নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: দোষী সাব্যস্ত হওয়ার অপেক্ষা নয়। অভিযোগের ভিত্তিতে ৩০ দিন একটানা জেল হেফাজতে থাকলেই খোয়াতে হবে মন্ত্রিপদ। সংবিধান, বিচার বিভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর তোয়াক্কা না করে মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীকে সরানো সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধন বিল এনেছে কেন্দ্র। আর তাতেই বাড়ছে বিতর্কের পারদ। এই আবহে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিল দেশের প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাইয়ের মন্তব্য। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘আইন প্রণেতা, প্রশাসক এবং বিচার ব্যবস্থা—এই তিনটিকে সংবিধান সুন্দরভাবে ভাগ করে দিয়েছে। বলে দিয়েছে, কার দায়িত্ব কী। তারপরও যদি প্রশাসন বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে তো দায়িত্ব ও ক্ষমতা বিভাজনের সংবিধান-সূত্রে আঘাত হানা হয়!’ বিচারপতি গাভাই সরাসরি মোদি-শাহ কারও নাম নেননি ঠিকই, তবে তাঁর লক্ষ্য যে সম্প্রতি সংসদে পেশ করা ১৩০তম সংবিধান সংশোধনী বিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই রাজনৈতিক মহলের।
পানাজিতে গোয়া হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে দেশের প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘প্রশাসন কখনও বিচারকের ভূমিকা নিতে পারে না। তাহলে তা সংবিধানের উপর আঘাতেরই শামিল।’ এ ব্যাপারে বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের তথাকথিত ‘বুলডোজার বিচার’ প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন বিচারপতি গাভাই। বলেছেন, ‘দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই জোরজবরদস্তি বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ একজন অপরাধ করলে কি তার গোটা বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া যায়? ওই বাড়ির অন্য সদস্যরা কী অপরাধ করল? নিরপরাধ ব্যক্তিও শাস্তি পেল। এটা ঠিক নয়। তাই সুপ্রিম কোর্ট এ ধরনের পদক্ষেপ রুখে দিয়েছে। দেশের সংবিধান অপরাধীকেও বলার সুযোগ দেয়। ফলে প্রশাসন বিচারকের ভূমিকা নিতে পারে না।’
দেশের প্রধান বিচারপতির এই অবস্থানে বিজেপি বিরোধীরাও যে অক্সিজেন পেল, তা বলাই বাহুল্য। সংসদে বিরোধীদের ‘বুলডোজ’ করে যদি মোদি-শাহ বিল পাশও করান, তাহলেও আদালতে তা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে ওয়াকিবহাল মহল। যদিও বিল পাশ হওয়া রুখতে বিরোধীরা একজোট। গত বুধ এবং বৃহস্পতিবার যথাক্রমে লোকসভা-রাজ্যসভায় তা দেখিয়ে দিয়েছে ‘ইন্ডিয়া’। বিল পেশের সময়ই প্রতিলিপি ছিঁড়ে প্রতিবাদে উত্তাল করা হয়েছে অধিবেশন। একইভাবে, সংসদীয় যৌথ কমিটিতেও বিরোধীদের সিংহভাগ অংশ নেবে না বলে ঠিক করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ মতো তৃণমূল কাউকে ওই কমিটিতে পাঠাচ্ছে না। সেই পথ অনুসরণ করছে সমাজবাদী পার্টি এবং আম আদমি পার্টিও। কংগ্রেস অবশ্য এখনও দোটানায়। তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন রবিবার বলেন, ‘সংসদীয় ওই যৌথ কমিটির কোনও মূল্য নেই। যে বিল পাশই হতে দেব না, তার আবার আলোচনা কীসের?’ সমাজবাদী সুপ্রিমো অখিলেশ যাদবের মন্তব্য, ‘আমাদের দলের কেউ কমিটির সদস্য হবে না।’ আম আদমি পার্টির সঞ্জয় সিংয়ের বক্তব্য, ‘নরেন্দ্র মোদি তো দুর্নীতি দূর করতে আসেননি। তাহলে তো তাঁর নিজের দলেই থাকা দুর্নীতিগ্রস্তদের তাড়াতেন। মোদিজির লক্ষ্য, বিরোধী শাসনে চলা রাজ্যগুলিকে ক্ষমতাচ্যুত করা, বিরোধী দলের মধ্যে বিভাজন। তাই আমরাও সংসদীয় যৌথ কমিটিতে থাকব না।’ এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন একটাই—৩১ সদস্যের সংসদীয় কমিটিতে যদি বিরোধীদের ১০-১২ জন না থাকেন, তাহলে আদৌ কমিটি তৈরি হবে তো?