দীপন ঘোষাল, রানাঘাট:
দীপন ঘোষাল, রানাঘাট:
মধ্যযুগে নবদ্বীপে শাক্ত ও বৈষ্ণবদের মধ্যে তুমুল দ্বন্দ্ব চলছে। ভক্তি ও শক্তির এই টানাপোড়েন মেটাতে উদ্যোগী হন অদ্বৈত আচার্যের বংশধর মথুরেশ গোস্বামী। কিন্তু সমাধান দূরের কথা, দ্বন্দ্ব আরও জটিল হয়। অবশেষে মথুরেশের কন্যা ও জামাই সার্বভৌম আগমবাগীশ নবদ্বীপ ছাড়তে বাধ্য হন। শান্তিপুরের এক নির্জন, জঙ্গলঘেরা প্রান্তে এসে থাকতে শুরু করেন তাঁরা। সেখানেই শুরু করেন আগমেশ্বরী কালীপুজো। সামাজিক বিভেদের বিপরীতে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শুরু হয় নদীয়ার অন্যতম প্রাচীন এই শক্তি আরাধনা।
শান্তিপুরে প্রাচীন কালীপুজোর সংখ্যা কম নয়। তবে তালিকার প্রথম সারিতেই স্থান আগমেশ্বরী কালীপুজোর। ৩০০বছরের বেশি পুরনো এই পুজো নদীয়ার ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। প্রথম দর্শনেই আগমেশ্বরী মাতৃমূর্তি দেখলে গা ছমছম করে ওঠে। কারণ, অন্যত্র দেবীর যেমন দক্ষিণাকালী রূপ দেখা যায়, এখানে তার চেয়ে দেবীর রূপ ভিন্ন। আয়োজক পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা জানালেন, দক্ষিণাকালীর ধ্যান অনুযায়ী দেবীমূর্তি গড়ে তোলা হয়েছে। তাই এখানে দেবীমূর্তির ভাবভঙ্গি স্বতন্ত্র।
পুজোর প্রথম উদ্যোক্তা সার্বভৌম আগমবাগীশ ছিলেন পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের প্রপৌত্র। সেসময় নবদ্বীপে শাক্ত-বৈষ্ণব দ্বন্দ্ব ছিল চরমে। এই বিভাজন দূর করতে মথুরেশ গোস্বামী নিজে বৈষ্ণব হয়েও শাক্ত তান্ত্রিক সার্বভৌমের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন। কিন্তু সমাজ সেই সম্পর্ক মেনে নিতে অস্বীকার করে। ফলে সার্বভৌম সস্ত্রীক নবদ্বীপ ত্যাগ করে শান্তিপুরে চলে যান। সেখানে মথুরেশ গোস্বামী জামাইয়ের জন্য পঞ্চমুণ্ডির আসন গড়ে দেন। সেখানেই শক্তিসাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন সার্বভৌম। দেবীর নির্দেশে গঙ্গার তীর থেকে মাটি এনে নিজে হাতে কালীমূর্তি গড়ে আরাধনা করেছিলেন তিনি। বর্তমানে সার্বভৌমের বংশধর না থাকলেও বড় গোস্বামী পরিবারের উত্তরসূরিরা এখনও ভক্তিভরে পুজো আয়োজন করেন।
যে স্থান একসময় ছিল সাধনার ক্ষেত্র, সেটি এখন আগমেশ্বরীতলা নামে পরিচিত। প্রতিবার কালীপুজোয় সেখানে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয়। কয়েক কুইন্টাল ভোগ রান্না হয়। প্রায় ১৫ফুট উঁচু দেবীমূর্তি লক্ষ্মীপুজোর দিন থেকে ‘পাট খিলানো’ দিয়ে তৈরি শুরু হয়। কৃষ্ণপক্ষের ১০-১৫দিনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ মূর্তি গড়ে তোলা হয়। পুজোর আগের সন্ধ্যায় শিল্পী যখন দেবীর চক্ষুদান সম্পন্ন করেন, তখনই পুজোর মূল মুহূর্ত ‘মায়ের আগমন’ শুরু হয়। আয়োজক পরিবারের তরফে সত্যনারায়ণ গোস্বামী বলেন, দেবীর চোখ আঁকার সেই মুহূর্ত থেকেই পুজো শুরু হয়। তিন শতাব্দী পরও একই নিয়মে আগমেশ্বরী কালীপুজো হয়ে আসছে।