হঠাৎই সিঁদুরে মেঘ এঁকে দিল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ‘মূল্যবৃদ্ধি নয়, ট্রাম্পের শুল্ক-যুদ্ধই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।’ এই মন্তব্য করেছেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা স্বয়ং। বুধবার নীতি নির্ধারণ কমিটির বৈঠকে ফের একদফা রেপো রেট হ্রাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। তাতে ব্যাঙ্কঋণ এবং সঞ্চয়—উভয় ক্ষেত্রেই সুদের হার কিছুটা কমবে। চাকরিজীবী ঋণগ্রহীতারা কিছুটা লাভবান হলেও অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণরা পড়বেন আতান্তরে। এই জাঁতাকল কি মূল্যবৃদ্ধির ফাঁস আলগা করতে পারবে? ঘুরে দাঁড়াবে কি দেশের অর্থনীতি? গভর্নর নিজেই জানিয়েছেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।’ যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়াই, গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের দাম এক ধাক্কায় সিলিন্ডার পিছু ৫০ টাকা বেড়ে গেল। চুপিসারে অনেকখানি বাড়িয়ে দেওয়া হল ৭৫০টি ওষুধের দাম, তার মধ্যে বেশিরভাগই জরুরি এবং কিছু রয়েছে জীবনদায়ী। এছাড়া চাল আটা ডাল তেল নুন মাছ মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বস্তুত অগ্নিমূল্য। সব মিলিয়ে মূল্যবৃদ্ধির আঁচে কমে গিয়েছে শহুরে মানুষের ক্রয় প্রবণতা। বলা বাহুল্য, নীতি নির্ধারণ কমিটির বৈঠকে এসবই স্বীকার করে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।
অথচ এরপরও আরবিআই গভর্নরের অদ্ভুত দাবি আমরা শুনলাম, ‘মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে’! রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নীতি নির্ধারণ কমিটি মনে করে, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নাকি একধাক্কায় কমে গিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে এসে গিয়েছে! দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে অবশ্য এই দাবির কোনওই সামঞ্জস্য পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। নিয়ামক ব্যাঙ্কের পূর্বাভাস, চলতি অর্থবর্ষে (২০২৫-২৬) মূল্যবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশ হতে চলেছে। তবে শেষমেশ এই পূর্বাভাস যে মিলবেই, এমন নিশ্চয়তা অবশ্য তারা দেয়নি। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সরকারিভাবে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম অনেকটাই কমেছে। পাশাপাশি যথেষ্ট বেড়েছে খাদ্যপণ্যের জোগান। তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দ্রব্যমূল্যের উপর, অর্থাৎ দামবৃদ্ধি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে যে অনিশ্চয়তা চলছে, তাতে মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান হার কতদিন বজায় রাখা সম্ভব হবে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নিজেই তা নিশ্চয় জানে না। আর তাই দাবির আড়ালে ‘ফাঁক’ রেখে নীতি নির্ধারণ কমিটি খোলসা করে দিয়েছে যে, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি অনিশ্চিত। একটা বিষয়ে যদিও কোনও সংশয় নেই—প্রাক্তন গভর্নর এবং বর্তমান গভর্নরের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নীতি নির্ধারণ কমিটির বৈঠকে ‘অগ্রাধিকার’ সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। এই ইস্যুতে শক্তিকান্ত দাসের সঙ্গে মোদি সরকারের রীতিমতো বাদানুবাদও হতো। কারণ তাঁর আমলে মূল্যবৃদ্ধিই ছিল আলোচনার প্রধান অগ্রাধিকার। তাঁর স্থলাভিষিক্ত সঞ্জয় মালহোত্রা মোদি সরকারের বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রকের ‘মনের মতো’ অবস্থান গ্রহণ করেছেন। নীতি নির্ধারণ কমিটির পূর্বতন একাধিক বৈঠকে দেখা গিয়েছে, মূল্যবৃদ্ধিকে মালহোত্রা তেমন একটা গুরুত্ব দিতে চান না। মোদি সরকারের মতোই, তাঁর কাছে শুল্ক-যুদ্ধই অধিক গুরুত্বপূর্ণ, মূল্যবৃদ্ধি নয়।
তবে মোদি সরকার স্বীকার না করলেও আরবিআই গভর্নর মেনে নিয়েছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের ধাক্কায় ভারতের রপ্তানি বাণিজ্য বিপুল পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকী, ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হারও কমতে চলেছে। অর্থাৎ জোড়া ধাক্কার জন্যই প্রস্তুত থাকতে হবে এখন দেশের অর্থনীতিকে। বুধবারের বৈঠকে আরও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, চলতি অর্থবর্ষের জিডিপি বৃদ্ধির হার হবে ৬.৫ শতাংশ। অথচ ফেব্রুয়ারি মাসে এটাই ছিল ৬.৭ শতাংশ। আমরা ভুলিনি, এবারের বৃদ্ধি নিয়ে গতবছর ভারতের অর্থমন্ত্রক এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক উভয়েই বিশেষ আশাবাদী ছিল। তাদের তরফে শোনানো হয়েছিল, ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির হারের কথা। তারই ভিত্তিতে মোদি সরকারের ‘জাদু’ নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন অর্থনীতির গেরুয়া পণ্ডিতরা। কিন্তু আলটিমেটলি দেখা যাচ্ছে, বৃদ্ধির কাহিনিটাও এক ‘জুমলা’! এখন সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি বৃদ্ধির দাবি তাঁদের কারও মুখেই শোনা যাচ্ছে না। অর্থনীতির অনিশ্চয়তা কতটা উদ্বেগে রেখেছে, তা পরিষ্কার হয় গভর্নরের পরামর্শে, ‘রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং সরকারকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। ভাবতে হবে কীভাবে আর্থিক বৃদ্ধির হার বাড়ানো যায়।’ কিন্তু গভর্নরের পরামর্শ উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর অধিক হয়ে ওঠা কঠিন। কেননা, এই মোদি সরকার কোনোভাবেই ‘সমন্বয়’ এবং ‘সহযোগিতা’র নীতিতে বিশ্বাসী নয়। দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এই সরকারের দুর্ভাগ্যজনক ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ এবং ‘ডাবল ইঞ্জিন’ বা ‘বিভাজন নীতি’র সামনে বিপন্ন বোধ করছে। এমন বিপন্নতার অবকাশ দেশকে অগ্রগতির কোন দিশা দেখাতে পারবে? এই সংগত প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।