Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

লজ্জার ছবি

লজ্জার ছবি
  • ৮ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশে এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় রয়েছে নরেন্দ্র মোদির দল। ভারত পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে গিয়েছে। অচিরেই নাকি ৫ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতি অর্জন করে আমেরিকা ও চীনের পর জগৎসভায় তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠতে চলেছে ভারত। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হিসাবে ভারতের এই অর্থনৈতিক উত্তরণ স্বাভাবিক নিয়মেই হবে। এতে সরকারের কোনও কৃতিত্ব নেই। বরং যা দেখে দেশের প্রতিটি মানুষের আর্থিক উন্নয়নের ছবিটা উঠে আসে, সেই মাথাপিছু আয়ের নিরিখে ভারত এখনও পিছনের সারিতেই রয়েছে। মোদির ঘোষিত ২০৪৭ নয়, আগামী একশো বছরেও মাথাপিছু আয়ে আমেরিকা, চীন, ব্রিটেন, জার্মানি, জাপানের মতো প্রথম সারির দেশগুলিকে ছুঁতে পারবে না ভারত। এই সত্যটা বাস্তব হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যাতত্ত্বের মারপ্যাঁচ ঘটিয়ে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে ওঠার ‘খোয়াব’ দেখাচ্ছে মোদি বাহিনী। এ তো গেল অর্থনীতির কথা। প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় স্লোগান হল ‘সব কা বিকাশ’। সেই বিকাশ বা উন্নয়নের ছবিটাও কত করুণ, সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার রিপোর্ট। সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট-এর ‘স্টেট অফ স্টেটস’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, রাষ্ট্রসঙ্ঘ নির্ধারিত সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে ২০২৪-এর ফলাফল অনুযায়ী, বিশ্বের ১৬৭টি দেশের মধ্যে ভারত রয়েছে ১০৯তম স্থানে। ১৬টি সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস বা এসডিজি’র ভিত্তিতে এই রিপোর্ট তৈরি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিক উন্নয়নের মাপকাঠিতে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভারত ডাহা ফেল করেছে। অর্থাৎ এই ৯’টি এসডিজি বা সূচকে বিশ্ব গড়ের তুলনায় ভারতের গড় কম।

Advertisement

রিপোর্টে আছে, ক্ষুধা বা অপুষ্টি দূরীকরণের ক্ষেত্রে ভারত সন্তোষজনক সাফল্য পায়নি। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ৩২.১ শতাংশের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ১৫ থেকে ৪৯ বছর পর্যন্ত বয়সি অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের ৫২.২ শতাংশ ভুগছেন রক্তাল্পতায়। লিঙ্গ সাম্যের প্রশ্নে দেশের ১২টি রাজ্য ও ২টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ১০০-র মধ্যে ৫০ নম্বরও পায়নি। শিল্প, পরিকাঠামো ও উদ্ভাবনে সামগ্রিকভাবে ব্যর্থ মোদির ভারত। শিল্পক্ষেত্রে ১৯.৬৬ শতাংশ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও হয়েছে ১১.৪২ শতাংশ। পরিষেবা ক্ষেত্রে ৫২.৯ শতাংশ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও হয়েছে ২৭.৭৫ শতাংশ। উৎপাদন সূচকেও ১০০-র মধ্যে ৩৬.৪ শতাংশ জুটেছে ভারতের। সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও ব্যর্থতা প্রকট। আবার শান্তি, সুবিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত মাপকাঠিতে বিশ্বের গড়ের তুলনায় পিছিয়ে ভারত। আর সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজ্যগুলির মধ্যেও আবার অসাম্য স্পষ্ট। যেমন দারিদ্র্য দূরীকরণে কর্ণাটকের থেকে গুজরাত এগিয়ে থাকলেও ক্ষুধা মুক্তির ক্ষেত্রে উল্টোটা দেখা গিয়েছে। এমন উদাহরণ আরও দেওয়া যায়। আসলে এটাই মোদির প্রকৃত ভারতের ছবি।
গোটা শরীর জুড়ে তাই দগদগে ঘা ঢাকতে বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার রঙিন গল্প শোনানো হচ্ছে। ঠিক যেমন এই জমানাতেই গরিব মেরে ধনকুবেরের সংখ্যা বাড়ছে বাতাসের গতিতে। মোদি সরকারের ‘সাফল্যে’ অন্যতম সেরা কীর্তিই বোধহয় দেশের ১৯১ জন বিলিওনেয়ারের হাতে ৮২ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ গচ্ছিত! সমীক্ষায় প্রকাশ, ১ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অর্থের মালিকের সংখ্যা ভারতে ২০২৪-এ ছিল ৮৫,৬৯৮। ২০২৩-এ ছিল ৮০,৬৮৬। ২০২৮-এ সংখ্যাটা ৯৪ হাজার ছুঁয়ে ফেলবে। গত বছর বিলিওনেয়ারের তালিকায় ২৬টি নতুন নাম ঢুকেছে। সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, ২০২৫-এ আমেরিকা ও চীনে ধনকুবেরদের সম্পদের পরিমাণ হবে যথাক্রমে ৫ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি ডলার এবং ১ লক্ষ ৩৪ হাজার কোটি ডলার। ভারতীয় ধনকুবেরদের সম্পদ ৯৫০ কোটি ডলার মূল্যের। যদিও সুস্থায়ী উন্নয়নে বিশ্বে ভারতের স্থান হয়েছে ১০৯তম অর্থাৎ পিছনের সারিতে। আর ধনকুবেরের সংখ্যা ও তাঁদের হাতে থাকা সম্পদের বিচারে বিশ্বে ভারতের স্থান তৃতীয়। সুস্থায়ী উন্নয়নে দেশের এমন করুণ ছবি ফুটে ওঠার পরও কি ভারতের প্রধানমন্ত্রী একটুও লজ্জা পাবেন? আয়নায় কি মুখ দেখবেন না!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ