


নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: থিম ছাড়া চমকের পরিসর বোধহয় তৈরি হয় না। অন্তত হুগলির নতুন জগদ্ধাত্রী নগরী রিষড়ার ভাবনা তেমনই। শতাধিক পুজোকে ঘিরে নবমীর সকালেই রিষড়ায় শুরু হয়েছিল উত্তেজনার প্রহর গোনা। দিনভরই আকাশ মেঘলা। সন্ধ্যা নেমেছে সময়ের আগে। তারপর আলোর মনোহর সাজে সেজে নিজেকে মেলে ধরেছে শহর। বর্ণময় আলোয় মাখা শহরে অভিনব থিম জুড়ে দিয়েছে বাড়তি মায়া। কোথাও পুতুল নাচের নব ইতিকথা, তো কোথাও মুদ্রণ শিল্পের একাল সেকাল, মধুবনী। ভাবনার উচ্চতার সঙ্গে তাল রেখেই বাস্তবের মাটিতে এসেছে সুচারু প্রয়োগ। তাতেই চেনা শহরে এসেছে অচেনা, অপরূপ ছাঁদ।
পুতুলে পুতুলে সেজে উঠেছে রিষড়ার নিউ বর্ণালী চক্রের মণ্ডপ। যেন এক আস্ত পুতুলঘর। সাবেক বাংলার শিল্প-কল্পনা অনুসরণে পুতুল থেকে মাটির পুতুল, কাঠের পুতুল, কী নেই। আছে মস্ত আকারের ফাইবারের গুচ্ছ পুতুলও। কিন্তু পুতুল ঘরই কি থিম? না, সেখানেই আছে চমক। এই ধরাধামে সকলেই জগদ্ধাত্রীর হাতের পুতুল। ভবিতব্যের হাতের পুতুলই কি শুধু? বাংলা সাহিত্যে ক্ষীরের পুতুলও তো আছে। এমনই হরেক পুতুলের ভাবনাকে একত্র করা হয়েছে মণ্ডপে। আছে অডিওভিস্যুয়াল মণ্ডপসজ্জাও। ক্ষীরের পুতুলের সৃষ্টি রহস্যকে তুলে ধরা হয়েছে ছোট্ট ছায়াছবিতে। যা মণ্ডপসজ্জায় জুড়েছে বাড়তি রং। মণ্ডপের সঙ্গে মানানসই দেবী প্রতিমা ও আলোকসজ্জাও থাকছে। তবে পুতুল কথা শেষ হচ্ছে না। পুজো উদ্যোক্তা অসিতাভ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, প্রতিদিনই পুতুল নাচের আসর থাকবে। থাকবে নানা কাহিনির বিন্যাস। অর্থাৎ পরতে পরতে চমকের উপাদানে সজ্জিত রিষড়ার ‘পুতুলঘর’।
কল্পনার মায়াজাল কাটিয়ে বাস্তবের মাটিতে নেমে আসার জন্য অপেক্ষা করবে কোরাসের পুজোমণ্ডপ। সেখানে মুদ্রণশিল্পের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎকে তুলে ধরা হয়েছে। প্যাপিরাস থেকে গুটেনবার্গ ও ছাপখানার আদল দেখা যাবে মণ্ডপসজ্জায়। থাকবে অক্ষর জন্মের ইতিহাস। মণ্ডপ সাজানো হয়েছে প্রাচীন হিয়েরোগ্লিফিকের আদল থেকে পাথরের খোদাই করা লিপি, এমনকী আস্ত ছাপা মেশিনে। থাকছে বর্তমান সময়ের ফ্লেক্স থেকে ডিজিটাল প্রিন্টের কাহিনিও। সুসজ্জিত দেবীপ্রতিমা আর মোহন আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে কোরাসের মণ্ডপ। পুজোর উদ্যোক্তা মানিকলাল বণিক বলেন, সভ্যতার জয়যাত্রার একটি সোপান যদি আগুন হয়, অন্যটি অক্ষরের ছাপানো চেহারা। আমাদের মণ্ডপে সেই বিবর্তনের কাহিনি মানুষ চাক্ষুস করবেন। আরেক শিল্পের ধারাকথন দেখা যাবে রবীন্দ্রসংঘ তেঁতুলতলায়। সেখানে ‘মধুঃসদন’ গড়া হয়েছে। মধুবনী শিল্পকে আধার করে বর্ণময় সাজে সেজেছে মণ্ডপ। দু’টি ভাগে বিভক্ত মণ্ডপে সাদা-কালো থেকে রঙিন মধুবনীর যাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। পুজোর উদ্যোক্তা মানস চক্রবর্তী বলেন, দেবীও মধুবনী আর্টের আদলে থাকছেন। আর থাকছে অনবদ্য আলোকসজ্জা। এভাবেই, মূর্ত থেকে বিমূর্ত, নানা ভাবনায় সেজে উঠেছে রিষড়ার সিংহভাগ পুজোমণ্ডপ।