পি চিদাম্বরম: একটি একটি ঘুড়ি.., এটি একটি পাখি.., এটি একটি বিমান। ‘এটি কী?’ গত ৬ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত সরকারের তরফে জারি করা যৌথ বিবৃতির জন্য প্রশ্নটি উপযুক্ত। যৌথ বিবৃতিটি অন্তহীন জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে এবং ভারত সরকারের বিশদ বিবরণ এড়িয়ে যাওয়া সন্দেহের মেঘ দূর করতে সাহায্য করেনি। যেহেতু ডোনাল্ড ট্রাম্প চালগুলি দিচ্ছেন, তাই যৌথ বিবৃতিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয় নাও হতে পারে, তবে এটি ভারতের পক্ষে উদ্বেগের বিষয় বইকি।
জারি করা যৌথ বিবৃতিটি প্রতারণার উপর ভিত্তি করে রচিত। ভারতীয় আলোচকরা ২০২৫ সালে বারবার দাবি করেছিলেন যে তাঁরা একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (বিটিএ) নিয়ে কথা বলেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী বহুবার বলেছিলেন যে, অদূর ভবিষ্যতেই এই সংক্রান্ত একটি বিটিএ সম্পন্ন হবে। কথাটি বস্তুত, বর্ষশেষের আগে বলেছিলেন তিনি। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল, যৌথ বিবৃতিটি কোনো বিটিএ নয়, এমনকি কোনো অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিও নয় এটি, বরং এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির কাঠামোমাত্র। ব্যাপারখানা এইরকম দাঁড়াল—আস্ত একটি পাহাড় সরিয়ে আমাদের লভ্য হল একটি মূষিক!
পারস্পরিক সম্পর্ক কোথায়?
যৌথ বিবৃতি জারি হওয়ার পর উভয় পক্ষই
দাবি করেছিল যে সম্পাদিত চুক্তিটি হয়েছে পারস্পরিক। দাবিটি পাঠকের বুদ্ধিমত্তার অপমান ছাড়া কিছু নয়। যৌথ বিবৃতিটি চটপট পড়ে নিলেই বোঝা যাবে যে, এটি পারস্পরিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে রচিত নয়। যৌথ বিবৃতির বয়ানটি (নীচে মোটামুটি তার অনুলিপি দিয়ে দিলাম) ভালো করে দেখে নেওয়া যাক:
• ভারত সমস্ত মার্কিন শিল্পপণ্য এবং বিস্তৃত পরিসরের মার্কিন খাদ্য ও কৃষিপণ্যের উপর শুল্ক বাতিল অথবা হ্রাস করবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের উৎপাদিত পণ্যের উপর ১৮ শতাংশ (২ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে আরোপিত ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে) পারস্পরিক শুল্ক প্রয়োগ করবে। ভারতের ওইসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল ও পোশাক, চামড়া ও জুতো, প্লাস্টিক ও রবার, জৈব রাসায়নিক, গৃহসজ্জা, কারিগরি পণ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রপাতি। কেবলমাত্র ‘অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির সফল সমাপ্তির’ উপর ভিত্তি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জেনেরিক ওষুধ, রত্ন ও হিরা এবং বিমানের যন্ত্রাংশসহ বিস্তৃত পরিসরের পণ্যের উপর পারস্পরিক শুল্ক অপসারণ করবে। এখানে প্রশ্ন হল—শূন্য (০) শতাংশ বনাম ১৮ শতাংশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কোথায়?
• মার্কিন চিকিৎসা সরঞ্জামের বাণিজ্যে দীর্ঘস্থায়ী বাধাগুলির সমাধান করতে এবং মার্কিন আইসিটি পণ্যের (ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি গুডস) বাজারে প্রবেশাধিকার বিলম্বিত করে এমন সীমাবদ্ধ আমদানি লাইসেন্সিং পদ্ধতিগুলি দূর করতে ভারত রাজি হয়েছে। ...মার্কিন খাদ্য ও কৃষিপণ্যের বাণিজ্যে দীর্ঘস্থায়ী নন-ট্যারিফ বাধাগুলির দূরীকরণেও সম্মত হয়েছে ভারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর কোনো সংশ্লিষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। নন-ট্যারিফ বাধার ক্ষেত্রে, বাধ্যবাধকতা (অবলিগেশন) এবং বাধ্যবাধকতা না-থাকার (নো অবলিগেশন) মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কোথায়?
• ভারত আগামী পাঁচবছরে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন জ্বালানি পণ্য, বিমান ও বিমানের যন্ত্রাংশ, মূল্যবান ধাতু, প্রযুক্তি পণ্য এবং কোকিং কয়লা কিনতে চায়। উভয় সরকার প্রযুক্তি পণ্যের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে—যার মধ্যে রয়েছে গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) এবং ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত অন্যান্য পণ্য। এই অনুচ্ছেদে যে সমস্ত পণ্যের উল্লেখ করা হল তার সবই আমেরিকার তরফে ভারতে রপ্তানি পণ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিনতে আগ্রহী ভারতীয় পণ্য কোনোটাই নয়! তাহলে গালভরা পারস্পরিক সম্পর্ক কোথায় গেল?
• যৌথ বিবৃতির সঙ্গে সংযুক্ত একটি এগজিকিউটিভ অর্ডারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের গৃহীত ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের’ কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, রাশিয়ান ফেডারেশনের তেল আমদানি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত। ভারত আরো রাজি হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য। এই ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে একটি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট হয়েছে। ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট ভারতের উপর ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার সেটি তিনি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি আদায় করেনি ভারত। অথচ ট্রাম্পকে তিনটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল। তাহলে এর মধ্যে পারস্পরিকতা কোথায়?
সরাসরি হুমকি
• ভারত প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ফের রাশিয়ান ফেডারেশনের তেল আমদানি শুরু করলে মার্কিন সরকার অতিরিক্ত পদক্ষেপ করার কথা বিবেচনা করবে। তার মধ্যে থাকবে ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক চাপানোর সম্ভাব্য দিকটি। গত ৬ ফেব্রুয়ারি সম্মত পুরো কাঠামোটি একটিমাত্র বিষয়ের উপর নির্ভরশীল, সেটি হল রাশিয়ার তেল। আমেরিকার হুমকি (থ্রেট) এবং ভারতের আনুগত্যের (সাবমিসিভনেস) মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কোথায়?
২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের আগে ভারতীয় পণ্যের উপর মার্কিন শুল্ক ধার্য ছিল মোস্ট ফেভার্ড নেশন (এমএফএন) রেটের ৩ শতাংশ মাত্র। যেহেতু ভারত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত উপভোগ করত, তাই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রশ্নাত্মক জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগসহ ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেন। সেটাই এখন ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। বেশ কয়েকটি দেশের উপর ‘পারস্পরিক’ শুল্কের বৈধতা মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন এবং এটি অসাংবিধানিক আখ্যাসহ বাতিলও করা হতে পারে। যদি সেটাই ঘটে, তাহলে ভারতকে ধন্যবাদ জানাতে হবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নয়। এর ফলে দুই দেশ আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। অথচ ভারতকে কোনো ছাড় বা সুবিধা না দিয়েই ভারত থেকে গুচ্ছ ছাড় নিয়ে নিল আমেরিকা। পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য এতটুকুই!
লুকানো বোঝা
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অজয় শ্রীবাস্তব উল্লেখ করেছেন যে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের উপর শুল্ক ৫০ শতাংশ এবং অটো যন্ত্রাংশের উপর ২৫ শতাংশ বহাল থাকবে। অন্যদিকে, মার্কিন শিল্পজাত পণ্য, অনেক কৃষিজাত দ্রব্য, লাল জোয়ার, সয়াবিন তেল, ওয়াইন ও স্পিরিট, অটোমোবাইল এবং উচ্চমানের মোটরসাইকেলের উপর ‘ভারত আরো ব্যাপক ছাড় দিচ্ছে’।
ধাঁধা হল—ভারত পাঁচবছরে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়ে কী কিনবে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্ষুদ্র বাণিজ্য থেকে ভারতের যে উদ্বৃত্ত রয়েছে সেটি অদৃশ্য হয়ে যাবে। ভারতের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন পণ্য খুব কমই আছে। আমাদের হয়তো বেশি পরিমাণে দামি বিমান অথবা সামরিক সরঞ্জাম এবং চড়া দামের আমেরিকান তেলই কিনতে হবে। অতঃপর, কী করতে হবে সেসব নিয়ে, তা অবশ্য আমরা জানি না।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত