অদ্বৈতবাদীর দ্বৈতভাব
সৌরাষ্ট্র দেশে জামনগরে কাটিয়াবাদে ‘টোক্রা স্বামী’ নামে একজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে স্বামী অখণ্ডানন্দের পরিচয় হয়। অদ্বৈতবাদী হওয়া সত্ত্বেও টোক্রা স্বামী সকাল ৭টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত শিবপূজা ইত্যাদি করতেন। কোনো লোক তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি অদ্বৈতবাদী জ্ঞানী, আপনি রোজ এতক্ষণ ধরে পূজা করেন কেন?” তাঁর প্রশ্নের উত্তরে তিনি একটি সংস্কৃত শ্লোক বলেন, যার মানে ‘স্বামী-স্ত্রীতে পরস্পরের ভেতর কোনো কিছু গোপন নেই—পুরো একাত্ববোধ, পরস্পর পরস্পরকে অবাধে দেখে, তবুও স্ত্রী স্বামীকে ঘোমটার ভিতর থেকে দেখে। এ-ও ঘোমটার আড়াল থেকে দেখা।’ পরবর্তী কালে স্বামী অখণ্ডানন্দের মুখে এই কথা শুনে স্বামীজীও খুব তারিফ করেছিলেন।
বিশ্বেশ্বরে চ সুধিয়া গলিতেঽপি ভেদে
ভাবেন ভক্তিসহিতেন সমর্চনার্হঃ।
প্রাণেশ্বরে তু চতুর্যা মিলিতেঽপি চিত্তে
বস্ত্রাঞ্চলৈর্ব্যবহিতোঽপি নিরীক্ষণীয়ঃ।
—জ্ঞানীর পরমাত্মা-জীবাত্মা ভেদবুদ্ধি দূর হলেও সেই পরমাত্মা পূজারই যোগ্য হয়ে থাকেন; যেমন স্বামী-স্ত্রীর নিবিড় ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও (চিত্তে মিলিত হলেও) মাঝে মাঝে ঘোমটার ব্যবধান থেকে স্ত্রী স্বামীকে দেখে থাকেন।
সারগাছি আশ্রমে স্বামী অখণ্ডানন্দ প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় আছে। দিনেরবেলায় উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সন্ধ্যাবেলায় নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা আছে। দু-জন শিক্ষক আছেন। ছেলেরা বিনা বেতনে পড়ে—আশ্রমস্থ ছেলেরা এবং আশেপাশের গ্রামের ভদ্রলোক ও কৃষকদের ছেলেরাও পড়ে। পুরানো আশ্রমে যখন বিদ্যালয়টি ছিল, তখন বিদ্যালয়-ভরতি ছাত্র ছিল। সেটি ছিল গ্রামের ভিতর। বহু ভদ্রলোকের ছেলে পড়ত, কাজেই বিদ্যালয় ভরতি ছিল। এই অঞ্চলের বহু লোক, এখন তারা যুবক—বহু কৃষক ও ভদ্রলোক আশ্রমের স্কুল থেকে লেখাপড়া শিখেছে। আশ্রমের ডাক্তারখানায় ওষুধ বিতরণ করা হয়, ডাক্তার মহারাজের সহানুভূতি আদায় করার জন্য অনেকে ওষুধ নিতে এসে বলে, “মহারাজ, আমরা আশ্রমের স্কুলের ছাত্র, এখানে অনেক দিন পড়েছি।” আশ্রমের স্কুলের ছেলেরা কিন্ডারগার্টেন প্রভৃতি শিক্ষায় জেলার অন্যান্য স্কুলের ছেলেদের চেয়ে অনেক উন্নত, এরকম সুখ্যাতি বিদ্যালয় পরিদর্শকেরা করতেন। স্বামী অখণ্ডানন্দ বলেন, “সরকারি বিদ্যালয়ে প্রবর্তিত হওয়ার বহু পূর্বে এই বিদ্যালয়ে সিস্টার নিবেদিতার পরামর্শে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রণালী অর্থাৎ এসব নতুন শিক্ষাপদ্ধতির প্রচলন হয়।” স্বামী অভেদানন্দও আমেরিকা থেকে পুস্তকাদি পাঠাতেন।


