শ্রীনগর, ১০ জুলাই: গত বছর পাহেলগামে জঙ্গি হামলার পর জম্মু ও কাশ্মীরে পর্যটন ও তীর্থযাত্রা বড় ধাক্কা খেয়েছিল। তবে এক বছর পর চলতি অমরনাথ যাত্রায় সেই ছবিই একদম বদলে গিয়েছে। এই বছর রেকর্ড সংখ্যক ভক্তের সমাগম দেখা গিয়েছে এই অমরনাথ যাত্রায়। কিন্তু ভক্তদের এই বিপুল উপস্থিতির মধ্যেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে অমরনাথ গুহার প্রাকৃতিকভাবে গঠিত বরফের শিবলিঙ্গের দ্রুত গলে যাওয়ার খবর।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অমরনাথ যাত্রা শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বরফের শিবলিঙ্গের ৯০ শতাংশেরও বেশি অংশ গলে গিয়েছে। কিছু রিপোর্টে এমনও বলা হয়েছে যে, ৫৭ দিনের এই তীর্থযাত্রার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় বরফের শিবলিঙ্গ প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। আর সেই ছবি ও একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। যা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ইলতিজা মুফতি। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে তিনি অমরনাথ যাত্রার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বিষয়টি নিয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ, অমরনাথ গুহার মতো সংবেদনশীল পরিবেশে অতিরিক্ত ভিড় ও অবকাঠামোগত চাপ বরফের শিবলিঙ্গের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাঁর আরো দাবি, ' সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ হাজার তীর্থযাত্রীকে যাত্রার অনুমতি দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সীমা মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সময়ে প্রশাসন অবশ্য চলতি বছরের তীর্থযাত্রায় রেকর্ড সংখ্যক ভক্তের অংশগ্রহণকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে'।
গবেষকদের মতে, অমরনাথ গুহার প্রাকৃতিক বরফের শিবলিঙ্গ দ্রুত গলে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং গুহার অভ্যন্তরের পরিবেশগত পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গুহার ছাদ থেকে যে জলবিন্দু ধীরে ধীরে জমে বরফের শিবলিঙ্গের আকার নেয়, সেই জলের প্রবাহও আগের তুলনায় কমে যেতে পারে। ফলে শিবলিঙ্গ স্বাভাবিকভাবে গঠিত হতে না পেরে দ্রুত গলে যাচ্ছে। আবার অনেকের মতে, বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রী, আলোকসজ্জা এবং সম্প্রসারিত অবকাঠামোও এই বরফ গলে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
অমরনাথ গুহা জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলায়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৮৮৮ মিটার (১২,৭৫৬ ফুট) উচ্চতায় কাশ্মীর হিমালয়ের লিডার উপত্যকার কাছে অবস্থিত। তীর্থযাত্রীরা প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ ধরে গুহামন্দিরে পৌঁছান। গত দুই দশকে অমরনাথ যাত্রাপথে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। রাস্তা প্রশস্ত করা, অস্থায়ী আবাসনের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও সৌর আলোর ব্যবস্থা উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা এসব পরিবর্তনের ফলে তীর্থযাত্রা আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ ও সহজ হয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্র সরকার অমরনাথের জন্য একটি রোপওয়ে প্রকল্পেও অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি, শেষনাগ ও পঞ্চতরণীর মধ্যে একটি প্রস্তাবিত সুড়ঙ্গ নির্মাণ নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই হিমালয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অবকাঠামো নির্মাণ এবং মানব কার্যকলাপের সম্মিলিত প্রভাব অমরনাথ গুহার অভ্যন্তরীণ জলবায়ু এর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।