নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: হুগলিতে কালীপুজো ঘিরে রয়েছে বিচিত্র রীতি রেওয়াজ। আছে গাত্রবর্ণ থেকে গড়নের রকমফের। আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, তন্ত্রকথা আর রক্তের দাগ। বর্তমান সময়ে আলোর ঝরনাধারায় ধুইয়ে দেওয়া পুজো, থিমের রমরমার মাঝে সেসব নিজস্ব ধারায় উজ্জ্বল। জনশ্রুতি আর জনপ্রিয়তায় তাক লাগিয়ে দিতে পারে।
হুগলির হরিপালের শ্রীপতিপুরে বটকৃষ্ণ অধিকারীর পুজো হয়। বৈষ্ণব পরিবারের কালীপুজো। সেখানে দেবীর গাত্রবর্ণ কচি তরুদলের মতো। শ্রীকৃষ্ণ, রাধাকে বাঁচাতে লীলা করে কালীরূপ নিয়েছিলেন। সেই জনশ্রুতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় হরিপালের পুজো। বৈষ্ণবের ছেলে বটকৃষ্ণ প্রায় ৭৬ বছর আগে তন্ত্রদীক্ষা নিয়েছিলেন। দেবীর গড়নে তাই শাক্ত- বৈষ্ণবের সমাহার। আছে বিচিত্র রীতি। দেবীকে পুজোর রাতে বাঁশি বাজিয়ে শোনাতে হয়, ভোগ হয় ইলিশ মাছে। গাত্রবর্ণের প্রসঙ্গ এলে হুগলির রাজবল্লভী’র কথা বলতে হয়। তিনি চণ্ডী কিন্তু তাঁর শরীর শ্বেত, সাদা। তাঁর অবয়ব স্নিগ্ধ। জনশ্রুতি, শরৎকালীন জ্যোৎস্নার আলোকস্নিগ্ধ হয়ে নির্মিত হয়েছে তাঁর শরীর। রঙের মতো তাঁর অবয়বও বিচিত্র। কালী রাজবল্লভী দ্বিভুজা। তাঁর এক হাতে ছুরি। অন্য হাতে রক্ত রাখার মালসা বা বাটি। তিনি এক পা শিবের বুকে ও অন্য পা ভাঁজ করে শিবের মাথায় রেখে দর্শন দেন। দেবী রাজবল্লভীর প্রতিষ্ঠা নিয়েও আছে অলৌকিক জনশ্রুতি। হুগলির শেওড়াফুলি স্টেশনের কাছে আছে নিস্তারিণী কালী মন্দির। সেখানকার দেবীকে হুঁকো খেতে দেওয়া হয়। শেওড়াফুলির রাজা হরিশ্চন্দ্র তাঁর তিন স্ত্রীর বিবাদে অতিষ্ঠ হয়ে বড়ো রানিকে হত্যা করেছিলেন। সেই অনুতাপে তিনি রাজ্য ছেড়ে ভবঘুরে জীবন বেছে নেন। এরপরের ঘটনা ১২৩৪ বঙ্গাব্দের। স্বপ্নাদেশে শিলাখণ্ড পেয়ে দেবী নিস্তারদাত্রী নিস্তারিণীর প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি রাজ্যশাসক দেবী। তাই তাঁর হাতে থাকে শাসনদণ্ডের প্রতিরূপ, তরোয়াল। শোনা যায়, রানি রাসমণি একবার দেবী নিস্তারিণীকে প্রণাম করতে এসেছিলেন। তাঁকে পথ দেখিয়ে এনেছিলেন বালিকাবেশী দেবী নিজে। হুগলির বলাগড়ের জিরাটের কালিয়াগড়ে পুজো পান দেবী সিদ্ধেশ্বরী। সেই মন্দির দেবী সতীর বলয়োপপীঠ নামে পরিচিত। পুরাণ মতে, সতীর দেহত্যাগের পরে বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র তাঁর দেহ ছিন্নভিন্ন করে। সেই সময় যেখানে সতীর বলয় পড়েছিল তা বলয়োপপীঠ নামে খ্যাত। দেবীর থান প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন। ওই মন্দিরের তত্ত্বাবধায়কদের বংশধর ছিলেন, ‘বাংলার বাঘ’ স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।
স্বপ্নাদেশের পুজো আছে চন্দননগরের গোন্দলপাড়ার নীলকণ্ঠেশ্বরীর মন্দিরে। ১৩২০ সালের আষাঢ়ে দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। শ্রীরামপুরের বল্লভপুরের শ্মশানকালীর পুজো ঘিরেও আছে জনশ্রুতি। প্রায় ১৭৮ বছর আগে ওই পুজো শুরু হয়েছিল। হুগলির পাণ্ডুয়ার মণ্ডলাইয়ের কালীপুজোতে এখনও নররক্ত উৎসর্গ করা হয়। আবার চুঁচুড়ার জাগ্রত দয়াময়ী কালীপুজোতেজুড়ে আছে আকবরি ইতিহাস। আর আছেন দেবী হংসেশ্বরী। বাঁশবেড়িয়ার দেবী সারাবছর শান্তরূপে পুজো নিলেও অমাবস্যার দীপান্বিতা তিথিতে তিনি রূপ বদলান। মুখে ভয়াল মুখোস আর লকলকে রক্তজিভ নিয়ে তখন তিনি প্রচণ্ডা। রূপ বদলই বিচিত্র নয়। দেবীর অবস্থান থেকে গঠন, মন্দিরের নির্মাণ, সবেতেই আছে বৈচিত্র আর ইতিহাস। হংসেশ্বরী মন্দির দেশের একমাত্র দেবদেউল যেখানে তন্ত্রসাধনার সার কথা মন্দিরের ও দেবীর গঠনের মধ্যে ধরে রাখা হয়েছে।



