অর্থসর্বস্ব সুখ কেনার চাহিদা আজ আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে এক অমানবিক সাম্রজ্যে। যেখানে অনুভূতি, স্নেহ, ভালোবাসা, আবেগ, ভালো থাকার চাহিদা— সবকিছুকে গ্রাস করে নিচ্ছে কাছের সম্পর্কগুলো। এর ব্যতিক্রম দেখা গেল সম্প্রতি গিরিশ মঞ্চে আয়োজিত ‘লগনচাঁদ’ নাটকটিতে। সমাজের ভিন্ন মেরুতে বসবাস করা দু’জন মানুষের জীবনের কাহিনি ‘লগনচাঁদ’। একদিকে সংসারের অকেজো হয়ে যাওয়া ফেলে দেওয়া নানাবিধ বস্তু কেনাবেচা করা এক যুবক লগন, অন্যদিকে নিজের নীতিতে আর মেজাজে অবিচল থাকা বিপত্নীক বৃদ্ধ উপেনবাবু। তাদের অবস্থানের বিস্তর ফারাক থাকা সত্ত্বেও বড়ো মনের পরিচয়ে কোনো এক জায়গায় দু’জনকে মিলিয়ে দেয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরনো কাগজ কিনে বিক্রি করে লগন। সন্তানসম্ভবা স্ত্রী লক্ষ্মীকে নিয়ে টিনের চালের ঘরে ছোট্ট সুখের সংসার তার। দিব্যি চলে যাচ্ছিল সংসার। তবে আগত সন্তানের কথা ভেবে কিছু বেশি টাকা উপার্জনের চেষ্টায় মদত চাচার বুদ্ধিতে সে খদ্দেরের বাড়ির অন্যান্য ফেলা দেওয়া জিনিস কিনতে আগ্রহী হয়। অন্যদিকে উপেনবাবুর একমাত্র ছেলে তাকে বৃদ্ধশ্রমে পাঠিয়ে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে বলে তাদের পৈত্রিক বাড়িটি বিক্রি করে দিতে বলে। তার বাবা কিছুতেই রাজি হয় না। অগত্যা বাবাকে একা ফেলে রেখে সে চলে যায়। কিন্তু তার বাড়িটা কি হবে? বিকিকিনির পথে লগন মুখোমুখি হয় ওই বৃদ্ধের। প্রোমোটিং করতে দেওয়ায় আগ্রহী নন তিনি। বাড়িটা বিক্রির বরাত পায় লগন। থিয়েলাইট প্রযোজিত নাটকটিতে গল্পের বাঁধন খুব আঁটোসাঁটো না হলেও উপস্থাপনার ভঙ্গিমাটি বেশ অভিনব। বিশেষত শুরুতে যখন মঞ্চে একটি বাজারের দৃশ্য তুলে ধরা হয় সেটা দেখতেও বেশ ভালো লাগে। একই স্টেজে চার-পাঁচটি সিকোয়েন্সকে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবহার করার প্রক্রিয়াটিও দৃষ্টিনন্দন। লগনরূপী শঙ্কু কুমার দাস ও লক্ষ্মী চরিত্রে শম্পা দাস সরকারের সাবলীল অভিনয় মনে রাখার মতো। উপেনদাদুর ভূমিকায় সৌতীন্দ্রকৃষ্ণ দেব প্রশংসনীয়। আধুনিক গানের ব্যবহার, সৌমেন চক্রবর্তীর আলো, স্যামসন মাথুর চক্রবর্তীর আবহ এবং অতনু সরকারের নির্দেশনা, মঞ্চভাবনা নাটকটিকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়।



