রাজনাথ সিং: ভারতের অন্যতম মহান দূরদৃষ্টিস্পন্ন সংস্কারক ডঃ বি আর আম্বেডকরের আজ ১৩৫তম জন্মবার্ষিকী। ডঃ আম্বেডকরের উত্তরাধিকারকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং অন্যায়ভাবে খাটো করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। শত বছর পরেও তাঁর উত্তরাধিকারের প্রতি সবচেয়ে বড় অন্যায় হল, তাঁকে একজন ‘দলিত নেতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা। আজ তাঁকে শুধুমাত্র দলিত এবং প্রান্তিকদের জন্য লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হয় না, তিনি সর্বদা আধুনিক ভারতের একজন অন্যতম অগ্রগণ্য চিন্তাবিদ হিসেবেও থেকে যাবেন।
তিনি যখন বিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন অন্য ছাত্রদের সঙ্গে তাঁকে একই কল থেকে জল খেতে করতে দেওয়া হতো না। একদিন প্রচণ্ড গরমের সময় তিনি যখন কাছাকাছি জায়গায় জল খেতে গিয়েছিলেন, তখন এই নিপীড়নমূলক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করার সাহস দেখানোর জন্য তাঁকে নিগ্রহ করা হয়। এই ঘটনার পর, বহু পড়ুয়া হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিত, কেউ কেউ হিংসার মাধ্যমে অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু, আম্বেদকর সে-পথে না-হেঁটে শিক্ষার মধ্য দিয়ে তার জবাব দিয়েছিলেন। কলাম্বিয়া এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে ডিগ্রি, সেইসঙ্গে তিনি এমএ, এম-এসসি, পিএইচ-ডি, ডি-এসসি, ডিলিট এবং আইনের ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি চাইলে পুরো জীবন বিদেশে থেকে পড়াশোনা করতে পারতেন। কিন্তু, তিনি তাঁর মার্তৃভূমি এবং কর্মভূমি ভারতেই ফিরে এসেছিলেন।
তাঁর মধ্যে ছিল অতুলনীয় চারিত্রিক দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং সততা। তিনি ছিলেন একজন অগ্রণী সমাজ সংস্কারক, আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক। তাঁর সমস্ত অর্জিত গুণাবলির প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন তিনি মানবাধিকার রক্ষায় এবং দেশ গড়ার কাজে। তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল অনন্যসাধারণ। রাজনীতি থেকে মূল্যবোধ, সমাজবিদ্যা থেকে নৃতত্ত্ব, অর্থনীতি থেকে আইন বিভিন্ন বিষয়ের উপর তিনি বই লিখেছেন।
বাবা সাহেবের দূরদৃষ্টির ফসল হল আরবিআই এবং কেন্দ্রীয় জল কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান। ভারতীয় মুদ্রা ব্যবস্থায় কী কী সমস্যা রয়েছে, তা তিনি তাঁর অর্থনীতিতে পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে বুঝেছিলেন। তাঁর সেই ভাবনার ফলশ্রুতি হল ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সৃষ্টি।
একজন নিষ্ঠাবান গণতন্ত্রপ্রেমী হিসেবে ডঃ আম্বেদকর বিশ্বাস করতেন যে, গণতান্ত্রিক সরকারই সমাজে গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমাজে নীতিবোধ তৈরি না-হলে গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তিনি বলতেন, ‘যদি কোনও নৈতিক শৃঙ্খলা না-থাকে, তবে গণতন্ত্র টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।’ গান্ধীজির মতো আম্বেদকরও সমাজ সংস্কারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন।
ভারতের ভবিষ্যৎ, এর গণতন্ত্র এবং কষ্টার্জিত স্বাধীনতা নিয়ে আম্বেদকর গভীরভাবে চিন্তা করতেন। গণপরিষদে তাঁর শেষ ভাষণে তা প্রতিফলিত হয়েছিল। তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে আম্বেদকর বলেছিলেন, শেষবিন্দু রক্ত দিয়েও আমাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভারতবাসী যদি আত্মতুষ্ট হয়ে পড়েন, তবে ভারত তার গণতন্ত্র এবং দ্বিতীয়বারের জন্য স্বাধীনতা হারাবে। পুনায় এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা একটি সংবিধান পেয়েছি, এটি আমাদের গণতন্ত্র দিয়েছে। খুব ভালো কথা, আমরা আর কী চাই? ... সংবিধান তৈরি হয়ে গিয়েছে, আমাদের কাজ শেষ, এই ধরনের আত্মতুষ্ট অনুভূতির বিরুদ্ধে আমি আপনাদের সতর্ক করছি। কাজ শেষ হয়নি। এর সূচনা হয়েছে মাত্র।’
তাঁর এই সতর্কবার্তাকে সঙ্গী করে ভারতের প্রাণবন্ত গণতন্ত্র প্রায় আট দশক পথ পেরিয়ে এসেছে। তথাপি আজও আমরা দেখতে পাই—কিছু মানুষ জাতি, ধর্ম, ভাষা প্রভৃতির মতো সামাজিক বিভেদমূলক ভাবনার মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে বিভাজনের চেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা নিশ্চিত যে, এই ধরনের বিভেদমূলক ভাবনা ব্যর্থ হবে।
১৯১৮ সালে এক পত্রিকায় বাবা সাহেব বেশকিছু উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, ‘যজুর্বেদ এবং অথর্ব বেদের ঋষিরা শূদ্রদের মহান করে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন এবং এক শূদ্র নিজেই রাজা হয়েছিলেন।’ আর্য এবং দ্রাবিড়দের মধ্যে জাতিগত বৈষম্যের তত্ত্ব ডঃ আম্বেদকর মানতে চাননি।
সংকীর্ণ এবং আঞ্চলিক স্বার্থে যাঁরা ভাষাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, তার বিরোধিতা করেছিলেন আম্বেদকর। ১৯৪৯-এর ১০ সেপ্টেম্বর সংস্কৃত ভাষাকে সমর্থন জানিয়ে গণপরিষদে তিনি একটি সংশোধনী আনেন। ভারতীয়দের মধ্যে যোগাযোগের ভাষা হিসেবে হিন্দির গুরুত্ব তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। এখানে বলা প্রয়োজন, বাবা সাহেব ভালো হিন্দি বলতে পারতেন না, কিন্তু দেশের স্বার্থকে তিনি সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
বাবা সাহেবের ভাবনাকে সামনে রেখে বিগত
১০ বছর ধরে আমাদের সরকার নিরলসভাবে
কাজ করে চলেছে। দেশের ২৫ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার উপরে তুলে আনা হয়েছে। নলবাহিত জল সংযোগ প্রদান করা হয়েছে ১৬ কোটি
বাড়িতে। গরিব মানুষের জন্য আমরা ৫ কোটি বাড়ি তৈরি করে দিয়েছি। ২০২৩-এ প্রধানমন্ত্রী
নরেন্দ্র মোদিজি ‘জনমনঅভিযান’ শুরু করেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল, বিশেষভাবে বিপন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির (পিভিটিজি) আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো। সকলের জন্য স্বাস্থ্যের লক্ষ্যে ‘আয়ুষ্মান ভারত’, প্রধানমন্ত্রী ‘জন আরোগ্য যোজনা' চালু করেছি আমরা।
ডঃ বি আর আম্বেদকর বিশ্বাস করতেন যে, সামাজিক ও আর্থিক গণতন্ত্রের সঙ্গে রাজনৈতিক গণতন্ত্র হাত ধরাধরি করে চলে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্য স্থির করেছেন। বাবা সাহেবের ভাবনার সঙ্গে তাল রেখেই এই লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। বাবা সাহেবের উত্তরাধিকার এবং অবদান সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে অবহিত করতে আমাদের সরকার পঞ্চতীর্থের উন্নতি ঘটাচ্ছে। এই পাঁচটি স্থানের সঙ্গে ডঃ আম্বেদকরের নাম জড়িয়ে রয়েছে। এগুলি হল—মহু (মধ্যপ্রদেশ), নাগপুরের দীক্ষাভূমি (মহারাষ্ট্র), লন্ডনে ডঃ আম্বেদকর মেমোরিয়াল হোম, আলিপুর রোডে মহাপরিনির্বাণ ভূমি (দিল্লি) এবং মুম্বইয়ের চৈত্যভূমি (মহারাষ্ট্র)।
গতমাসে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দীক্ষাভূমি পরিদর্শনে গিয়ে বাবা সাহেবের স্বপ্নের ভারত গড়ার লক্ষ্যে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। আসুন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে খাঁটি ‘ভারতীয়’ হয়ে উঠি আমরা। বাবা সাহেবের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে অবশ্যই তাঁর চিন্তা-ভাবনার কথা গভীরভাবে ভাবতে হবে। তাঁকে একটি বিশেষ শ্রেণির নেতা হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতাও ছাড়তে হবে আমাদের। ডঃ আম্বেদকর হলেন ভারতকে দেওয়া ঈশ্বরের উপহার এবং বিশ্বকে দেওয়া ভারতের উপহার।
লেখক ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী।
মতামত ব্যক্তিগত