Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভক্তি

ভক্তি
  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

যাঁর পরমেশ্বরের প্রতি পরাভক্তি এবং পরমেশ্বরের প্রতি যেরূপ গুরুর প্রতিও সেইরূপ ভক্তি আছে, সেই মহাত্মার নিকটেই উপনিষদুক্ত এই সকল বিষয় স্বানুভবযোগ্য হয়। ঐকান্তিক ভক্তির উদয়ে ভক্ত পরমেশ্বরের নিকট থেকে নিকটতর হন। তিনি ভগবানের মাধুর্য, সৌন্দর্য, করুণা এবং প্রেমের কথা বেশি করে ভাবতে থাকেন, ভগবানের মহিমা, শক্তি, জ্ঞান, বিরাটত্ব প্রভৃতির চিন্তা কমতে থাকে। প্রথমে ভক্ত শান্ত ভাব আশ্রয় করেন—ভগবানের প্রতি তাঁর তখন ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা থাকে; জগতের অধীশ্বররূপে তাঁকে তখন অনেক দূরে অবস্থিত বলে মনে হয়। যতই ভক্তি পথে সাধক এগিয়ে যেতে থাকেন ততই ভগবানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিকট থেকে নিকটতর হয়। ভক্তের আন্তরগঠন অনুসারে এটি বিকশিত হয়। যে বিভিন্ন সম্পর্ক ভগবানের সঙ্গে স্থাপিত হয় তা নিম্নরূপ—
১। শাসক এবং শাসিতের সম্পর্ক: জগতের রক্ষক তিনি তাকেও রক্ষা করছেন। ২। প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক ৩। (ক) পিতাপুত্রের সম্পর্ক, (খ) মাতাপুত্রের সম্পর্ক ৪। বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্ক। ভগবান্‌ সেক্ষেত্রে একমাত্র নির্ভরযোগ্য বন্ধু বলে বিবেচিত হন। ৫। ভক্তের ভালবাসা এত গভীর এবং ঘনিষ্ঠ হয় যে তিনি বাৎসল্যভাবে ভগবানকে দেখেন। তখন ভগবানকে দিব্যশিশুরূপে দেখা হয়। পুরুষ ভক্ত দেখেন, তিনি যেন পিতা, ভগবান্‌ যেন তাঁর সন্তান। মহিলা ভক্ত ভাবেন, তিনি যেন মাতা, ভগবান্‌ যেন তাঁর সন্তান। উদাহরণস্বরূপ—শ্রীকৃষ্ণের মা যদিও জানতেন শ্রীকৃষ্ণ সাক্ষাৎ ভগবান্‌ তবুও তিনি মাতৃস্নেহের দৃষ্টিতে শিশু কৃষ্ণকে দেখতেন। মা মেরী যদিও যীশুর দেবত্ব সম্বন্ধে কমবেশি অবহিত ছিলেন, তবুও তিনি স্নেহের চোখেই যীশুকে দেখেছেন। ৬। ভক্ত ভগবানকে দেখেন পরম প্রেমাস্পদ কান্তরূপে।
এই সম্পর্কগুলি অল্পবিস্তর সব ধর্মেই প্রচলিত আছে। খুব অল্প সংখ্যক খ্রীষ্টান মরমী সাধক ভগবানের সঙ্গে মধুর ভাব স্থাপন করেননি। যে কোন একটি সম্পর্ক ঠিক ঠিক প্রতিষ্ঠিত হলে ভক্ত ভগবান্‌ লাভ করতে পারেন। এই সমস্ত সম্পর্কের সারবত্তা শ্রীরামকৃষ্ণজীবনে পরীক্ষিত হয়েছে। তিনি প্রতিটি পথেই ঈশ্বর দর্শন করেছেন। যে সম্পর্কটি ভাল লাগে সেই সম্পর্কটি সব সময় ধরে রাখার চেষ্টা করা উচিত। যাই করতে হোক্‌ না, যেখানেই যেতে হোক্‌ না কেন, সেই সম্পর্কটি সর্বদা ধরে রাখা দরকার। মানসিক গঠন অনুসারে যে কোন একটি সম্পর্কের অনুশীলন দ্বারা ভক্ত এই সত্য উপলব্ধি করেন যে ঈশ্বরই সর্বেসর্বা। তিনি শাসক মাত্র নন, প্রভু মাত্র নন, পিতা মাত্র নন, বন্ধু মাত্র নন ইত্যাদি। তিনি এসবই, এমনকি আরও কিছু যা বর্ণনা করা যায় না।
ভক্ত তখন তাঁর সমগ্র হৃদয় দিয়ে, মন দিয়ে, অন্তর দিয়ে ভগবানকে দৃঢ়ভাবে ধরে থাকেন। ভগবানকে তখন আর সর্বশক্তিমান, সর্বব্যাপী, সর্বদর্শী, স্রষ্টা, শাসক, জগৎপালক রূপে দেখেন না। তিনি তখন তাঁর একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র কল্যাণ বিধাতা, একমাত্র বন্ধু, একমাত্র নির্ভরস্থল, একমাত্র লক্ষ্য। আর কিছুকে তিনি নিশ্চিতরূপে ধরতে পারেন না।  

Advertisement

 
স্বামী সৎপ্রকাশানন্দের ‘ধ্যান সাধনা সিদ্ধি’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ