এক পুষ্করিণীতে একটি প্রকাণ্ড পদ্মফুল ফুটেছিলো। পুকুরের পাশ দিয়েই লোক চলাচলের পথ। সে পথে চলেছে এক পথিক। পথিক চলেছে, হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ল সেই পদ্মফুলের দিকে। অপূর্ব সুন্দর ফুলটী। পথিক যেন আর চোখ ফেরাতে পারছে না সে পদ্মফুলের ওপর থেকে। সে ভাবতে লাগল—‘এত সুন্দর ফুল তো আর কখনো কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।’ ভাবতে ভাবতে সে দাঁড়িয়ে-ই পড়ল পুষ্করিণীর ধারে। ভাবতে লাগল—‘এটা কী ফুল?’ কাকে জিজ্ঞাসা করি?
হঠাৎ তার চোখে পড়ল ঠিক সেই ফুলটির নীচে জলের মধ্যে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে একটী ব্যাং, আর একটী মাছ। এদিক ওদিক কোথাও কোনো লোকজন না দেখে সে ব্যাংটীকেই জিজ্ঞাসা করল—‘আরে শোনো তো! তুমি যে ফুলটীর নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওটা কী ফুল রে ভাই?’
ব্যাংটী পথিকের কথা শুনে, ড্যাব ড্যাবা দুটো চোখ মেলে কিছুক্ষণ তো তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। তার পর বলল,— ‘কেন? ওটা নিয়ে তোমার এত কৌতুহলেরই বা কি, আর আশ্চর্য হবারই বা কি? ওটা একটা ফুল। ফুল জীবনে দেখনি?’ বলে লোকটাকে উপহাস করে, সে তার খাদ্য পোকামাকড় খুঁজতে লাগল, যেমন সে খুঁজছিল।
ব্যাংয়ের উত্তর শুনে লোকটী দুঃখিতও হ’ল, আর নিরাশও হ’ল খুব। মনে মনে রাগ করে বলতে লাগল, ‘নিজেই জান না তো, গাধা কোথাকার।’
এবার লোকটী মাছটীকে জিজ্ঞাসা করল—‘আরে ভাই, তুমি আমাকে বলতো, ঐ যে ফুলটা ফুটে আছে, ওটা কি ফুল?’
মাছ ব্যাংয়ের ওপরে আর এক কাঠি। লোকটীর প্রশ্ন শুনে সে তো রেগেই উঠল। বলল,— ‘কী ফ্যাচ ফ্যাচ করছ। শুনলেই তো আমার ব্যাং বন্ধু কী বলল। কানে শোনো না নাকি? ওটা একটা ফুল। ফুল কাকে বলে তাও চেন না।’এই কথা বলে মৎস্যটী ব্যাংয়ের মতই আপন খাদ্য অন্বেষণের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
লোকটী খুব দুঃখিত হ’ল। দুঃখিত হয়ে সে চলার পথে পা বাড়াবে, ঠিক সেই সময় সে দেখল, একটী মৌমাছি তীব্র গতিতে উড়ে আসছে সেই ফুলটীর দিকে। লোকটী যেন অকূলে কূল পেল। তাড়াতাড়ি হাত তুলে সে বলল,— ‘আরে ভাই মৌমাছি, শোনো, শোনো, একটা কথা আছে।’
মৌমাছি উড়তে উড়তেই বলল, — ‘না, না, এখন কথাটথা কিছু নয়। আমার একটুও সময় নেই! কথাটথা পরে হবে।’
বলতে বলতে মৌমাছিটা সোজা গিয়ে ফুলটীর ওপরে বসল। বসেই পদ্মফুলের বুকে যে মধু থাকে তা খেতে লাগল।
মৌমাছির কাণ্ড কারখানা দেখে লোকটি তো স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভাবতে লাগল, মৌমাছিটা ওখানে কী করছে? কী দেখছে ও?
লোকটা আবারও জিজ্ঞাসা করল, ‘আরে এই, কি করছ তুমি ওখানে?’
মৌমাছি তখন মধু খেতে ব্যস্ত। তার কি আর উত্তর দেবার সময় আছে? সে লোকটার কথায় ভ্রূক্ষেপও করল না। একমনে মধু খেয়ে চলল।


