তন্ময় মল্লিক: ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার।’ এটাই এবার বিজেপির মূল স্লোগান। আক্রমণের লক্ষ্য তৃণমূল কংগ্রেস। উদ্দেশ্য বাংলায় বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তৃণমূল কংগ্রেসের মূল স্লোগান কী? ‘যতই করো হামলা জিতবে এবার বাংলা’। আক্রমণের লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন। উদ্দেশ্য? বাংলার মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। অনেকে বলছেন, তৃণমূল কংগ্রেস অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাঙালির অস্মিতাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছে। কারণ বাঙালি সহনশীল হলেও আত্মমর্যাদায় ঘা দিলে রুখে দাঁড়াতে দু’বার ভাবে না। কমিশন যত আগ্রাসী হবে তাদের ‘শিক্ষা’ দিতে ততই জোটবদ্ধ হবে বাংলা। ইতিহাস অন্তত সেকথাই বলে।
সরকারি প্রকল্প উদ্বোধন এবং শিলান্যাসের নামে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যেই বারকয়েক বাংলায় নির্বাচনি প্রচার সেরে ফেলেছেন। এবার তিনি ব্রিগেডের সভা থেকে তৃণমূল কংগ্রেস এবং রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। ‘চুন চুন কে’ দেখে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন তা অতীতে কখনো করেননি। তবে, এখানে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হল, এবার তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি। তাঁর মুখে শোনা যায়নি ‘দিদি অ দিদি’ কটাক্ষ।
নরেন্দ্র মোদির ভাষণ অনেকটা থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। প্রতিটি সভায় প্রায় একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের টাকা রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা রাজ্যবাসী পাচ্ছেন না। উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পকে। তবে, একুশের নির্বাচনে তাঁর সুর করে ‘দিদি অ দিদি’ বিদ্রুপ বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা করেছিল। যখনই তিনি সেই সুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করতেন তখনই দলের কর্মী-সমর্থকরা করতালি দিতেন। উল্লাসে ফেটে পড়তেন। কিন্তু তার ফল হয়েছিল মারাত্মক। তিনি যত তৃণমূল সুপ্রিমোকে বিদ্রুপ করেছেন রাজ্যের মহিলারা ততই এককাট্টা হয়েছেন। সেই কারণেই কি এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগত আক্রমণের রাস্তায় যাচ্ছেন না, নাকি কমিশনের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই ফায়ার করে কাজ হাসিল করতে চাইছেন মোদি!
বিজেপি এবং কমিশনের মূল টার্গেট মুসলিম ভোট। প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটার বিচারাধীন। তাঁদের বেশিরভাগই সংখ্যালঘু। কমিশনের বাতিলের খাতায় চলে যাওয়া ভোটারদের নথি যাচাই করছেন বিচারকরা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যে সমস্ত ‘বিচারাধীন’ ভোটার এবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন তাঁদের সিংহভাগই বিজেপির বিরুদ্ধে রায় দেবেন। কারণ তাঁরা মনে করেন, বিজেপির অঙ্গুলি হেলনেই নির্বাচন কমিশন তাঁদের ‘বেনাগরিক’ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রুখে দাঁড়ানোয়। বাংলার জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য মাঠে এবং কোর্টে লড়াইটা করেছেন একমাত্র তিনিই। এটা মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছে।
বিজেপি নেতৃত্ব বলছে, ‘বিভিন্ন রাজ্যে এসআইআর হয়েছে। কিন্তু কোথাও বাংলার মতো হইচই হয়নি। কোথাও কোনো অশান্তি হয়নি। যত গণ্ডগোল বাংলায়।’ এ রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার থাকলে এসআইআর নিয়ে কোনো হইচই-ই হত না। প্রশাসন থেকে কমিশন, এক সুরে কথা বলত। এই সুবিধে পাওয়ার জন্যই তো ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ প্রতিষ্ঠা করতে দিল্লি বিজেপি এত মরিয়া। ডবল ইঞ্জিন সরকার মানেই রাজ্যে যা খুশি তাই করার ছাড়পত্র। কোনো প্রতিবাদ হবে না। আর যদিও প্রতিবাদ হয়, প্রতিকারের রাস্তা বন্ধ। তাতে চলার পথ হয় মসৃণ। একেবারে মাখন।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আরও তিন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু কোনো রাজ্যেই বাংলার মতো অফিসারদের বদলির নামে হেনস্তা করা হচ্ছে না। তামিলনাড়ুতে কয়েকজন অফিসারকে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু বাংলায়? তিন দিনে ৪২জন আইএএস, আইপিএস অফিসারের বদলি। তাতে উদ্দেশ্য সফল হবে না বুঝে একধাক্কায় ৭৩জন রিটার্নিং অফিসারকে সরিয়ে দেওয়া হল। তারমধ্যে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কয়েকজন অফিসারকে সাতদিন আগেই পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের ঘরের সামনে এখনো নেমপ্লেট পর্যন্ত লাগানো হয়নি। সূত্রের খবর, আরও শ’দুয়েক পুলিশ অফিসারকে শীঘ্রই বদলি করা হবে। নির্বাচন পর্যন্ত বাংলায় আরও অনেক কিছু ঘটবে। বাংলায় যখন সাধারণ মানুষ এবং অফিসারদের উপর বুলডোজার চালাচ্ছে তখন অসমের দিকে কমিশন প্রায় তাকাচ্ছে না বললেই চলে। হাতেগোনা দু’চারজন অফিসারকে বদলি করেছে। আর সেটা করা হয়েছে কমিশন যে নিরপেক্ষ, তা দেখানোর জন্য।
সরকারিভাবে নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারির আগে থেকেই বাংলায় শুরু হয়েছে অফিসার বদলি। পদস্থ অফিসারদের সরিয়ে দিচ্ছে কমিশন। কিন্তু, সরানোর কারণ জানাচ্ছে না। কাদের বসানো হচ্ছে শুধু তার একটা অর্ডার বেরচ্ছে। কমিশন মনে করছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অফিসাররা তৃণমূলের ‘দলদাসে’ পরিণত হয়েছে। তাই ভোট পরিচালনার জন্য কমিশন ‘নিরপেক্ষ’ অফিসারদের দায়িত্ব দিচ্ছে। কমিশনের চোখে নিরপেক্ষ অফিসার কারা? রাজেশ কুমারের মতো আইপিএসরা। গত নির্বাচনে কমিশন ‘নিরপেক্ষ’ রাজেশ কুমারকে কলকাতা পুলিশের কমিশনার করেছিল। অথচ সেই রাজেশ কুমার এবার পদ্মপ্রার্থী। এতেই বোঝা যাচ্ছে, কমিশনের চোখে নিরপেক্ষতার মাপকাঠি কী!
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, বিচারাধীন ভোটারদের তালিকা নিষ্পত্তির পাশাপাশি জানাতে হবে নাম বাতিলের কারণ। কারণ জানানো তো দূরের কথা, সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে গিয়েও কমিশনের ল্যাজেগোবরে অবস্থা। সোমবার রাত ১২টায় তালিকা আপলোড করেছে বলে কমিশন দাবি করেছে। কিন্তু অধিকাংশ এলাকার বিচারাধীন ভোটাররাই তা দেখতে পাননি। জেলা প্রশাসনের কাছে কোনো তালিকা পাঠায়নি। কমিশনের দেওয়া ওয়েবসাইডে সার্চ করলে দেখানো হচ্ছে, সার্ভারের সমস্যা। কিন্তু, বাস্তবটা হচ্ছে সদিচ্ছার অভাব। কমিশন কোনো কাজই স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে চাইছে না। সেটা চাইলে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট আগেই জেলাশাসকদের পাঠিয়ে দিত।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কমিশন পরিকল্পিতভাবে গোটা সিস্টেমটা ঘেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর উদ্দেশ্য দু’টি। প্রথমত, বাদ পড়া ভোটাররা ফের তালিকায় নাম তোলার জন্য ট্রাইবুনালে যেতে পারবেন। তেমনই নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু, কারা বাদ পড়লেন, সেটাই যদি জানা না যায় আবেদন করবেন কী করে? আর মনোনয়ন পর্ব শুরু হলেই বন্ধ হয়ে যাবে ভোটার তালিকায় নাম তোলার সুযোগ। তাই নানাভাবে কমিশন সময় নষ্ট করছে। দ্বিতীয়ত, গোটা ঘটনার দায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও চালানো হচ্ছে। কমিশনের কর্তাদের প্রশ্ন করলেই বাজছে ফাটা রেকর্ড, আদালত বলতে পারবে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিষয়টা আদালতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বোঝাতে চাইছে, বিষয়টি কমিশনের হাতে থাকলে সব ঠিক করে দিত। আদালতে যাওয়ায় তাদের হাত-পা বাঁধা। কিন্তু ‘ফ্রি হ্যান্ড’ পেলে কমিশন কী করত, সেটা ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’র নামে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধিতেই স্পষ্ট হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে বিজেপি, কংগ্রেস কিংবা সিপিএম নয়, রাজ্যের শাসক দলের প্রধান প্রতিপক্ষ কমিশন। এসআইআরকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন বাংলার বৈধ ভোটারদের নাম কাটতে মরিয়া। প্রথম দফায় ২৯ লক্ষ বিচারাধীন ভোটারের তথ্য যাচাই শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক। কিন্তু, কত নাম বাদ গিয়েছে, সেটা জানাতে চাইছেন না। কখনো বল ঠেলে দিচ্ছেন আদালতের দিকে, কখনো কমিশনের কর্তাদের কোর্টে। অনেকে মনে করছেন, কমিশন ইচ্ছা করেই সংখ্যাটা প্রকাশ করছে না। কারণ অন্যায়ভাবে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে। তাই ক্ষোভের জেরে আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কা প্রবল। তার দায় নিতে হবে কমিশনকেই। আবার কমিশনের ফেরার পথ নেই। কারণ তারা বাঘের পিঠে চেপে বসেছে। তাই যে কোনো মূল্যে পরিস্থিতি ঘোরালো করতে চাইছে। তবে, তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর!
সালিমদের জন্য জোর করে নন্দীগ্রামের জমির দখল নিতে গিয়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পুলিশ। নির্বাচারে গুলি চালিয়ে মানুষ খুন করেছিল। বুদ্ধদেববাবুর মন্ত্রিসভার সদস্য রেজ্জাক মোল্লা বলেছিলেন, ‘হেলে ধরতে পারে না, কেউটে ধরতে গিয়েছে।’ কেউটের ছোবলে নীলবর্ণ হয়ে গিয়েছে বঙ্গ সিপিএম। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকুও নেই। এবার বিজেপির হয়ে বাংলার জমি দখলে নেমেছেন জ্ঞানেশ কুমার। সাংবিধানিক ক্ষমতার জোরে যা খুশি তাই করছেন। পার পাবেন না তিনিও। ৪মে দিল্লিতে বসেই জ্ঞানেশজি টের পাবেন, তিনি কার ‘লেজে’ পা দিয়েছেন!