনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমারসহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ডেমোক্র্যাট নেতা এখনও পর্যন্ত জোহরান মামদানিকে সমর্থন দেননি। তবে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ পর্যায়ের অস্বস্তিকে পরোয়া করছেন না নিউ ইয়র্কের তরুণ সমাজ। তাঁদের ভোটই উপচে পড়েছে জোহরানের ভোট বাক্সে।
সেই সূত্র ধরেই মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স লিখেছেন, ডেমোক্র্যাটরা চাইলে সেই তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নকে অবহেলা করতে পারেন, যে প্রজন্ম সম্ভবত তাদের মা-বাবার চেয়েও খারাপ সময়ের মুখোমুখি হবে। ডেমোক্র্যাটরা চাইলে কোটি কোটি ডলার চাঁদা দেওয়া ধনকুবের আর বাস্তবতা না-জানা সেই পরামর্শকদের উপর নির্ভর করে চলতে পারেন, যাঁরা লাখ লাখ ডলার খরচ করে দলের প্রচারে একঘেয়ে, ক্লিশে ও সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বহীন ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন বানান। ডেমোক্র্যাটরা চাইলে সেই ভয়াবহ বাস্তবতাকেও এড়িয়ে যেতে পারেন, যে বাস্তবতায় আমেরিকার কোটি কোটি নাগরিক গণতন্ত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কারণ, তারা অনুভব করে না, প্রশাসন তাদের জীবনযন্ত্রণা বোঝে বা কোনও সমাধান দিতে চায়। অথবা ডেমোক্র্যাটরা চাইলে জোহরান মামদানির বিজয় থেকে একটি শিক্ষা নিতে পারেন। সেই শিক্ষা হল, মানুষের মুখোমুখি হয়ে প্রকৃত অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটগুলি সাহস করে তুলে ধরতে হবে। সেই সঙ্গে ধনী শ্রেণির লোভ ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে এবং এমন একটি কর্মসূচির পক্ষে লড়তে হবে, যা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনকে উন্নত করতে পারে। প্রচারজুড়ে জোহরান সেই সব কথাই বলে গিয়েছেন।
নিউ ইয়র্কের মেয়র হতে হলে জোহরানকে আরও একটি নির্বাচনে লড়তে হবে। সেখানে তাঁর লড়াই রিপাবলিকান পার্টির মনোনীত প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ার বিরুদ্ধে। যদি সেই ভোটেও জয়ী হন, তবে তিনিই হবেন নিউ ইয়র্কের প্রথম ইসলাম ধর্মাবলম্বী মেয়র। কিন্তু সে পথ বড় কঠিন! ঠিক যেমন ভারতে এখন মুসলিম নাম শুনলেই ‘ফোবিয়া’ কাজ করে, আমেরিকাতেও তেমনই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প থেকে শুরু করে আমেরিকার সমাজের একাংশ এখন তাঁর বিরুদ্ধে, এবং তাঁর অভিবাসী পরিবারের বিরুদ্ধে নিকৃষ্টতম অপপ্রচারে ব্যস্ত।
জোহরান ঘোষণা করেছেন, ‘আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন— একজন প্রগতিশীল মুসলিম অভিবাসী, যে সত্যিকারের বিশ্বাস থেকে লড়ে।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ট্রাম্পের অভিবাসন
নীতি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। তাঁকে আটকাতে
মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের সুপার প্যাক, নামীদামি মানুষের সমর্থন, পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদমাধ্যম— সব নামানো হয়েছে। তবুও জোহরান মামদানি এখনও অপরাজিত!