সংবাদদাতা, বোলপুর: পাত্রীকে লুকিয়েই চলছিল তার বিয়ের দেখাশোনা। বুধবার পাত্রপক্ষ বাড়িতে হাজির হতেই অভিভাবকদের অভিসন্ধি টের পেয়ে একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। বাড়ি থেকে পালিয়ে হাজির হয় নিজের স্কুল বোলপুর শিক্ষানিকেতন আশ্রম বিদ্যালয়ে। হাঁপাতে হাঁপাতে প্রধান শিক্ষকের কাছে করুণ আর্জি জানায়, স্যার, দয়া করে আমার বিয়ে আটকান। আমি পড়তে চাই। কিছু করতে চাই। বাবা-মা জোর করে বিয়ে দিতে চাইছে। দশদিন পরই বিয়ে। কিছু করুন। এদিকে ছাত্রীর পিছু নিয়ে স্কুলে হাজির তার মা-বাবাও। প্রধান শিক্ষক বিয়ে পিছনোর অনুরোধ করলে রাগে অগ্নিশর্মা মা-বাবা বলেন, পারিবারিক বিষয়। নাক গলাবেন না। আমাদের মেয়ে আমরা বুঝব। এরপরেই মেয়েকে চড়-থাপ্পড় মারা শুরু করেন মা। বেগতিক দেখে প্রশাসনের দ্বারস্থ হন প্রধান শিক্ষক প্রশান্তকুমার দাস। এরপর প্রশাসন ও শান্তিনিকেতন থানা কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার বার্তা দিতেই সুর নরম হয় বাবা-মায়ের। বিয়ে বাতিল হতে আনন্দে কেঁদে ফেলে মেয়েটি। বীরভূম জেলায় বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম বন্ধ করতে মরিয়া প্রশাসন। জেলার প্রতিটি স্কুলে পদযাত্রা, পথনাটিকা ও সচেতনতা শিবির করে ছাত্র-ছাত্রী, তাদের অভিভাবক, ক্যাটারার, ডেকরেটর্স এমনকী পুরোহিত, মৌলবি, নাপিতকেও ধরে ধরে বোঝানো হচ্ছে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের খারাপ দিক। তারপরেও কিছু অসচেতন অভিভাবক এই কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। দিন কয়েক আগে জেলার অন্যান্য স্কুলের পাশাপাশি বোলপুর শিক্ষানিকেতন আশ্রম বিদ্যালয় বাল্যবিবাহ বিরোধী সচেতনতামূলক পদযাত্রা আয়োজন করেছিল। সেই মিছিলে ওই নাবালিকাও শামিল ছিল। বাল্যবিবাহ সমাজের বড় অভিশাপ, সেদিনই সে বুঝেছিল। কিন্তু বাড়িতে তার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল, তা সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। এদিন বাড়িতে পাত্রপক্ষ হাজির হতেই চোখে সর্ষেফুল দেখে সে। বিয়ে করব না বলে জেদ করতেই মা বাবার চোখ রাঙানি শুরু হয়। অগত্যা ছুট দেয় নিজের স্কুলে। প্রধান শিক্ষক প্রশান্তবাবুকে সব খুলে বলতেই তিনি শান্তিনিকেতন থানায় খবর দেন। পাশাপাশি, বোলপুর শ্রীনিকেতন ব্লক, কন্যাশ্রী দপ্তর, চাইল্ড হেল্প লাইনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত হন। প্রশাসনের আধিকারিকরা বাল্যবিবাহের খারাপ দিক বোঝানোর চেষ্টা করলেও ওই অভিভাবক কার্যত অনড় থাকেন। এরপর পুলিসের এক অফিসার কড়া হতেই সুর বদল করেন মা-বাবা। ১৮ বছর পরেই মেয়ের বিয়ে দেওয়া হবে এই অঙ্গীকার করলে, তাদের ছাড়া হয়। তাতেই স্বস্তি পায় ওই ছাত্রী। ঘটনা প্রসঙ্গে জেলাশাসক বিধান রায় বলেন, ওই নাবালিকা বাল্যবিবাহের খারাপ দিক উপলব্ধি করতে পেরেছে, এটা জেলা প্রশাসনের প্রচারেরই সুফল। আগামী দিনেও বাল্যবিবাহ দূরীকরণ ও শিশুশ্রম বন্ধের প্রচার লাগাতার চালানো হবে।



