Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অমৃতকথা

তৃতীয় অধ্যায়ের শুরুতেই দেখি অর্জুনের প্রশ্ন পেখম মেলেছে। এখন অর্জুন আর নীরব শ্রোতা নন। হতোদ্যম ব্যক্তি নন। দিক্‌ভ্রান্ত নন। ধীরে ধীরে তাঁর চেতনায় প্রাণের সঞ্চার।

অমৃতকথা
  • ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তৃতীয় অধ্যায়ের শুরুতেই দেখি অর্জুনের প্রশ্ন পেখম মেলেছে। এখন অর্জুন আর নীরব শ্রোতা নন। হতোদ্যম ব্যক্তি নন। দিক্‌ভ্রান্ত নন। ধীরে ধীরে তাঁর চেতনায় প্রাণের সঞ্চার। কিন্তু কোথাও যেন কিছুটা বিভ্রান্তি। তিনি স্পষ্ট করে জেনে নিতে চাইছেন। বুঝে নিতে চাইছেন। চাইছেন বোধে নিতে। তাই শ্রীকৃষ্ণের কাছে তাঁর বিনীত প্রশ্ন—হে জনার্দন, (জন নামক অসুরকে বধ করেছিলেন, তাই তিনি জনার্দন) যদি আপনার মতে কর্ম অপেক্ষা জ্ঞান শ্রেষ্ঠ, তবে কেন আমাকে এই ঘোর হিংসাত্মক যুদ্ধে নিযুক্ত করছেন? কেশব, (কেশু নামক দৈত্যকে বধ করেছিলেন বলে তাই তিনি কেশব) সন্দেহ উৎপাদনকারী বাক্য দ্বারা আমার মনকে কেন বিভ্রান্ত করছেন? এই উভয় (কর্ম ও জ্ঞান) পথের মধ্যে যেটি শ্রেষ্ঠ সেটি আমাকে নিশ্চয় করে বলুন যাতে আমি শ্রেয়ের পথ ধরতে পারি।

Advertisement

শ্রীকৃষ্ণ আদর্শ গুরু। তিমিরবিনাশী গুরু। শিষ্যের প্রশ্নে তিনি বিব্রত নন। বরং শিষ্য প্রশ্ন করছে দেখে তাঁর মনে এক নীরব প্রশান্তি। নির্মেদ হাসি। তিনি মনে করলেন তাহলে ঠিক পথেই চালিত করছেন তিনি বিহ্বলচিত্ত অর্জুনকে। তিনি অর্জুনের প্রশ্নের উত্তর ধীর ও শান্ত স্বরে দিতে শুরু করলেন—হে নিষ্পাপ, হে অর্জুন, এই জগতে দুই প্রকার স্থিতি আমার দ্বারা পূর্বে বলা হয়েছে। জ্ঞানমার্গীদের জন্য জ্ঞানযোগ এবং কর্মমার্গের জন্য কর্মযোগ। কর্তব্যকর্ম না করে কেউ নৈষ্কর্ম অর্থাৎ মোক্ষলাভ করতে পারে না। কর্মযোগে চিত্ত শুদ্ধি আত্মবিবেক জাগরিত না হলে নৈষ্কর্ম সিদ্ধি [মোক্ষলাভ] হয় না। কেবলমাত্র কর্ম ত্যাগ দ্বারা কেউ সাধনায় সিদ্ধি লাভ [মোক্ষলাভ] করতে পারে না। কর্ম না করে কেউই ক্ষণকালও থাকতে পারে না। কারণ সকলেই প্রকৃতির অধীন। প্রকৃতির স্বত্ব, রজঃ না তমঃ গুণের প্রভাবে সকলে কর্ম করতে বাধ্য হয়। যে মূঢ় ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ইন্দ্রিয়সকলকে সংযত করে মনে মনে ইন্দ্রিয় বিষয় স্মরণ করে তাকে মিথ্যাচারী বলে। যিনি বিবেকযুক্ত মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়সমূহকে সংযমপূর্বক অনাসক্তভাবে কর্ম করেন তিনিই শ্রেষ্ঠ [হে অর্জুন] সব সময়ে নিজেকে কাজের মধ্যে নিবিষ্ট রাখবে কেননা, নিষ্কর্ম অপেক্ষা কর্মই শ্রেষ্ঠ। কর্মহীন হলে তোমার শরীরধর্মও নির্বাহিত হবে না। আর ঈশ্বরের প্রীতি ছাড়া অন্য কর্ম বন্ধনের কারণ, অতএব হে কুন্তীপুত্র, হে অর্জুন, আসক্তিশূন্য হয়ে কর্ম অনুষ্ঠান করো।
সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রজাপতি ব্রহ্ম, যজ্ঞের সঙ্গে জীব সৃষ্টি করে বলেছিলেন—এই যজ্ঞ দ্বারা বুদ্ধিপ্রাপ্ত হও। এবং এই যজ্ঞ তোমাদের ইষ্টবস্তু দানে কামধেনুস্বরূপ হোক। বলে চলেছেন শ্রীকৃষ্ণ। অনর্গল। অনলস। স্বতঃস্ফূর্ত। বলতে বলতে তিনি উদ্‌ঘাটন করলেন এক অন্যতম চিরন্তন বাণী। এক অমোঘ সত্যের। চির জীবনের বাণী। চির জীবিতের বাণী। দিবে ও নিবের বাণী।
পার্থসারথি গায়েন-এর ‘শ্রীমদ্‌ভগবদ্‌গীতা ও দিব্যজীবন’ থেকে    

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ