নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘গগনে কৃষ্ণ মেঘ দোলে/কিশোর কৃষ্ণ দোলে বৃন্দাবনে...’ ঝুলন উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছে। কে বলে এখন আর ঝুলন নিয়ে মাতামাতি হয় না। রবিবার পটুয়াপাড়াগুলি ঘুরলে বোঝা যেত ঝুলন সাজানোর পুতুলের চাহিদা কমছে তো না-ই, উল্টে বেড়েই চলেছে। যে বাবা-মা ছোটবেলায় ঝুলনের পুতুল সাজানোর জন্য বড়দের কাছে বকুনি খেতেন, তাঁরা দলে দলে আসছেন নিজের পুত্র-কন্যাকে নিয়ে পটুয়াপাড়ায়। ছেলেমেয়ে ঝুলন সাজাবে আর দাঁড়িয়ে দেখবেন বাবা-মা। দিনকয়েকের জন্য হলেও নিজের ছোটবেলা ফিরে আসবে ছেলেমেয়ের হাত ধরে। ফলে শহর আর শহরতলিজুড়ে এখন উৎসাহ দেখা দিয়েছে ঝুলনকে নিয়ে। পোড়ামাটির একটি পুতুল হাতে নিয়ে বাগবাজারের সৌমিত্র নন্দী বললেন, ‘ছোটবেলায় কত সাজিয়েছি। বাবা মা’র কাছে কম বকা খাইনি। ছেলেকে নিয়ে এসে এখন নিজের ছোটবেলায় ফিরে যাচ্ছি যেন। বড্ড ভালো লাগছে।’
রবিবার দিনভর কুমোরটুলিতে ভিড়। বনমালি সরকার স্ট্রিট, কুমোরটুলি স্ট্রিট, রবীন্দ্র সরণিতে দেদার বিক্রি হচ্ছে ঝুলন সাজানোর পুতুল ও অন্যান্য উপকরণ। বসুদেব মাথায় শিশু কৃষ্ণকে নিয়ে যাচ্ছেন। চমৎকার দেখতে এই মাটির পুতুল কিনছেন সবাই। কিনছেন মিলিটারি মূর্তি থেকে কৃষক পরিবার। দোকানে বসে রয়েছে মাটির ছোট আকারের ফুচকাওয়ালা, মুদির দোকানি, বাজনাওয়ালা। মাথায় করে সব্জি নিয়ে যাচ্ছেন দোকানদার, মাছ বেচছেন ব্যবসায়ী। হরেক রকম মাটির ফল চকচক করছে। ছোটরা হাঁ করে তাকিয়ে এইটুকু কুঁড়েঘরের দিকে। তার পাশেই মাটির দুর্গ, নারকেল গাছ, রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি। আর আছে ইট। দেশলাই বাক্সের মতো ছোট ইট। তা দিয়ে হবে রাস্তা। বস্তায় ভরা রঙিন ভূষি। তা দিয়ে পাঁচিল তৈরি করে হবে বাড়ির সীমানা। ইট দিয়ে সিমেন্ট গেঁথে সিঁড়ির কোনায় বা ছাদের ঘরে হবে পুকুর। সেখানে থাকবে খেলনা দোলনা বা ঝোলা। তাতে দোদুল দুলবেন রাধাকৃষ্ণ। সন্তানকে এসব ঢেলে কিনে দিচ্ছেন বাবা-মা’রা।
আগরপাড়া থেকে বারুইপুর। সল্টলেক থেকে বিরাটি। শ্যামবাজার থেকে গড়িয়াহাট। সর্বত্র ঝুলনের উপকরণ কেনার ভিড়। স্ত্রী চন্দ্রানী দত্তকে নিয়ে পুতুল কিনতে কুমোরটুলিতে এসেছিলেন হিমাদ্রী দত্ত। থাকেন বাঙুরে। সঙ্গে এসেছে দুই পুত্র। একজনের বয়স সাড়ে তিন, অন্যজনের বয়স দেড় বছর। হিমাদ্রীবাবু বলেন, ‘এক ব্যাগ পুতুল কিনেছি। প্রতিবছরই কিনতে আসি। বড় ছেলে এখনই সাজাতে শিখে গিয়েছে। ওদের তো বটেই আমি এবং আমার স্ত্রী’র পছন্দমতো পুতুলও কিনেছি।’ রবীন্দ্র সরণির সুজয় হালদার বনমালি সরকার স্ট্রিটে এসেছিলেন। এক পুতুল নির্মাতার থেকে ঝুড়ি ভর্তি করে কিনলেন। বললেন, ‘এ বছর পুতুলের দাম একটু বেশি। তবু কিনলাম। বছরে এই একবারই মেয়ের বয়সে ফিরে যাই। মেয়ে এখন ছ’বছর।’ এ বছর ঝুলনযাত্রা নিয়ে শহরের সর্বত্র দারুণ আগ্রহ। পাশাপাশি বনেদি বাড়ি, বহু মন্দিরেও হয় ঝুলনযাত্রা অনুষ্ঠান। সেখানেও ভিড় সামলানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।