উৎসব তো নয়, যেন দশ দিন ধরে এক নজিরবিহীন স্নায়ুযুদ্ধের সাক্ষী থাকল বাংলা। ২২ সেপ্টেম্বর, দেবীপক্ষ শুরুর দ্বিতীয় রাতে টানা ৬ ঘণ্টার প্রবল বর্ষণে বিধ্বস্ত কলকাতা ও আশপাশের এলাকার ছিন্নভিন্ন চেহারা দেখে প্রমাদ গোনা শুরু হয়েছিল, বৃষ্টিতে ভেসে যাবে না তো উৎসবের আনন্দ! সেই আশঙ্কাকে কয়েকগুণ উস্কে দিয়েছিল নানা কিসিমের নিম্নচাপের ভ্রুকুটি। কিন্তু নবমী-দশমীতে কয়েকপশলা বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি বাদ দিলে অনেকটা সময় জুড়ে রোদ ঝিলমিল আকাশ যেমন একদিকে স্বস্তি দিয়েছে, তেমনই যাবতীয় শঙ্কা সত্ত্বেও কার্যত তৃতীয়া থেকেই রাতের দখল নেওয়া মণ্ডপমুখী জনতা ফের একবার প্রমাণ করে দিয়েছে, কোনও পরিস্থিতিতেই বাঙালিকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। অতএব বলা চলে, বৃষ্টি নামক ‘অসুর’-এর সৌজন্যে আশা-আশঙ্কার দ্বন্দ্ব নিয়ে দেবীপক্ষ শুরু হলেও দেবীর কৈলাসে ফিরে যাওয়ার মুহূর্তকাল পর্যন্ত উৎসব কম পড়েনি। আসলে এ এক অমোঘ আকর্ষণ, যার জন্য এক বছর ধরে প্রতীক্ষার প্রহর গোনা শুরু হয়। এই টানে একদা করোনাসুরকে হারিয়ে জিতে যায় আবেগ। গত বছর সরকারি হাসপাতালে ‘অভয়ার’ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তৈরি হওয়া ক্ষোভের আগুনকে বুকে নিয়ে উৎসবের জনারণ্যে পা মেলায় মানুষ। তবে বৃষ্টির আশঙ্কা এবার মন খারাপের চেষ্টা করলেও আগামী বছর সেই সম্ভাবনা কম— বলছেন আবহবিদরা। কারণ ২০২৬-এ দুর্গাপুজো শুরু হবে ১৭ অক্টোবর। তাই নিশ্চিন্ত হওয়াই যায়।
শারদোৎসব এখন ‘বারোয়ারি উৎসব’ হয়ে বহু জায়গায় থিম পুজোর চেহারা নিলেও অতীতে একটা দীর্ঘ সময় পুজো ছিল একান্তভাবেই পারিবারিক উৎসব। তখন শহরে কাজ করতে আসা বাঙালি পরিবার পুজোর ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফিরতেন। ফলে তখন শহরের ভিড় আজকের মতো তেমন নজরকাড়া ছিল না। সেই অতীত এখন শুধুই স্মৃতি। এখন পুজোর উৎসবে মাততে গ্রাম উঠে আসে মহানগরে। কারণ পুজোর দিনগুলিতে গোটা পরিবার একত্রিত হওয়ার ধারণাও ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে। গতিশীল সময়ের হাত ধরে নগরায়ণের সংজ্ঞাও পাল্টে যাচ্ছে। ফলে পুজো এখন পারিবারিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বারোয়ারির পথ ঘুরে থিম পুজোর রূপ ধারণ করেছে। এই পুজোই এখন উৎসব-আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। শুধু বহিরঙ্গের এই পরিবর্তনই নয়, পুজোর সংস্কৃতিও বদলেছে অনেকটাই। এই উৎসব যেন প্রকৃত অর্থেই সকলের ইচ্ছাপূরণের এক মিলন মেলা, যেখানে আলো, বাঁশ, কাপড় সহ নানা সামগ্রী দিয়ে তৈরি অপরূপ শিল্পসজ্জা দেখে মনে হবে, এ বুঝি সত্য! মানুষের হাতে তৈরি এমন শিল্পসৃষ্টিও কি সম্ভব! এবারেও তার অন্যথা ঘটেনি।
সন্দেহ নেই, গত এক দশকে সব অর্থেই দেশের সেরা উৎসবে পরিণত হয়েছে দুর্গোৎসব। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির হাত ধরে এই উৎসবের বিশ্বায়ন ঘটেছে। শুধু এর ব্যাপ্তি বা শিল্পকর্মই নয়, পুজো-অর্থনীতির নজরকাড়া উত্থানও এখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। প্রশাসনের দাবি, ২০২৫-এ পুজোকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাণিজ্য এক লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিদেশে প্রতিমার দাম ও বরাত বৃদ্ধি পেয়েছে। পোশাক শিল্পে যেন জোয়ার এসেছে। প্রাথমিক হিসাব বলছে, গতবারের তুলনায় এবছর পোশাক বিক্রি থেকে আয় বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই পুজো যেন হস্তশিল্পীদের কাছে প্রকৃত অর্থে মায়ের আশীর্বাদস্বরূপ। বাড়তি রোজগার হয়েছে স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় দেড় কোটি মানুষের। সব মিলিয়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষের পরোক্ষ আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রতিমার সাজে চিরাচরিত শোলা বা ডাকের সাজের পাশাপাশি আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীদের তৈরি গয়না জায়গা করে নিয়েছে। এসবের মিলিত পরিণতি লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসা। গত বছর এই পরিমাণ ছিল ৭৫-৮০ হাজার কোটি টাকা। ঘটনা হল, পুজোকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিল বানিয়ে এবং বিভিন্ন সংস্থা ও দোকানের বিজ্ঞাপনে ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ হিসাবে কাজ করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছেন লক্ষাধিক ছেলেমেয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুজো তাই আর শুধু আনন্দে গা-ভাসানোর উৎসব নয়, কম সময়ে উপার্জনের এক সুযোগও। যত বছর গড়াচ্ছে, পুজো-অর্থনীতির পারদ তত চড়ছে।