Bartaman Logo
২১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

জতুগৃহ! আতঙ্কিত বোর্ডাররা, ঘুপচি ঘর, প্রাণ হাতে ব্যবসা-বসতি মির্জা গালিব স্ট্রিটে

মির্জা গালিব স্ট্রিট। পুরানো নাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। মঙ্গলবার রাতে এই রাস্তার ১৫ নম্বর বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সেই বিভীষিকা তাড়া করছে ওই হোটেলের বোর্ডারদের।

জতুগৃহ! আতঙ্কিত বোর্ডাররা, ঘুপচি ঘর, প্রাণ হাতে ব্যবসা-বসতি মির্জা গালিব স্ট্রিটে
  • ২১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: মির্জা গালিব স্ট্রিট। পুরানো নাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। মঙ্গলবার রাতে এই রাস্তার ১৫ নম্বর বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সেই বিভীষিকা তাড়া করছে ওই হোটেলের বোর্ডারদের। বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, গোটা বিল্ডিং সিল করা। রয়েছেন পুলিশকর্মীরা। এদিকে, অভিশপ্ত ওই বাড়ি দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন অনেকেই। কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা এসে খোঁজ নিচ্ছেন, আর মারা গেল কি না। অন্যান্য হোটেলে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকরাও আতঙ্কিত। তাঁরা যেখানে রয়েছেন, সেখানেও তো একই অবস্থা! হোটেল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার সঙ্গে ‘কম্প্রোমাইস’ করছে, অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। 

Advertisement

এই রাস্তাতেই পাশাপাশি রয়েছে রাজ্যের খাদ্যদপ্তর, দমকলের সদর কার্যালয় সহ একাধিক বিল্ডিং। শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই ধরনের বিল্ডিংয়ে কোথাও চলছে হোটেল, গেস্ট হাউস, দোকান। রয়েছে গুদাম, বিভিন্ন দোকানপাট, রেস্তরাঁ, পানশালা, স্পা সেন্টার। অভিযোগ, একের পর এক বহুতলে নিয়ম ভাঙার ছবি। কোথাও বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ, কোথাও নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই চলছে ব্যবসা। কোনো কোনো বিল্ডিংয়ে নেই একটিও ফায়ার এক্সটিংগুইশার! মঙ্গলবার গভীর রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই বিল্ডিংয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর কাটাছেঁড়া করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, গোটা অঞ্চলই যেন একটা জতুগৃহ! 
খাদ্যভবনের সামনে দিয়ে সোজা রাস্তা চলে গিয়েছে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত। সেই রাস্তার দু’ধারেই একাধিক বহুতল। একটির গায়ে একটি, ঘিঞ্জি। বেশিরভাগ বহুতলেই চলছে হোটেল, রেস্তরাঁ। একতলায় হরেক দোকান। জামাকাপড় থেকে শুরু করে শাড়ি কিংবা জুতো, এলাহি কালেকশন। একাধিক অফিস, ব্যাংকও রয়েছে এই রাস্তায়। এইসব বহুতলে অগ্নি নির্বাপণ বিধি মানা হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার রাতে অগ্নিকাণ্ডের জেরে ন’জন প্রাণ হারিয়েছেন। অভিযোগ, সেখানে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না। গত শতাব্দীর ছয়ের দশক থেকে চলা একাধিক হোটেল শুধু নয়, রাস্তার দু’পাড়েই রয়েছে ধর্মশালা থেকে শুরু করে একাধিক প্রাচীন বিল্ডিং। তার মধ্যে সিংহভাগ নির্মাণই বেআইনি, ফায়ার ফাইটিং সিস্টেমের বালাই নেই। সেখানেই ঘুপচি ঘরে চলছে বসবাস, ব্যবসা। মির্জা গালিব স্ট্রিট এবং সংলগ্ন অলিগলিতে একই ছবি।
এদিন সকালে অকুস্থলে গিয়ে দেখা গেল, ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে অভিশপ্ত বহুতলটি। ওই জায়গায় কাজে আসা অনেকেই ইতিউতি এসে ঘুরে দেখে যাচ্ছেন। ঘটনার পর ওই হোটেলের আবাসিকদের আশপাশের হোটেলে স্থানান্তর করা হয়েছে। কাছেই একটি হোটেলে গিয়ে দেখা গেল, সেখানকার ছবিও খুব একটা সন্তোষজনক নয়। দরজায় শাটার। রুমগুলি ছোটো, ১০০ থেকে ১৫০ বর্গফুটের। একটা খাট পড়লে ঘরে আর হাঁটাচলার জায়গা তেমন নেই। ঢাকা থেকে আসা শাহনাজ আখতার বলেন, একটা বড়ো ঘরকে পার্টিশন দিয়ে চার ভাগ করে চারটি রুম বানানো হয়েছে। এখানেই আমাদের থাকতে হয়। ঘরভাড়া ৮০০-১০০০ টাকা। কিন্তু আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? বিদেশে এসে এভাবে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল, এটা দুর্ভাগ্যজনক। প্রশাসনের এই বিষয়গুলি নজর দেওয়া উচিত।
এই অঞ্চলে রয়েছে কলকাতার একাধিক সাবেকি বাড়ি। অলিগলিতে বিল্ডিং নির্মাণের নিয়ম কিংবা দমকলের নিয়মের তোয়াক্কা না করেই একের পর এক অবৈধ নির্মাণ গড়ে উঠেছে। কোথাও আবাসিক ভবন পালটে গিয়েছে কমার্শিয়াল ব্যবহারে। জানেই না কলকাতা পুরসভা। ছোটো ছোটো পায়রার খোপের মতো ঘর বানিয়ে তৈরি হয়েছে দোকান, গুদাম। কোথাও আবার ছাদে টিন দিয়ে ঘিরে বানানো হয়েছে হোটেলের রুম। কোথাও কোনো অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা নেই। ফলে আগুন লাগলে কী হবে? ‘কপালে থাকলে বাঁচব, না হলে মরব, এটাই কাজের জায়গা। আর তো কোথাও যাওয়ার নেই।’ অকপটে বললেন কাপড়ের দোকানের কর্মচারী বিকাশ মিশ্র। 
এর আগেও মির্জা গালিব স্ট্রিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বড়বাজারে এমনই একটি হোটেলে আগুনের গ্রাসে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছিল ১৪ জনের। বারবার এমন ঘটনার পর সেফটি অডিট শুরু হয়। কিন্তু তা প্রশাসনিক উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ে বলে অভিযোগ। যার ফলস্বরূপ শহরের বুকে বারংবার ঘটে চলেছে এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। এবারের মৃত্যু মিছিলের পরেও কি পরিস্থিতি বদলাবে, উত্তর খুঁজছে নাগরিক সমাজ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ