Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / হেলথ

পঞ্চাশ পেরলেও অটুট যৌবন! কোরিয়ান ডায়েটের জাদু জানালেন পুষ্টিবিদ

এবার নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে, প্রৌঢ়ত্বেও কীভাবে তাঁরা ত্বকের এমন তারুণ্য ধরে রেখেছেন?

পঞ্চাশ পেরলেও অটুট যৌবন! কোরিয়ান ডায়েটের জাদু জানালেন পুষ্টিবিদ
  • ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্কুইড গেম, ক্রাশ ল্যান্ডিং অন ইউ, দ্য গ্লোরি, হসপিটাল প্লে লিস্ট— নামগুলো খুব চেনা চেনা ঠেকছে? ইতিমধ্যে মনেও পড়ে গিয়েছে যে সবগুলি নামই আসলে জনপ্রিয় কোরিয়ান সিরিজ বা ‘কে-ড্রামা’? স্মরণে যখন চলেই এসেছে সিরিজের টুকরো টুকরো ছবি তাহলে সম্ভবত লি জং-জে, লি বিয়ং-হুন, জুং উ-সুং, কিম হিয়ে-সু, লি ইয়ং-এ নামগুলিও নিশ্চিতভাবে আপনার হৃদয়ে ধাক্কা দিচ্ছে? জানেন কি, আপনার প্রিয় এই প্রত্যেক অভিনেতা এবং অভিনেত্রী আসলে কবেই পেরিয়ে এসেছেন পঞ্চাশের কোঠা! ঠিক তাই। এবার নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে, প্রৌঢ়ত্বেও কীভাবে তাঁরা ত্বকের এমন তারুণ্য ধরে রেখেছেন?

Advertisement

মিলেনিয়ালস, জেন জি এবং আলফাদের প্রিয় ‘বিঞ্জ-ওয়াচিং’ এখন কোরিয়ান সিরিজ ঘিরেই! আর কোরিয়ান সিরিজ দেখার সময় প্রায় সব দর্শককেই অবাক করেছে একটাই বিষয়— প্রায় প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রীরই প্রকৃত বয়স বোঝা যায় না। সকলেরই চোখ ধাঁধানো গ্ল্যামার! ত্বক থেকে যেন গড়িয়ে পড়ছে মধু আর তাতেই পিছলে যাচ্ছে আলো, কোথাও সামান্য ভাঁজ নেই, নেই চামড়া ঝুলে পড়ার লক্ষণ!

কীভাবে পঞ্চাশ পেরনর পরে এভাবে যৌবন অটুট রাখেন তাঁরা? কী খাবার খান ওরা?

প্রশ্ন রাখা গেল ভাগীরথী নেওটিয়া ওম্যান অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার সেন্টার (নিউটাউন)-এর পুষ্টিবিদ দেবাঞ্জলি ঘোড়ই-এর কাছে। তিনি জানালেন, ক্রনোলজিক্যাল বয়সের তুলনায় কোনও ব্যক্তির বয়স কম মনে হলে তার পিছনে কারণ একাধিক হতে পারে। জিনঘটিত কারণ দায়ী থাকতে পারে। এছাড়া পরিবেশের দূষণও ত্বকে ও শরীরের সিস্টেমে বিরাট প্রভাব ফেলে। কোরিয়ার ভৌগলিক অবস্থানও খানিকটা সাহায্য করে। তবে হ্যাঁ, দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকরা ত্বকের খুব যত্ন নেয়। বিশেষ করে বাড়ির বাইরে বেরলে নিয়ম মেনে সানস্ক্রিন লোশন লাগানোর রেওয়াজও আছে। তবে খাদ্যাভ্যাসের একটা বড় প্রভাব অবশ্যই আছে।

তা কেমন? নানা আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুসারে, কোরিয়ানদের মধ্যে প্রসেসড ফুড, ভাজা খাবার প্রচলন বেশ কম। বরং সবুজ শাকসব্জি, ফার্মন্টেড খাবার, বেকড খাবার খাওয়ার প্রচলন বেশি।

অন্যদিকে ভারতীয়দের মধ্যে ডিপ ফ্রায়েড ফুড, জাঙ্কফুড, প্রসেসড ফুড খাওয়ার প্রবণতা যথেষ্ট বেশি। এই ধরনের খাদ্য ত্বকের ক্ষতি করে।

ত্বকের টানটান ভাব ধরে রাখে কোলাজেন নামে প্রোটিন। যে কোনও ডিপ ফ্রায়েড ফুড-এ বিশেষ ধরনের ক্ষতিকারক রাসায়নিক তৈরি হয় যা এই কোলাজেনকে নষ্ট করে দেয়। এছাড়া ত্বকের কোষের ডিএনএকেও নষ্ট করে। ত্বক হয়ে পড়ে নিস্তেজ, স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য যায় হারিয়ে।

এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত তেলেভাজা খেলে ঘনঘন হজমের সমস্যাও হয়। এর প্রভাব ত্বকেও পড়ে। পাশাপাশি কোরিয়ানদের ডায়েটে থাকে কিমচি নামে একটি বিশেষ খাদ্য। কিমচি শুধু খাবার নয়, বরং তাদের সংস্কৃতির অঙ্গ। কিমচিতে থাকে একাধিক সব্জি আর মশলা।

কিমচি তৈরির উপাদানগুলি হল, বাঁধাকপি, গাজর, মুলো, স্প্রিং অনিয়ন বা পিঁয়াজ কলি। কিমচিতে পেস্ট তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় কোরিয়ান লাল মরিচ, আদা-রসুন বাটা, পিঁয়াজ কুচি, ফিশ স্যস। এছাড়া গরম জলে চালের গুঁড়ো ফেলে মণ্ডও তৈরি করা হয়।

এছাড়া কিমচিতে ফার্মেন্টেড সব্জি ব্যবহার করা হয়। তাই কিমচিতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া। এই উপকারী ব্যাকটেরিয়া পেট ভালো রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া কিমচি ভিটামিন এ, বি এবং সি সমৃদ্ধও বটে। প্রতিটি ভিটামিন ত্বকের জনয উপকারী।

কোরিয়ানদের মধ্যে ভাত খাওয়ার প্রচলনও রয়েছে। তবে তার সঙ্গেও তারা খায় কিমচি। দুপুর ও রাতের খাবারেও থাকে কিমচি। ফলে প্রতিবার খাদ্য হজমে সাহায্য করে কিমচি। আরও একটা জানার বিষয় হল, খাদ্যের পরিমাণ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেলে শরীরে তার প্রভাব পড়বেই। কোরিয়ানরাও ভাত খায়। তবে পরিমাণে কম। ফলে চেহারাও ঝরঝরে থাকে। চেহারা ঝরঝরে থাকলে বয়সও কম দেখায়।

এছাড়া নানাভাবে রসুন থাকেই কোরিয়ান ডিশ-এ। রসুন ইমিউনিটি বুস্টার হিসেবে সাহায্য করে।

এছাড়া শুধু খাবার খাওয়া নয়, সঙ্গে এক্সারসাইজ করাও প্রয়োজন। এছাড়া পর্যাপ্ত জল পানের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। কারণ জলের অভাবে ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়ে। ত্বক হয়ে যায় প্রাণহীন। তাই প্রাপ্তবয়স্করা অবশ্যই মনে করে আড়াই তেকে তিন লিটার জল অবশ্যই পান করুন।

আরও একটা বড় বিষয় হল প্রোটিন। কোরিয়ানদের খাবারে নানাভাবে মাছের ব্যবহার হয়। বিভিন্ন ধরনের মাছ থাকে ওদের নানা পদে। মাছের পদগুলি প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে। আর সুস্থ ত্বকের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন অবশ্যই পাতে রাখা দরকার। ত্বক টান টান রাখার দোসর কোলাজেন এবং ইলাস্টিন তৈরির মূল উপাদানই হল প্রোটিন। অতএব খাদ্যে প্রোটিনের অভাব হলে ত্বকেও পড়বে তার প্রভাব। বলতে দ্বিধা নেই, ভারতীয় ডায়েটে প্রোটিনের যথেষ্ট অভাব আছে। আর প্রোটিন বলতে ভারতীয়রা বোঝে চিকেন বা মাটনের রসিয়ে তেল গড়িয়ে যাওয়া মশলায় ডোবানো রান্না! অথচ কোরিয়ান ডায়েটে সব্জি এবং মাছ-মাংস সেদ্ধ করে বা গ্রিল করে খাওয়ার প্রচলন বেশি আছে বলেই নানা গবেষণায় জানা যাচ্ছে। তাতে খাদ্যের পুষ্টিগুণ ভালোমতো বজায় থাকে।

আর একটা বড় বিষয় হল শরীরে ফ্রি র‌্যাডিক্যালস-এর মাত্রা কমানো। প্রত্যেকের শরীরেই কোষের বিভিন্ন কার্যকলাপের কারণে শরীরে তৈরি হয় ফ্রি র‌্যাডিক্যালস যার মাত্রা বাড়লে নানা অসুখ দেখা দেয়। ত্বকেও অকাল বার্ধক্য নেমে আসতে পারে। ফ্রি র‌্যাডিক্যালস ধ্বংস করে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তাই যার শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকবে তার অসুখবিসুখও কম হবে। তাঁর ত্বকও ভালো থাকবে। অ্যান্টি অক্সিডেন্ট পাওয়া যায় নানা ধরনের ফলে। নিয়মিত ফল খাওয়ার অভ্যেস রয়েছে কোরিয়ানদের মধ্যে। ওদের ত্বক এত টান টান থাকাও এটাও একটা বড় কারণ।

তবে শুধু খাবার নয়, সঙ্গে এক্সারসাইজ করাও দরকার। এক্সারসাইজে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, ফলে ত্বকের কোষেও তার সুপ্রভাব পড়ে।

কোরিয়ান ডায়েটে যে সব ভালো এমন নয়। কারণ ওদের খাবারে নুনের ব্যবহার বেশ বেশি বলেই জানাচ্ছে নানা গবেষণা। আমাদের দেশে আবার উচ্চ রক্তচাপে ভোগা রোগীর সংখ্যা বেশি। তাই

কোরিয়ানদের মতো ফুড হ্যাবিটের মাধ্যমে যৌবনকে থমকে দিতে চাইলে নুন ব্যবহারটুকুই শুধু কমাতে হবে।

পুষ্টিবিদের শেষ পরামর্শ, আমরাও ভারতীয় ডায়েটকে স্বাস্থ্যকর উপায়ে গ্রহণ করে বয়স ধরে রাখতে পারি। দরকার শুধু বা ভাত-রুটির মতো কার্বোহাইড্রেট কম খেয়ে, তেলের ব্যবহার কমিয়ে শুধু সেদ্ধ শাকসব্জি ও মাছ মাংসের উপর ভরসা রাখা।

লিখেছেন: সুপ্রিয় নায়েক

 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ