Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

বিকল্প দুধেও আছে পুষ্টি

আমরা সকলেই জানি  গোরুর দুধ পুষ্টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্স । বিশেষ করে শরীরের রোজকার এবং দীর্ঘমেয়াদি কাজকর্ম চালানোর জন্য আমাদের দরকার পড়ে

বিকল্প  দুধেও  আছে  পুষ্টি
  • ৯ মার্চ, ২০২৫ ১৭:০৩
Prefer us on Google

স্বাগতা মুখোপাধ্যায়: আমরা সকলেই জানি  গোরুর দুধ পুষ্টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্স । বিশেষ করে শরীরের রোজকার এবং দীর্ঘমেয়াদি কাজকর্ম চালানোর জন্য আমাদের দরকার পড়ে একাধিক ভিটামিন, খনিজ এবং অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের। তবে যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকে তাঁদের পক্ষে দুধ অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এমনকী কোনও কোনও ক্ষেত্রে দুধ বিষের সমতুল্য হয়ে যায়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স হওয়ার কারণ হল দুধে থাকা ল্যাকটোজ নামে শর্করা। আর আমাদের শরীরে থাকা যে এনজাইম এই শর্করাকে ভাঙে তার নাম ল্যাকটেজ। কারও কারও শরীরে ল্যাকটেজ কম বেরলে বা একেবারেই না বেরলে তখন শরীরে অন্যান্য এনজাইম এই ধরনের শর্করার সঙ্গে বিক্রিয়া করে ও সেখান থেকে পাকস্থলীতে তৈরি হয় বিষক্রিয়া। দুধ জাতীয় খাদ্য খেলে তাই অনেকেরই ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স তৈরি হয়। দেখা দেয় ডায়ারিয়া, বমির মতো উপসর্গ। এখন প্রশ্ন হল, যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আছে তাঁরা তাহলে কী খাবেন? এক্ষেত্রে সহজ সমাধান হতে পারে উদ্ভিজ্জ দুধ। কারণ আমরা প্রায় সকলেই জানি, যে কোনও প্রাণীজ দুধেই ল্যাকটোজ নামে শর্করা থাকে। সেক্ষেত্রে  যাঁর ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকবে তাঁর ক্ষেত্রে সকল প্রাণীজ দুধেই ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স তৈরি হবে। এমতাবস্থায় তাঁদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হতে পারে উদ্ভিজ্জ দুধ।

Advertisement

উদাহরণ হিসেবে সয়া মিল্ক, পিনাট মিল্ক ইত্যাদির কথা বলা যায়। সাম্প্রতিককালে আমন্ড মিল্কও বাজারে জনপ্রিয় হয়েছে। আসুন দেখা যাক এই ধরনের উদ্ভিজ্জ দুধের পুষ্টিগুণ কতখানি।
সয়া মিল্ক
সমস্ত উদ্ভিজ্জ দুধের মধ্যে সয়া মিল্ক তুলনায় সস্তা। সয়াবিন থেকে প্রস্তুত এই দুধে রয়েছে উচ্চ মাত্রার প্রোটিন। সয়াবীজ থেকে তৈরি করা হয় সয়া দুধ। সয়া মিল্ক-এ কোনওরকম কোলেস্টেরল থাকে না। ফ্যাটের মাত্রাও থাকে সামান্য। বিশেষ করে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা থাকে অত্যন্ত কম। গবেষণায় দেখা গিয়েছে সয়া মিল্ক-এ যে প্রোটিন থাকে তার গুণমান চিকেন-এ থাকা প্রোটিনের সঙ্গে তুলনীয়। ফ্যাটের মাত্রা কম থাকে বলে যাঁরা ওজন কমাবেন বলে ভাবছেন তাঁদের জন্য এই দুধ অত্যন্ত উপযোগী। এছাড়া শিশু,  বাচ্চা, বয়স্ক ব্যক্তি, সন্তানসম্ভবা মহিলা, স্তন্যপান করাচ্ছেন এমন মহিলাদের পুষ্টির জন্য এই দুধ অতি উপযোগী। দুধে থাকা প্রোটিন উদ্ভিজ্জ হওয়ায় হজম করাও সহজ। এছাড়া সয়া মিল্ক থেকে তৈরি হয় সয়া কার্ড বা সয়া দই। এই দইও অত্যন্ত পুষ্টিকর।
১০০ এমএল সয়া মিল্ক-এ ক্যালোরির মাত্রা ৫.৪ কিলোক্যালোরি। স্যাচুরেটেড  ফ্যাটের মাত্রা ০.২ গ্রাম। আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা প্রায় ২ গ্রামের মতো। আর কার্বোহাইড্রেটের মাত্রা ৬ গ্রাম যার মধ্যে ডায়েটরি ফাইবার ও সুগার উভয় থাকেই। প্রোটিনের মাত্রা ৩.৩ থেকে ৩.৫ গ্রাম মতো।
সয়া মিল্ক-এর মধ্যেও বহু মাত্রায় ভিটামিন মিনারলেস থাকে, অ্যানিমালস মিল্ক-এ যেমন প্রচুর পরিমাণে ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন ডি, ভিটামিন এ, রাইবোফ্ল্যাভিন থাকে ম্যাগনেশিয়াম, জিঙ্ক ইত্যাদি থাকে তেমনই মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টসও থাকে সয়া মিল্ক-এ। 
নানা গবেষণায় দেখা গিয়েছে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ থেকে প্রদাহ দেখা দিলে, সেই প্রদাহ কমাতেও সয়া মিল্ক সাহায্য করতে পারে। এমনকী সেপসিস-এর রোগীকেও এই ধরনের দুধ খাওয়ানো যেতে পারে।
এছাড়া সয়া মিল্ক-এ থাকে যথেষ্ট মাত্রায় ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। ওমেগা থ্রি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর ফ্যাট। এই বিশেষ ফ্যাট ডিমেনশিয়া প্রতিরোধেও যেমন সাহায্য করে তেমনই হার্টের স্বাস্থ্যরক্ষাতেও বিশেষ ভূমিকা নেয়।
সয়া মিল্ক-এ রয়েছে ফাইটোস্ট্রোজেন নামে বিশেষ উপাদান। এই উপাদানটি মনোপজের নানা উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে।
সয়া মিল্ক খাওয়া যায় স্মুদি করে। এমনকী কেউ কেউ কফিও পান করেন। সকালে ভুট্টা চিপস খাওয়া যায় দুধ দিয়ে। এছাড়া অনেকে কারি প্রস্তুতিতেও সয়া মিল্ক ব্যবহার করেন।
পিনাট মিল্ক
খুব দ্রুত অনেকের প্রিয় হয়ে উঠেছে পিনাট মিল্ক। ল্যাকটোজ থাকে না তাই ইনটলারেন্স-এরও প্রশ্ন নেই। পিনাট মিল্ক-এ প্রোটিনের মাত্রা যথেষ্ট বেশি। ১কাপ বাদাম দুধে প্রায় ১৫০ ক্যালোরি এনার্জি, ১১ গ্রাম ফ্যাট, ৬ গ্রাম প্রোটিন, ৬ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে। 
চিনাবাদামের দুধে যে চর্বি থাকে তা স্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট যা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় এবং ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়। এছাড়া চীনাবাদামের দুধ হল ম্যাগনেশিয়ামের দারুণ উৎস। ম্যাগনেশিয়াম মেটাবলিজম বা  শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে উন্নত করে। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাও নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে খনিজটি। চীনাবাদামের দুধে থাকে ভিটামিন ই যা একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। শরীরের তৈরি হওয়া নানা ক্ষতিকর উপাদান বা ফ্রি র‌্যাডিক্যালস ধ্বংস করে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ফলে হৃদরোগ নিয়ন্ত্রিত হয়। চিনাবাদামের দুধে থাকে ভিটামিন বি ৬। এই ভিটামিন শরীরের নানা এনজাইম তৈরিতে সাহায্য করে। ফলে বিপাকক্রিয়া বাড়ে। ওজন নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হয়।
আমন্ড  মিল্ক
আমন্ড মিল্ক বা আমন্ড দুধ একটু মহার্ঘ। ল্যাকটোজ নেই। অথচ অত্যন্ত পুষ্টিকর। ১০০ গ্রাম আমন্ড মিল্ক-এ থাকে ১৫ কিলোক্যালোরি, কার্বোহাইড্রেট ০.৩ গ্রাম, ফাইবার ০.৩ গ্রাম, প্রোটিন ০.৬ গ্রাম,  ফ্যাট ১.৩২ গ্রাম এবং সুগার নেই বললেই চলে। এছাড়া এই দুধে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন ই, ভিটামিন ডি, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি।
নানা গবেষণায় দেখা গিয়েছে, উদ্ভিজ্জ এই প্রোটিনে ক্যালোরির মাত্রা অত্যন্ত কম। ওজন কমাতে চাইলে এই দুধ পান করা যেতে পারে। এছাড়া কার্বোহাইড্রেটের মাত্রাও যথেষ্ট কম। ডায়াবেটিসের রোগীও দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে এই দুধ পান করতে পারেন।
আমন্ড মিল্ক-এ যথেষ্ট মাত্রায় ভিটামিন ই থাকে। ভিটামিন ই নিয়ে চার কথা বলা প্রয়োজন। ভিটামিন ই একটি দুর্দান্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ কমাতে পারে এই ভিটামিন। এর ফলে হার্ট ডিজিজ এবং ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়তেও সাহায্য করে ভিটমিন ই। এমনকী শরীরে জমে থাকা চর্বি ঝরাতেও সাহায্য করে ভিটামিন ই।
আমন্ড মিল্ক-এ আছে উপযুক্ত মাত্রায় ক্যালশিয়াম। ফলে হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে চাইলে নিয়মিত আমন্ড মিল্ক খান। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও আমন্ড মিল্ক-এর ভূমিকা আছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, আমন্ড মিল্ক-এ ফসফরাসের মাত্রা কম থাকে ও মাঝারি মাত্রায় থাকে পটাশিয়াম। ফলে কিডনি রোগীরাও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে এই দুধ খেতে পারেন।
বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে নিয়মিত আমন্ড মিল্ক খেলে তা ব্রণ কমে। এছাড়া ভিটামিন ই থাকে যা ত্বকের  স্বাস্থ্যের পক্ষেও অত্যন্ত উপযোগী। কারণ ত্বকের কোষের ক্ষতি করে এমন ফ্রি র‌্যাডিকেলসকে ধ্বংস করে ভিটামিন ই। অতএব সুস্থ থাকতে চাইলে নিয়মিত আমন্ড মিল্ক খেতে পারেন চিকিত্সকের পরামর্শে। 
সয়া মিল্ক, পিনাট মিল্ক, আমন্ড মিল্ক ছাড়াও এখন হেজেলনাট, পেস্তা, ওটস-এর দুধও বাজারে মিলছে! তবে অ্যানিমাল মিল্ক-এর স্বাদগন্ধ হয়তো প্লান্ট মিল্ক-এ পাবেন না। কারণ-এর মধ্যে আলাদা করে মিষ্টিভাব থাকে না।
লেখক: রুবি জেনারেল হাসপাতালের চিফ ডায়েটিশিয়ান
অনুলিখন: সুপ্রিয় নায়েক

সম্পর্কিত সংবাদ