Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আত্মসমর্পণের বার্তা?

চেনা ছক ভেঙে আরএসএসের সদর দপ্তর নাগপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গিয়েছেন শুনে অনেকেরই অনেক কথা মনে হতে পারে।

আত্মসমর্পণের বার্তা?
  • ১ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

চেনা ছক ভেঙে আরএসএসের সদর দপ্তর নাগপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গিয়েছেন শুনে অনেকেরই অনেক কথা মনে হতে পারে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে তাঁর নাগপুর যাত্রা, তাতে আত্মসমর্পণের লক্ষণ স্পষ্ট। এ কথা রাজনীতির কারবারি সকলেই জানেন, শতবর্ষে পা রাখতে চলা আরএসএস হিন্দুত্ববাদীদের মূল সংগঠন। আরএসএসের নীতি ও আদর্শ কার্যকর করতেই বিজেপি নামক রাজনৈতিক দলের জন্ম। সোজা কথায়, বিজেপি কোন পথে চলবে, দলের নেতৃত্বে কারা থাকবেন, বিজেপি চালিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী কারা হবেন— তা বহু ক্ষেত্রে নাগপুরের সবুজ সংকেতের পরই চূড়ান্ত হয়। এই নিয়মেই গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম দাবিদার মোদি ২০১২ সালে আরএসএসের সদর দপ্তরে গিয়েছিলেন। তাঁর নাম প্রধানমন্ত্রীর মুখ হিসেবে ঘোষণার পর ২০১৩ সালে আবার নাগপুরে যান তিনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বছরের পর বছর কেটে গেলেও সেখানে তাঁর পা পড়েনি। বলা ভালো, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এগারো বছর পর গত ৩০ মার্চ নাগপুরে পা পড়ল তাঁর। কেন? ২০১৪ এবং ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিজেপির বিপুল জয়ের পিছনে নরেন্দ্র মোদির ইমেজ ম্যাজিকের মতো কাজ করেছিল বলে মনে করা হয়। এই প্রচারের নিট ফল হল সর্বদা আত্মপ্রচারে অভ্যস্ত মোদিও নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে  ভাবতে শুরু করেন। ‘আমিত্ববোধ’ গ্রাস করে তাঁকে। ক্ষমতার আস্ফালন দেখাতে মোদি ঘনিষ্ঠ বিজেপি সভাপতি জয়প্রকাশ নাড্ডাকেও নাকি বলতে শোনা যায়, ভোটে জেতার জন্য এখন আর আরএসএস-কে দরকার নেই। বিজেপি একাই যথেষ্ট। মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়— প্রচারে মেতে ওঠে গেরুয়াবাহিনী।

Advertisement

নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবা, অন্যদের অবজ্ঞা, উপেক্ষার জবাব পেতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে দেখা যায়, দেশ থেকে ‘মোদি ম্যাজিক’ প্রায় উধাও। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে মাত্র ২৪০ আসনে থামতে হয়েছে প্রবল প্রভাবশালী মোদির দল বিজেপিকে। ওই নির্বাচনের প্রাক্কালে সঙ্ঘের কর্মীরা মোদির আত্মপ্রচারকে খুব একটা ভালোভাবে মেনে নেননি। তাই তাঁদের তরফে সেভাবে তৎপরতা দেখা না গেলেও বিজেপি’র হাল কী হয়েছে তা সহজেই বুঝে যান মোদি-শাহরা। বারবার সঙ্ঘের কড়া সমালোচনার মুখে পড়ে মোদি সরকার। তারপরই ‘আত্মসমর্পণের’ বার্তা যায় নাগপুরে। এবং এরপরই গত কয়েক মাসে দিল্লি, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ওড়িশার মতো রাজ্য বিধানসভার ভোটে আরএসএস তেড়েফুঁড়ে ওঠায় সহজ জয় আদায় করে নেয় বিজেপি। প্রমাণিত হয় আরএসএস ছাড়া বিজেপি অনেকাংশেই অচল। নাগপুর ছাতা না ধরলে ৫৬ ইঞ্চির ছাতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলা শক্ত। ক্ষমতার মোহে ডুবে থাকা নরেন্দ্র মোদি তাই হয়তো বৈরিতার পথ ছেড়ে আরএসএস বন্দনার পথ বেছে নিলেন এবার। সদর দপ্তরে গিয়ে গদগদ চিত্তে বলে এসেছেন, ‘আজকের ভারত সঙ্ঘের সাধনার ফল। আগামীর ভারতও হবে সঙ্ঘের তপস্যার ফল।’ অর্থাৎ সরসঙ্ঘ চালক মোহন ভাগবতের সামনে নরেন্দ্র মোদি বুঝিয়েছেন, তাঁর জমানায় দেশের যাবতীয় যা উন্নতি, তা সবই আরএসএসের সুশিক্ষার ফল। এতদিন যিনি যাবতীয় উন্নতি তাঁর ক্যারিশ্মায় হয়েছে বলে দাবি করতেন, যিনি নিজেকে ঈশ্বরের ‘বরপুত্র’ বলে ঘোষণা করেছেন, তিনিই এখন পূর্ণ কৃতিত্ব দিচ্ছেন সঙ্ঘকে! এর পিছনে রয়েছে অন্তর্নিহিত কারণ। বার্তা স্পষ্ট। বোঝাতে চাইছেন লাটাই রয়েছে আরএসএস-এরই হাতে।
প্রথমবার কুর্সিতে বসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রায় দশ বছর ধরে চরম ঔদ্ধত্য দেখালেও এখন ফের নাগপুর বন্দনার পিছনে মোদির যুদ্ধবিরতির বার্তা স্পষ্ট। কেন? তবে কি এটা তাঁর অবসর ঠেকানোর কৌশল? আরএসএসের কাছে তাঁর এমন নতজানু দৃশ্য তো গত এগারো বছরে দেখা যায়নি। আসলে আগামী সেপ্টেম্বরেই তাঁর ৭৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। অথচ ২০২৯-এ দেশের পরবর্তী লোকসভা নির্বাচন। প্রশ্নটা হল, তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের এই ইনিংসটা তিনি কি শেষ করতে পারবেন? ৭৫ বছরে অবসরের যে নিয়ম তিনি দল তথা সরকারে চালু করেছেন, তাহলে তাঁর ক্ষেত্রে কী হবে? তাঁর তৈরি নিয়মের গেরোয় ফেলে এল কে আদবানি, মুরলী  মনোহর যোশির মতো প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মার্গ দর্শকের ভূমিকায় পাঠানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তাঁর নিজের ক্ষেত্রে তাহলে কী হবে? এই অবস্থায় সঙ্ঘের আপত্তি চিত্রনাট্যের ক্লাইম্যাক্স বদলে দিতে পারে। নিয়মের জাঁতাকলে যাতে তাঁকে আটকে যেতে না হয় তার জন্য এখন সঙ্ঘই তো ভরসা। তাই হয়তো প্রবল ‘ক্ষমতাধর’ মোদিকে এবার  অবসর ঠেকাতে সেই সঙ্ঘের বন্দনায় মেতে তাদেরই মুখাপেক্ষী হতে হল! মোদির এই ‘অচেনা’ রূপ এখন চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু তিনি তো অনেক অর্থেই ‘ব্যতিক্রম’। হয়তো এও তাঁর একটি ব্যতিক্রমী রূপ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ