কলকাতায় রয়েছে ট্রাম মিউজিয়াম। যেখানে গেলে ছোঁয়া যায় ইতিহাসকে। ঘুরে এসে লিখলেন চকিতা চট্টোপাধ্যায়
কলকাতায় রয়েছে ট্রাম মিউজিয়াম। যেখানে গেলে ছোঁয়া যায় ইতিহাসকে। ঘুরে এসে লিখলেন চকিতা চট্টোপাধ্যায়
‘ইঁটে গড়া গন্ডার বাড়িগুলো সোজা
চলিয়াছে, দুদ্দাড় জানালা দরোজা।
রাস্তা চলেছে যত অজগর সাপ,
পিঠে তার ট্রামগাড়ি পড়ে ধুপ্ ধাপ্।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু’ কবিতায় কলকাতার ট্রামগাড়ির এমনই মজাদার বর্ণনা দিয়েছিলেন! শুধু রবি ঠাকুর নন, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকদের অনেকের রচনাতেই ঘুরেফিরে এসেছে কলকাতার ট্রামগাড়ির কথা। ট্রাম ছাড়া কলকাতা শহরকে যেন ভাবাই যায় না!
যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবার ট্রাম গাড়িরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রথমে ছিল ঘোড়ায় টানা ট্রাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতার মানুষ বিস্ময়ে অবাক হয়ে সে ট্রাম গাড়িতে চড়ত। এর সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায় ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায়। ঘোড়ায় টানা ট্রামের চারদিক খোলা থাকত। দার্জিলিংয়ে যাওয়ার রেলগাড়ির মতো। গরমকালে তাই সে গাড়িতে চড়ে হাইকোর্ট থেকে পার্ক স্ট্রিট মোড় যেতে ভারী আরাম হতো। হাওয়া খেতে খেতে যাওয়া যেত! এরপর এল ‘কলের ট্রাম’। ধোঁয়াকল বা স্টিম ইঞ্জিনের সাহায্যে চলত সে ট্রাম ধর্মতলার মোড় থেকে খিদিরপুর পর্যন্ত। ঘোড়ায় টানা ট্রামের চেয়ে সে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি যেত! কিন্তু মধ্যে মধ্যে বাঁশির আওয়াজ, আর জোরে চলার কারণে গাড়ির ওঠানামা আর খটখট শব্দ আবার অনেকের ততটা ভালো লাগত না! তাছাড়া দ্রুত গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাওয়াটাও পছন্দ ছিল না সেকালের কলকাতার মানুষদের। যেন ওঠা মাত্রই নামা! এরপর এল ইলেকট্রিক ট্রাম। তখনকার মানুষ অবাক হয়ে ভাবতেন কেমন করে এটা সম্ভব! প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির দু’টি আলাদা বগি, কিন্তু সে দুটো জোড়া ছিল না।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘অপরাজিত’ উপন্যাসে এই বৈদ্যুতিক ট্রামের উল্লেখ আছে। ‘বাড়ির সামনে আজকাল ইলেকট্রিক ট্রাম হয়েছে... এঞ্জিনও নেই ঘোড়াও নয়...এমনি চলে। তারের মধ্যে বিদ্যুৎ পোরা আছে। একটা ডান্ডা আছে, তারে ঠেকে থাকে। তাতেই চলে। জানো তো, কলকাতার এই বৈদ্যুতিক ট্রাম কিন্তু এশিয়ার প্রথম ইলেকট্রিক ট্রাম!’
ট্রাম সম্পর্কে এমন আরও অনেক তথ্য জানতে চাও? দেখতে চাও কেমন ছিল সে যুগের ট্রামগুলো নিজের চোখে? তাহলে এসপ্ল্যানেডের ট্রাম মিউজিয়াম ‘স্মরণিকা’য় চলে এসো! গাছগাছালি ও বেঞ্চ দিয়ে সাজানো একটা ছোট্ট পার্কের ভেতর একটা পুরনো ট্রামকেই রূপান্তরিত করা হয়েছে মিউজিয়ামে! টিকিট কাটবার গুমটি ঘরের সামনে রয়েছে কন্ডাক্টারের মডেল। আর এই ট্রাম মিউজিয়ামটির চালকের আসনেও আছে ইউনিফর্ম পরা প্রমাণ সাইজের ড্রাইভারের মডেল। টিকিটের দাম মাথাপিছু কুড়ি টাকা। টিকিটগুলোকে দেখতেও অবিকল ট্রামের টিকিটের মতোই! অবশ্যই সংগ্রহে রাখার মতো। এই টিকিটেই সময় লেখা আছে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। অর্থাৎ, পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই কিন্তু তোমাকে এই মিউজিয়ামটি দেখে নিতে হবে! যেহেতু ভেতরে জায়গা খুব বেশি নেই, তাই ভিড় এড়াতে এই নিয়ম। ‘স্মরণিকা’ মিউজিয়ামটি বৃহস্পতিবার বাদে প্রতিদিন খোলা থাকে দুপুর ১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। ১৯৩৮ সালে তৈরি একটি ভিনটেজ ট্রামকেই পরিণত করা হয়েছে মিউজিয়ামে।
ট্রামটিতে আছে দু’টি জোড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগি। প্রথম বগিটিকে একটি ক্যাফেটেরিয়ার রূপ দেওয়া হয়েছে। তবে চলমান ট্রামের মতোই বড় বড় জাল দিয়ে ঘেরা সিলিং ফ্যান রয়েছে। জানলার ধারে ধারে সিঙ্গল আর ডাবল সিট। সামনে ছোট টেবিল। ইচ্ছে করলে এখানে বসে চা-কফি-বিস্কুট-চিপস্ খেতে পার। এর দেওয়াল জুড়ে সাজানো আছে পুরনো কলকাতার ছবি। আছে ট্রাম সম্পর্কে বিভিন্ন সাহিত্যিকদের লেখার প্রতিলিপি।
দ্বিতীয় বগিটির ভেতরেই গড়ে উঠেছে মিউজিয়াম ‘স্মরণিকা’। এটি চালু হয়েছে ২০১৪ সাল থেকে। দেওয়াল জুড়ে আছে নানা তথ্য। ১৮৭৩ সালে প্রথম আর্মেনিয়ান ঘাট থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু হয়েছিল। প্রধানত মাল পরিবহণের জন্যই কলকাতা ট্রামের পত্তন।
দিনটা ছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩। সকাল থেকে অগণিত মানুষ শিয়ালদহ স্টেশনে ভিড় করেছিল এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে! সোয়া ন’টা নাগাদ দু’টি বগি আলাদা আলাদাভাবে এসে দাঁড়ানো মাত্রই দ্বিতীয় বগিটিতে উঠে পড়লেন অপেক্ষারত মানুষ! আসন ছিল মাত্র পঁয়তাল্লিশটি। ঠেলাঠেলি করে জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ ট্রামের ছাদে উঠে পড়লেন! প্রথমটি ফার্স্ট ক্লাস বগি হওয়ায় সেখানে ছিলেন মাত্র তিনজন ইউরোপীয় ও দু’জন ভারতীয় যাত্রী। প্রথম বগিটির এই ক’জন যাত্রী নিয়ে দু’টি তেজি ঘোড়া রওনা দিল। কিন্তু মানুষ উপচানো দ্বিতীয় বগিটিকে নিয়ে আর এগতে পারল না তেজি ঘোড়া দু’টিও! শেষপর্যন্ত ট্রাম কোম্পানির কর্মচারীরা ট্রামটিকে ঠেলতে ঠেলতে গন্তব্যে পৌঁছে দিল! মাত্র ন’মাস চলল এই পরিষেবা। কলকাতার ভ্যাপসা গরমে অতিরিক্ত ভার বহন করতে গিয়ে তেজি ঘোড়ারাও কাহিল হয়ে মারা পড়ছিল!
প্রথমবারের উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ার ঠিক সাত বছরের মাথায় পয়লা নভেম্বর ১৮৮০ সালে নতুন উদ্যমে শুরু হল দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রাম পরিষেবা। নতুন কোম্পানি অস্ট্রেলিয়া থেকে নিয়ে এল ওয়েলার ঘোড়া। তৈরি করল নতুন মডেলের সুদৃশ্য ট্রামগাড়ি।
১৮৮২ সালে এল স্টিম ইঞ্জিন চালিত ট্রাম। আর ১৯০২ সালে এল বিদ্যুৎ চালিত ট্রাম। ট্রাম নিয়ে দেওয়াল জুড়ে যেমন আছে এইসব তথ্য, তেমনই আছে নানাসময়ের ট্রামগাড়ির ছোট ছোট মডেল— ঘোড়ায় টানা ট্রাম, ওমনি বাস, বলাকা, ব্যোমকেশ বক্সী ট্রাম, জলের ট্রাম ইত্যাদি। ‘ওমনি বাস’ হল ১৯২০ সালে চালু হওয়া ছোট সিঙ্গল ডেকের ২৫এইচ পি ট্রাম। যেটি পার্ক সার্কাস থেকে পন্টুন ফেরি সার্ভিস পর্যন্ত যেত। জলের ট্রাম ব্যবহার করা হতো রাতে লাইন পরিষ্কার করার জন্য। ‘ব্যোমকেশ বক্সী’র গল্প নিয়ে তৈরি একটি সিনেমায় ব্যবহার করা ট্রামের মিনিয়েচার মডেল আছে এখানে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্যোমকেশ বক্সী ট্রাম’।
প্রথম যুগে ট্রামের টিকিট কাটতে যে পয়সা লাগত, আছে সেগুলোর প্রদর্শনী। এখানে দেখতে পাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কানা পয়সা, ফুটো পয়সা, আনা পয়সা! একটা অদ্ভুত যন্ত্র দেখতে পাবে, যার নাম ‘মুদ্রা বিনিয়োগ যন্ত্র’। কন্ডাক্টর নির্দিষ্ট বোতামে চাপ দিলেই এই যন্ত্র থেকে সেই নির্দিষ্ট মূল্যের মুদ্রা বেরিয়ে আসত! শোকেসে সাজানো আছে সিনিয়র ইন্সপেক্টর, টাইম কিপার, কন্ডাক্টর, পয়েন্টসম্যান, স্টার্টার, জমাদার প্রভৃতি পদমর্যাদা অনুযায়ী ট্রাম কর্মচারীদের পোশাক, টুপি, আর্মলেট, ট্যাসেল। পদমর্যাদা অনুসারে আবার আর্মলেটের স্ট্রাইপসের সংখ্যা ঠিক করা হতো। আরেক দিকে পাবে নানান রকম ট্রাম টিকিটের নমুনা।
ট্রাম চালানোর জন্য যত রকম যন্ত্রপাতি লাগে তা রাখা আছে এখানে। ১৯৭০ সালে ব্যবহৃত স্লিভ বিয়ারিং টাইপ টু, অ্যাক্সেলসমেত হুইপ বিয়ারিং, লাল লন্ঠন আর আছে বিভিন্ন ক্যাটাগরি অনুসারে কর্মচারীদের ইউনিফর্মের ব্যাজ।
ট্রামযাত্রায় বিভিন্ন রকম পরিষেবাও দেওয়া হতো, যার কিছু কিছু এখনও চালু রয়েছে, যেমন, মান্থলি পাস, খুচরোর পরিবর্তে ডিউ কুপন, বিশেষ ছাড় দেওয়া স্টুডেন্টস কুপন ইত্যাদি। সেই কুপনগুলোও এখানে রাখা আছে।
শুধু কলকাতার ট্রাম না, সেই সঙ্গে সারা বিশ্বের ট্রাম যাত্রার কথাও বলা হয়েছে এখানে। কলকাতা-মেলবোর্ন ট্রাম যাত্রা উৎসব উপলক্ষ্যে ২০০৫ সালে প্রকাশিত পুস্তিকা, পত্র-পত্রিকার কাটিং, প্যামপ্লেট এবং মা দুর্গার ছবি দেওয়া মেলবোর্নের ট্রামের টিকিটও রাখা আছে এখানে।
কলকাতার ঐতিহ্যের সঙ্গে ট্রাম যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কলকাতার এই ট্রাম মিউজিয়ামে তাই একবার আসতেই হবে! এই ‘স্মরণিকা’ ট্রামটা হয়তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, চলে না ঠিকই, কিন্তু এই ট্রামে চড়লে তোমরা কিন্তু মনে মনে চলে যাবে সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর পুরনো কলকাতার ঘোড়ায় টানা ট্রামের যুগে! সেটা কি কম বড় পাওয়া? তাহলে কবে যাচ্ছ?