বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: কাড়ি কাড়ি টাকা নন প্র্যাকটিসিং পে (এনপিপি) নিয়েও চুটিয়ে চেম্বার করা নতুন নয়। আগের সরকার এইসব মার্কামারা চিকিৎসকদের তালিকা তৈরি করেছিল। কিন্তু এবার আরও এক কাঠি এগিয়ে তিন সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প থেকেই এঁদের ‘ব্লক’ করে দিচ্ছে স্বাস্থ্যভবন। দপ্তরের এক পদস্থ সূত্রে এই খবর জানা গিয়েছে। ‘ব্লক’ করার অর্থ হল, ২০-২৫ হাজার টাকা এনপিপি পাওয়ার পরও বেআইনিভাবে ‘উপরি রোজগেরে’ এসব চিকিৎসক কোনোদিন তিনটি সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের আওতায় আর রোগী ভরতি, চিকিৎসা, প্রসিডিয়োর বা অপারেশন—কোনোটাই করতে পারবেন না। প্রকল্প তিনটি হল আয়ুষ্মান ভারত, মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা এবং স্বাস্থ্যসাথী (যতদিন চালু থাকবে)। সূত্রের খবর, নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে। প্রত্যেক সরকারি ডাক্তারের খুঁটিনাটি তথ্য দপ্তরের কাছে আছে। এনপিপি নেওয়া সত্ত্বেও সরকারি স্বাস্থ্যবিমার রোগী ভরতি করলেই ধরা পড়ছে দপ্তরের রেডারে। ইতিমধ্যে প্রায় ২০০ ডাক্তারকে এই তিন প্রকল্প থেকেই ‘ব্লক’ করা হয়েছে। আরও হবে।
দপ্তর সূত্রে খবর, বর্তমানে স্বাস্থ্যদপ্তরে স্থায়ী চাকরিরত চিকিৎসকের সংখ্যা ১১ হাজারের কিছু বেশি। ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল এডুকেশন সার্ভিসের আওতাধীন শিক্ষক-চিকিৎসকের সংখ্যা ৪ হাজারেরও বেশি। বাকিরা হেলথ সার্ভিসে কর্মরত। এই ওয়ার্কফোর্সের মধ্যে কমবেশি ৬০ শতাংশই এনপিপি নিয়ে থাকেন। সরকারি নিয়মানুযায়ী, বেসিকের ২৪ শতাংশ তাঁরা পান এনপিপি হিসাবে। এর বিনিময়ে প্র্যাকটিস বা চেম্বার করবেন না—এই শর্ত থাকে। সর্বশেষ পে কমিশনে এই ২৪ শতাংশ এনপিপি সর্বোচ্চ কত হবে, তার সিলিং বেঁধে ২৪ হাজার টাকা (শিক্ষক চিকিৎসক) ও ২০ হাজার টাকা (অশিক্ষক চিকিৎসক) করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যভবনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষক চিকিৎসকদের মধ্যে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফরেনসিক, প্যাথোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মাকোলজি, কমিউনিটি মেডিসিন প্রভৃতি প্রি এবং প্যারাক্লিনিক্যাল বিষয়ের শিক্ষক চিকিৎসকদের একটি বড়ো অংশই এনপিপি নেন। তা সত্ত্বেও অনেকেই চুটিয়ে প্র্যাকটিস করছেন। এমনকি, এই তালিকায় বহু হাসপাতালের সুপার-অধ্যক্ষও ছিলেন। এখনও আছেন কেউ কেউ। স্বাস্থ্য শিক্ষা শাখার এক কর্তা বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি এই অনিয়ম দেখা যাচ্ছে শহরতলি ও গ্রামীণ এলাকায়। বিষয় যাই হোক, ডিগ্রির পাশে এমডি দেখেই বড়ো ডাক্তার মনে করে তাঁদের চেম্বারে ছুটছেন লোকজন।’
তবে পালটা মতও আছে। চিকিৎসকমহলের একাংশের বক্তব্য, প্রথমত, এই কাজ যদি ‘অপরাধ’ বলেই বিবেচিত হয়, তাহলে প্র্যাকটিসিং ডাক্তারদের সিংহভাগ যে ডিউটি আওয়ার্সেই নার্সিংহোমে দৌড়ঝাঁপকে রেওয়াজ করে ফেলেছেন, তখন সরকার কি ঘুমিয়ে থাকে? দ্বিতীয়ত, বর্তমানে গ্রামীণ এলাকায় পোস্টিং পাওয়া অধিকাংশ চিকিৎসক পদই নন প্র্যাকটিসিং। বছরের পর বছর পরিবার, পরিজন বর্জিত পরিবেশে কাটানো এসব চিকিৎসকরা যদি যৎসামান্য প্র্যাকটিস করেন, তা কি খুব বড়ো অপরাধ!



