Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আসন পুনর্বিন্যাসে গ্রহণযোগ্য পথ নিতে হবে

ভারতের সংবিধানের ৪২তম সংশোধনী হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। তারপর থেকে আসন পুনর্বিন্যাসের (ডিলিমিটেশন) বিষয়টি রাজ্যগুলির ঘাড়ের উপর একটি খাঁড়ার মতোই ঝুলে রয়েছে।

আসন পুনর্বিন্যাসে গ্রহণযোগ্য পথ নিতে হবে
  • ১০ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ভারতের সংবিধানের ৪২তম সংশোধনী হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। তারপর থেকে আসন পুনর্বিন্যাসের (ডিলিমিটেশন) বিষয়টি রাজ্যগুলির ঘাড়ের উপর একটি খাঁড়ার মতোই ঝুলে রয়েছে। সংবিধানের ৮১ এবং ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদের বক্তব্য পরিষ্কার: তারা ‘এক নাগরিক, একটি ভোট’ নীতিটি সংযুক্ত করেছে। 

Advertisement

৮১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, লোকসভার নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা রাজ্যগুলি থেকে ৫৩০ জনের বেশি হবে না। নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির (ইউটি) ক্ষেত্রে ২০ জনের বেশি নয়। এমন একটি সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান সংখ্যা রয়েছে রাজ্যগুলি থেকে ৫৩০ এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি থেকে ১৩।
(২)(ক) উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:
“প্রতিটি রাজ্য থেকে লোকসভায় এমনভাবে আসন বরাদ্দ করা হবে যাতে সেই সংখ্যা এবং রাজ্যের জনসংখ্যার মধ্যে অনুপাত, যতদূর সম্ভব, সমস্ত রাজ্যের জন্য একই থাকে।”
‘জনসংখ্যা’ শব্দটির অর্থ হল—পূর্ববর্তী সেন্সাস বা জনগণনায় নির্ধারিত লোকসংখ্যা, তবে শর্ত থাকে যে ২০২৬ সাল পরবর্তী প্রথম জনগণনা পর্যন্ত, রাজ্যগুলির জনসংখ্যা ১৯৭১ সালের সেন্সাস সংখ্যা অনুসারে হবে। অনুচ্ছেদ ৮১ অনুসারে প্রতিটি জনগণনার পরে একটি রাজ্যের জন্য বরাদ্দকৃত আসনের সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করা হবে, কিন্তু এই অনুশীলন স্থগিত রাখা হয়েছিল ২০২৬ সাল পরবর্তী জনগণনা পর্যন্ত। অতএব, ‘এক নাগরিক, এক ভোট’ নীতি লঙ্ঘন করে বিভিন্ন রাজ্যের জন্য বরাদ্দকৃত আসন সংখ্যা স্থির করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের হিসেব মতো।
গণতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা
এতে কোনও সন্দেহ নেই যে ‘এক নাগরিক, এক ভোট’ গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতি কিন্তু, ১৭৭৬ সালে আমেরিকাবাসীদের উপলব্ধি ছিল যে এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী। তবে তাঁরা এর এমন একটি সমাধান খুঁজে পেয়েছেন যেটি আড়াইশো বছর যাবৎ তাঁদের ভালো মতোই কাজে লেগেছে বলে মনে হয়। প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস) ৫০টি রাজ্যের জন্য বরাদ্দকৃত আসন তাঁরা নানা সময়ে পুনর্নির্ধারণ করেছেন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের জনসংখ্যার ভিত্তিতে, কিন্তু সিনেটে প্রতিটি রাজ্যকে দেওয়া হয়েছে সমান প্রতিনিধিত্ব (দু’জন সদস্য)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো, ভারতও একটি গণতন্ত্র এবং একটি ফেডারেশন (যুক্তরাষ্ট্র)। জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্বের সমস্যাগুলি আমরা ১৯৭১ সালে অবগত হয়েও তার সমাধান খুঁজে বের করিনি। বরং তার পরিবর্তে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখে দিয়েছি আমরা।
সর্বশেষ সেন্সাস হয়েছিল ২০১১ সালে। পরবর্তী জনগণনা ২০২১ সালে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু 
তা স্থগিত রাখা হয়েছিল কোভিড-১৯’এর কারণে। ২০২১ সাল থেকে কোনও না কোনও অজুহাতে জনগণনা ঝুলিয়েই রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালের পরে জনগণনার অর্থ হবে আসন পুনর্বিন্যাসও (ডিলিমিটেশন) করা। প্রতিটি রাজ্যের জন্য বরাদ্দকৃত আসন সংখ্যারও পুনর্নির্ধারণ করা হবে। তাতে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির জন্য কিছু রাজ্য পুরস্কৃত 
হবে। একইসঙ্গে টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) ২.০ বা তার কম হয়ে যাওয়ার কারণে শাস্তিই ভোগ করবে কিছু রাজ্য। ‘এক নাগরিক, এক ভোট’-এর ক্ষেত্রে এই বৈষম্য সৃষ্টি হবে, তা বজ্রাঘাত করবে আপনার মস্তকে। 
হ্রাস ও বৃদ্ধি
লোকসভার মোট আসন সংখ্যা ৫৩০+১৩-তে স্থির করে দেওয়া হলে এবং সংবিধানের ৮১ ও ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে আসন পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) ও পুনর্নির্ধারণ (রি-ডিটারমিনেশন) করা হলে, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, কেরল, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানার মতো দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লোকসভায় ওই রাজ্যগুলির মোট সদস্য সংখ্যা ১২৯ থেকে কমে মাত্র ১০৩-এ নেমে আসবে বলে অনুমান করা হচ্ছে! লোকসভায় আসন সংখ্যা নির্ধারণের জন্য জনসংখ্যার অনুপাতের নীতি প্রয়োগের যেকোনও পদ্ধতি সেই রাজ্যগুলিকেই ‘শাস্তি’ দেবে, যারা জনসংখ্যার উর্বরতা হার হ্রাস এবং স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভালো কাজ করেছে। অথচ ৫০ বছরেরও বেশিকাল ধরে এটাই আমাদের জাতীয় লক্ষ্য ছিল এবং এখনও তা আছে। আজ, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলির লোকসভায় ১২৯/৫৪৩-এর সমান কণ্ঠস্বর রয়েছে, এবং তারা যথেষ্ট সোচ্চার নয়। এবার সেই ভগ্নাংশটি যদি ১০৩/৫৪৩-এ নামিয়ে আনা হয়, তাহলে দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলির কণ্ঠস্বর আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে। 
দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলির আসন সংখ্যা কমানো হবে না—এই আশ্বাস একটি ফাঁকা প্রতিশ্রুতি। মনে রাখতে হবে যে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের মতো সবচেয়ে জনবহুল রাজ্যগুলির আসন সংখ্যা বৃদ্ধি না করার কোনও প্রতিশ্রুতি কিন্তু দেওয়া হয়নি। যদি ‘কোনও হ্রাস নয়’ এবং ‘বৃদ্ধি’ উভয়ই আসন পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে একত্রে কার্যকর করা হয়, তবে লোকসভায় নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে নেওয়ার একমাত্র উপায় হতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতির পূর্বাভাস ছিল এবং সেইমতো পরিকল্পনা করেই চাতুর্যের সঙ্গে সদস্যদের জন্য ৮৮৮ আসন বিশিষ্ট লোকসভার নতুন কক্ষটি নির্মাণ করা হয়েছে। আসন পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে ওই পন্থাই অবলম্বন করা হলে দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলির কণ্ঠস্বর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে—সেটি ১২৯/৫৪৩ (=২৩.৭৬ শতাংশ) থেকে ১২৯/৮৮৮ (=১৪.৫৩ শতাংশ) রূপ নেবে।
যেভাবেই হোক, ‘একজন নাগরিক, এক ভোট’ নীতি মেনে চলার জন্য এতে বড্ড চড়া মাশুল গুনতে হবে। প্রজনন হার হ্রাস এবং জনসংখ্যা স্থিতিশীল করার জন্য এমন মাশুল গ্রহণযোগ্য নয়। বাছাই করা কয়েকটি রাজ্যের বর্তমান টোটাল ফার্টিলিটি রেটের (উৎস: এনএইচএফএস-৫) মধ্যেই রয়েছে এই কাহিনির রহস্য:
ক্ষতিগ্রস্ত ও লাভবান
লোকসভায় রাজ্যের কণ্ঠস্বরের দিক থেকে, টিএফআর যেসব রাজ্যে কম তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং যেখানে টিএফআর বেশি সেই রাজ্যগুলি হবে লাভবান। রাজ্যসভার সদস্যপদ ইতিমধ্যেই অধিক জনবহুল রাজ্যগুলির অনুকূলে।
যদি কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধানের ৮১ এবং ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য নাছোড় মনোভাব নিয়ে থাকে এবং দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলি জনসংখ্যার ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণের বিরোধিতা করে, তাহলে একটি ভয়ানক গণ্ডগোল হতে পারে। পরিণামে ঘটে যেতে পারে কোনও বিপর্যয়ও। আমাদের কি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান খোঁজার সুবুদ্ধি হবে না?
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ