অনেক তৎপর সাধক ভগবানের জন্য জগতে সব কিছু ত্যাগ করেন—তাঁদের প্রিয়জন, ঘর-বাড়ি, সন্তান-সম্পত্তি সব ছেড়ে তাঁরা নির্জন স্থানে চলে যান। বনে বা জনহীন নদীতীরে বা পর্বতকন্দরে বাস করেন। তাঁরা ভগবানের কাছে অবিরাম প্রার্থনা করেন, অশ্রুবিসর্জন করেন, তাঁর ধ্যান করেন। নির্জনে, শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে ঈশ্বরের অনুসন্ধান করার ধ্যান তপস্যা তাঁর মন শুদ্ধ হয় এবং তখন তিনি দেখেন ভগবান তাঁরই হৃদয় মধ্যে বিরাজ করছেন। এই একটি মাত্র স্থানে মানুষ ভগবানের সঙ্গে মিলিত হয়—ঠিক হৃদয় মধ্যে তিনি অন্তরতম সত্তারূপে বাস করেন। যাঁকে সব থেকে দূরে বলে মনে হয়েছিল তিনি নিকটতম। উদাহরণ দিয়ে বলা হয়—কস্তুরী মৃগ যেমন তারই নাভিসঞ্জাত কস্তুরীর গন্ধের উৎস সন্ধানে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে, সাধকও তেমনি উপযুক্ত গুরুর অভাবে তারই হৃদয় মধ্যে অন্তরতম সত্তারূপে অবস্থিত ভগবানকে এধারে ওধারে খুঁজে বেড়ায়।
গল্পটি এরকম—এক বিশেষ ধরণের হরিণ আছে—যাকে বলা হয় কস্তুরী-মৃগ। বড় হলে এই হরিণের নাভিতে কস্তুরী জন্মায়। কস্তুরীর সুগন্ধ হরিণের নাকে যায়। নিজেরই নাভিতে জাত এই কস্তুরীর সুগন্ধে আমোদিত হরিণ গন্ধের উৎস কোথায় তা সে জানে না। ফলে সে উৎস সন্ধানে বার হয়। এখানে, সেখানে, পাহাড়চূড়ায়, উপত্যকায় সর্বত্র ঘুরে সে ক্লান্ত হয়ে যায় আর তখন শুয়ে পড়ে। হঠাৎ সে আবিষ্কার করে তার নিজেরই নাভি এই সুগন্ধের উৎস। অনুরূপে। পূর্ণতার আদর্শ, সৌন্দর্য্যের আদর্শ, শক্তির আদর্শ, মুক্তির আদর্শ, যা মানুষ সর্বদা খোঁজে তা তারই অন্তরতম সত্তা থেকে উৎসারিত, কারণ তার আত্মাই হল দিব্যস্বভাব, সদা শুদ্ধ, স্বপ্রকাশ, মৃত্যুহীন, মুক্ত এবং পরমাত্মারই সঙ্গে সম্বন্ধ—যেমন সমুদ্র আর তার ঢেউ।
বিপরীতপক্ষে আরও কিছু অনুসন্ধানকারী আছে যারা ভগবানের জন্যই ভগবানকে চায় না, অন্য কোন কারণবশতঃ তাঁকে চায়। তারাও ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে, তাঁকে পূজা করে, তাঁর ধ্যান করে। কিন্তু কেন? ধন-সম্পদের জন্য, শক্তির জন্য, মানুষের সাহায্যের সাধ্যাতীত দুর্গতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। এই জাতীয় সাধকেরাও ক্রমে ভগবানে যথার্থ ভক্তি সম্পন্ন হয়। ক্রমশঃ তারা বুঝতে পারে ভগবানের মাধ্যমে কোন কিছু চাওয়া ঠিক নয়, কারণ ভগবান নিজেই সর্বোচ্চ আদর্শ। তাঁর মধ্যেই সম্পূর্ণ স্ব-পূর্ণতা। তিনিই সমস্ত সৌন্দর্য, সমস্ত জ্ঞান, সমস্ত আনন্দের উৎস। তিনি আবার সেই সঙ্গে কৃপাময়। সুতরাং ভগবানের মাধ্যমে আর কোন কিছু চাওয়া কেন?
আপনি যদি হীরার খনিতে যান, আপনি কি সেখানে নুড়িপাথর কুড়িয়ে বেড়াবেন? স্ফটিক স্বচ্ছ জলের ঝরণার ধারে আপনার পিপাসা নিবারণের জন্য কি আপনি কুয়ো খুঁজবেন? অনুরূপে, কোন কাণ্ডজ্ঞানযুক্ত মানুষ সচ্চিদানন্দখন পরমাত্মার কাছে ক্ষণিক সুখ-সম্পদ চায় না। বেদ বলেন, “সেই আনন্দের কণামাত্রে সমস্ত জীব বেঁচে থাকে।” তাঁর আনন্দের কণামাত্র সমস্ত মানবহৃদয় আনন্দে পূর্ণ করে, তাঁর প্রেমের কণামাত্র মানবহৃদয় প্রেমপূর্ণ করে, তাঁর সৌন্দর্যের কণামাত্র সমস্ত প্রকৃতিকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। সেই উৎসে পৌঁছে, সর্বকৃপাময় দৈবীশক্তি আপনাকে সবকিছু দিতে পারেন জেনেও আপনি কি নশ্বর কিছু চেয়ে বসবেন? এ যেন ছোট শিশুর মত বাবার কাছে খেলনা বা পুতুল চাওয়া—বাবা যে কোন জিনিষ দিতে পারেন একথা জেনেও। যাই হোক্ এই ক্ষণিক সুখানুসন্ধানী ব্যক্তির কালক্রমে শুভ বুদ্ধির উদয় হয়। আজ হোক্ কাল হোক্ ভগবানলাভের জন্য ঠিক ঠিক ব্যাকুলতার উদয় হয়। ভগবানের মাধ্যমে কোন কিছু পাওয়ার পরিবর্তে তারা ভগবানকেই চায়।


