সৌম্য দে সরকার, মালদহ: বাড়ি ফেরার ৪৮ ঘণ্টা পরেও ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে কালিয়াচকের জালালপুরের যুবক আমির শেখ। নিজের ছায়াকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। খাওয়ার পরিমাণ প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। তীব্র ব্যথা রয়েছে মাথার বাঁদিকেও। শনিবার মালদহ মেডিক্যালে চিকিৎসার জন্য আমিরকে নিয়ে এসেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। চিকিৎসকরা চারদিনের ওষুধ দিয়েছেন। তাতে উপশম না হলে বেশকিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করার প্রয়োজনের কথা বলেছেন। ঘরের ছেলেকে ফিরে পেয়ে স্বস্তি পেলেও তাই এখনও উদ্বেগ আমিরের পরিবারে।
৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতে কাকা আজমাউল শেখ এবং অন্য দুই আত্মীয় ও পারিবারিক বন্ধুর সঙ্গে ঘরে ফেরেন আমির। আত্মীয় স্বজনের পাশাপাশি পাড়া প্রতিবেশীরাও ভিড় জমিয়েছিলেন ২২ জুলাই বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ হওয়া এলাকার তরুণকে দেখতে। তবে, তাঁদের মনে হয়েছে, এ যেন অন্য আমির। চুপচাপ। চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। চেনা পরিবেশেও যেন কিছুতেই স্বচ্ছন্দ হতে পারছিলেন না তিনি। হাতেগোনা কয়েকটি কথা বললেও কার্যত বাকরুদ্ধ হয়েই বসে রয়েছেন তিনি। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর পরিবারের লোকেরা শুনেছেন তাঁর ভয়াবহ বৃত্তান্ত।
আমিরের কাকা আজমাউলের দাবি, বাংলাদেশি বলে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য আমিরের পায়ের উপর বুট পরে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন রাজস্থান পুলিসের কয়েকজন কর্মী। পরে বিএসএফের মাধ্যমে রাত একটায় তাঁকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। বিএসএফের হাতে চড়খাপ্পড় খেতে হয়েছে বলে অভিযোগ আমিরের পরিবারের দাবি। ছাড় মেলেনি সীমান্ত পার হওয়ার পরেও। প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে যাওয়ার পর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কর্মীরাও তাঁকে ধরে নিপীড়ন করেন। ওই রাতে একটি বাড়িতে বন্ধ রাখা হয় তাঁকে। পরের দিন অবশ্য ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রায় দু’দিন অভুক্ত থাকা আমির বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার একটি হোটেলে খাবার চেয়েছিলেন। সেটির মালিক তাঁর বৃত্তান্ত শুনে খাবারের পাশাপাশি বাসন ধোয়ার কাজও দেন। কিন্তু মাত্র চারদিনের মাথায় ফের বিজিবি আমিরকে সেখান থেকে তুলে এনে বাংলাদেশ পুলিসের হাতে তুলে দেয়। রাজস্থানের পর ফের সাতক্ষীরার জেলে ঠাঁই হয় আমিরের।
আউমাউল জানান, হোটেলে কাজ করার সময় এক ভারতীয় রপ্তানিকারক আমিরের অসহায় অবস্থা দেখে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। তিনিই পরে ওই ভিডিওটি করেন, যেটি ভাইরাল হয়ে যায়। সেই ভিডিও দেখেই প্রকাশ্যে আসে আমিরের অবর্ণনীয় যন্ত্রণার ইতিবৃত্ত। নড়েচড়ে বসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জনপ্রতিনিধি থেকে প্রশাসন। অবশেষে দেশে ফেরানো হয় আমিরকে।
আমিরের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। রাজস্থান পুলিস সহ বিভিন্ন বাহিনীর চরম নিগ্রহ আমিরকে শরীরের পাশাপাশি মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের লোকেরা।