দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: গরম ভাতের সঙ্গে পাতে পড়ছে ঘি। কৌটোর উপর লেখা ‘গাওয়া ঘি’। আহাঃ, কী তার সুবাস! কিন্তু তা কি আদৌ ঘি? প্রশ্ন উস্কে দেয় নদীয়া জেলার ফুলিয়ায় ইতিউতি গজিয়ে ওঠা ঘি কারখানার অন্দরমহলের ছবি। সেখানে শতাধিক এমন ‘ঠেক’ রয়েছে, যার চার দেওয়ালের আড়ালে রমরমিয়ে চলছে ভেজাল ঘি তৈরির ব্যবসা।
ভেজাল ঘিয়ের কারবার ফুলিয়ার একশ্রেণির অসাধু লোকের কাছে আজকাল জলভাত। এই ধরনের ব্যবসায়ীদের আধিপত্য রয়েছে চাকদহেও। হবে নাই বা কেন? ভেজাল তৈরি করলে যে প্রায় দ্বিগুণ লাভ! আসল ঘিয়ের দরে রমরমিয়ে বাজারে বিকোবে ভেজাল। তাতেই ফুলেফেঁপে উঠবে ‘ব্যবসা’। জেলা পুলিসের এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ একাধিকবার অভিযান চালায় বটে। তবে সমূলে উৎখাত হয় না। ফুলিয়ার একাধিক জায়গায় রয়েছে ভেজাল ঘি তৈরির ডেরা। কীভাবে তৈরি হচ্ছে ভেজাল ঘি? সরেজমিনে খতিয়ে দেখা গিয়েছে, ভেজাল তৈরিতে আসল ঘি ব্যবহার হয় নামমাত্র। অনেকে তাও ব্যবহার করে না। মূল কাঁচামাল সস্তার বনস্পতি। প্রথম পর্যায়ে, তার সঙ্গেই মেশানো হচ্ছে অল্প দামের পাম তেল। এই দুইয়ের মিশ্রণ আপাতদৃষ্টিতে ঘিয়ের মতোই। তবে এখানেই উপকরণের শেষ নয়। পরবর্তী ধাপে, ঘিয়ের মতো ঘনত্ব আনতে মিশ্রণে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর ক্রিম অথবা আসল ক্রিমের ছাঁট থেকে বেরোনো ‘চাঁচি’। একাধিক ক্ষেত্রে আবার পশুচর্বি মেশানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। অন্তিম পর্যায়ে, আসল ঘিয়ের মতো সুবাস তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক মিশিয়ে। যা মানব শরীরের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। স্থানীয়রা বলেন, ভেজাল ঘি তৈরিতে ‘লটকানা’ নামের এক ধরনের ফল ব্যবহার হয়। যদিও এই ফল আসলে কী, তার স্পষ্ট উদাহরণ মেলেনি। এই সমস্ত ধাপ ঠিকভাবে অনুসরণ করলেই তৈরি হয়ে যায় এক্কেবারে আসলের মতোই দেখতে ও গন্ধযুক্ত ভেজাল ঘি। এবার সেগুলি বড় বড় টিন অথবা কৌটোবন্দি হয়ে চলে যায় বিক্রির জন্য। একাধিকবার এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ বা ইবি এই ডেরাগুলিতে হানা দেয় বটে, তবে অনেকক্ষেত্রেই আগেভাগে খবর পেয়ে অসাধু কারবারিরা ভেজাল মাল সরিয়ে ফেলে। তাহলে ভেজাল আর আসল চেনা যাবে কীভাবে? এই প্রশ্নের নিশ্চিত কোনও জবাব মেলেনি। তবে ওয়াকিবহালদের অনেকে বলেন, আসল ঘি আগুনের সামনে গলে যায় চট করে। ভেজাল ঘি গলতে কিছুটা সময় লাগে। যদিও এর বাস্তব ভিত্তি কতটা, তা যাচাই করা যায়নি। প্রশাসনের একটি সূত্র বলছে, ভেজালের বাড়বাড়ন্তের অন্যতম কারণ ফুড সেফটি বিভাগের সক্রিয়তার অভাব। ভেজাল ধরতে ফুড সেফটি ডিপার্টমেন্ট যেন ঢাল তলোয়ারহীন ‘নিধিরাম সর্দার’। কারণ, ভেজালের কারখানায় দাঁড়িয়ে তৎক্ষণাৎ প্রাথমিকভাবে ক্ষতিকর ঘি চেনার কোনও মেশিন এখনও জেলাস্তরে নেই। নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠালে তার রিপোর্ট আসতে সময় লাগে মাসখানেক। ফলে ভেজালের ব্যবসা যত তাড়াতাড়ি প্রসারিত হয়, ঠিক ততটাই মন্থর গতিতে চলে প্রশাসন। অতএব, ফুলিয়া থেকে চাকদহ, ভেজালের বাড়বাড়ন্ত চলতে থাকে বছরের পর বছর। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আওতাধীন একজন ডেপুটি সিএমওএইচ দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও এই হাল কেন? প্রশ্নের উত্তরে নদীয়ার মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকারিক জ্যোতিষচন্দ্র দাস বলেন, আমাদের নিয়মিত অভিযান চলে। আমরা জরিমানাও করি। সব জায়গায় খাওয়ার ঘি তৈরি হয় না। কেউ কেউ প্রদীপ জ্বালানোর জন্য ঘি তৈরি করে। তবে ঘটনাস্থলেই ভেজাল চিনতে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো কেন নেই, তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাদের সেই পরিকাঠামো দিলে তবেই তো আমরা তা ব্যবহার করতে পারব।(চলবে)