


আগামী ১৪ মার্চ বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন। পদার্থবিদ্যা চর্চার পাশাপাশি তাঁর অন্যতম শখ ছিল বেহালা বাজানো। সঙ্গীতরসিক আইনস্টাইনের কথা জানালেন শান্তনু দত্ত।
বইমেলা থেকে বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মজার কাণ্ড বিষয়ে বই কিনে এনেছিল পুবলু। শীতের দুপুরে পা দুলিয়ে পড়ছিল। দাদু এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী দাদু, কী পড়ছ?’ বই থেকে মুখ তুলে ঠোঁট উল্টাল পুবলু, ‘এখানে যে গল্পগুলো লেখা আছে, সবই তো তোমার মুখে শুনেছি। কিছুই তো নতুন নেই।’ নাতির কথায় হেসে উঠলেন সন্দীপবাবু। ‘জীবনে নতুন আর পুরনোকে একসঙ্গে নিয়েই চলতে হয় দাদু,’ মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তোমার যেমন বই পড়া আর ক্রিকেট খেলা হবি, তেমনই আইনস্টাইনের প্রিয় কাজ কী ছিল জানো?’ পুবলুর সহজ উত্তর, ‘বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা।’ দাদু বললেন, ‘না, না। পড়াশোনা যেমন তোমার প্রাথমিক কাজ। তার পাশাপাশি তুমি বই পড়, ছবি আঁক, ক্রিকেট খেল। তেমনই আইনস্টাইন বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ভায়োলিন বাজাতেন। বেহালা ও সঙ্গীতই ছিল তাঁর অবসর সময়ে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম।’
‘অ্যাঁ! আপেক্ষিকতাবাদের মতো গুরুগম্ভীর তত্ত্বের আবিষ্কর্তা বেহালা বাজাতেন!’, অবাক হল ক্লাস ফাইভের ছাত্রটা। দাদু বললেন, ‘একদমই তাই। ভীষণ মজার মানুষ ছিলেন উনি। এ কথা তো তুমি জানোই। তার সঙ্গে উনি ছিলেন একজন সঙ্গীতবিশারদ। তিনি বলতেন, বিজ্ঞানী না হলে আমি সঙ্গীতবিদ হতাম। প্রায়ই সঙ্গীত নিয়ে ভাবি, সঙ্গীতের স্বপ্নে বেঁচে থাকি। সঙ্গীতের আঙিনায় জীবনকে দেখি।’ হাঁ করে দাদুর দিকে তাকিয়ে ছিল পুবলু। সন্দীপবাবু বললেন, ‘তোমার মায়ের মতো আইনস্টাইনের মা পাউলিনও ভালো পিয়ানো বাজাতেন। সঙ্গে তিনি বেহালাও বাজাতে পারতেন। আইনস্টাইনের তখন পাঁচ বছর বয়স। পাউলিন তাঁকে পিয়ানো ও বেহালা বাজানো শেখাতে শুরু করেন। যদিও খুদে আইনস্টাইন মোটেই পছন্দ করতেন না ভায়োলিন শেখা। বরং কার্ড দিয়ে ঘর বানানো, জিগস পাজল সলভ করাই ছিল তাঁর পছন্দের কাজ।’
‘ঠিক যেমন আমার ছবি আঁকতে ভালো লাগে না, কিন্তু ক্রিকেট খেলতে দারুণ লাগে,’ বলল পুবলু। ‘কিন্তু এই অপছন্দের কাজটাই একসময় ভালোবেসে ফেলেছিলেন আইনস্টাইন। বলেছিলেন, একটি টেবিল, একটি চেয়ার, একপাত্র ফল আর বেহালা— একজন মানুষের সুখী হতে আর কী চাই?’ হেসে দাদু বললেন, ‘১৩ বছর বয়সে মায়ের থেকে অস্ট্রিয়ার সুরকার মোৎজার্টের সম্পর্কে জানতে পারেন আইনস্টাইন। তাঁর গান প্রভাবিত করেছিল কিশোর আইনস্টাইনকে। সঙ্গীতের প্রেমে পড়েন তিনি। তবে পিয়ানোর চেয়ে বেহালার দিকেই বেশি ঝোঁক ছিল তাঁর। নিজেই বলেছিলেন, আমার নিজের কাজ ছাড়া একটি মাত্র বিষয় আমাকে আনন্দ দেয়, বেহালা। কিছুদিন পরেই মোৎজার্ট ও সুরকার বিঠোভেনের নানান সুর বাজাতে পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন আইনস্টাইন। তিনি যখন বিজ্ঞানের কথা ভাবতেন, তখনও তাঁকে সাহায্য করত সঙ্গীত। ৭৩ বছর বয়সে ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তবে আইনস্টাইন কখনও বেহালা বাজানোর অনুরোধ ফেরাতে পারেননি।’
পুবলু বলে, ‘ঠিক বলেছ দাদু। মা আমাকে বলেছে, গান শুনলে নাকি মন শান্ত থাকে।’ দাদু বলে চললেন, ‘বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির চর্চা সমানতালে চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। কোয়ান্টাম তত্ত্বের জনক ম্যাক্স প্লাঙ্কের সঙ্গে বেহালা বাজিয়েছেন তিনি। ১৯২৯ সালে আইনস্টাইন বেলজিয়াম সফরে গিয়েছিলেন। রানি এলিজাবেথ (প্রিন্সেস এলিজাবেথ অব বাভারিয়া) আইনস্টাইনের সঙ্গে যুগলবন্দিতে বেহালা বাজান। এছাড়াও সঙ্গীতগুরু ফ্রিৎজ ক্রিসলার আর আর্তুর শানাবেলের সঙ্গে নিত্য ওঠাবসা ছিল তাঁর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যখন তাঁর দেখা হয়, দু’জনের আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল সঙ্গীত। কবিগুরু পরে জানিয়েছিলেন, পিয়ানো তাঁকে হতবাক করে, বেহালা তৃপ্তি দেয়।’ পুবলুকে বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীর বেহালা বাজানোর সেই বিখ্যাত ছবিটি দেখালেন দাদু। সঙ্গে দেখালেন কবিগুরুর সঙ্গে আইনস্টাইনের ছবি। অবাক নয়নে ছবিগুলির দিকে তাকিয়ে রইল ছোট্ট ছেলেটি।