ইন্দ্রজিৎ কর্মকার ,কান্দি: বাস্তবে দু’টি ছেলের বাবা। অথচ, লজিকাল ডিসক্রিপেন্সিতে দেখানো হয়েছে ছ’টি ছেলে! ছেলেদের শুনানিতে ডাকাও হয়েছে নোটিস করে। আর তার জেরে ভাঙনের মুখে সাজানো সংসার। বাড়ি থেকে পালিয়েছেন স্ত্রী। তাতেই বেজায় চটেছেন প্রৌঢ়। বাড়িতে থাকা চারটি ছাগলের গলায় পোস্টার ঝুলিয়ে সোজা হাজির শুনানি কেন্দ্রে। পোস্টারে লেখা—‘আমার বাবার ছয় ছেলে। গতকাল ২ জন হিয়ারিং করে গিয়েছে। আজ আমাদের ৪ ভাইয়ের হিয়ারিং রয়েছে। বাবার সঙ্গে এসেছি।’ শনিবার বিকেলে এমন ঘটনায় তোলপাড় কান্দি ব্লকের হাটপাড়া গ্রাম। রাতেই হারু শেখের অভিনব প্রতিবাদের ভিডিও ভাইরালও হয়ে পড়ে।
গ্রামের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা হারু শেখের ছাগল ও পোল্ট্রি ফার্ম রয়েছে। লেখাপড়াও খুব একটা জানেন না। পরিবারে স্ত্রী ছাড়াও রয়েছে দুই ছেলে। বৃহস্পতিবার হারুর কাছে কমিশনের লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির নোটিস আসে। সেখানে তাঁর ছ’জন ছেলেকে দেখানো হয়েছে। প্রত্যেকের বাবার নামের বানানের অসঙ্গতি থাকায় যাবতীয় প্রমাণ সহ শুনানি কেন্দ্রে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হারু শেখকে হারা শেখ দেখানো হয়েছে বলে দাবি।
শুক্রবার হারু শেখের দুই ছেলে মনিরুল শেখ ও জাহিরুল শেখ শুনানি কেন্দ্রে গিয়ে যাবতীয় নথি জমা করেছেন। পরদিন অর্থাৎ শনিবার সকালে সংশ্লিষ্ট বিএলও হারু শেখকে বাকি চার ছেলের নথি জমা করার কথা বলেন। তা নিয়েই সংসারে অশান্তির সূত্রপাত। স্বামীর বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তুলে কার্যত সংসার ছাড়ার সংকল্প নেন। বিপাকে পড়েন হারু শেখ। তিনি এদিন হতাশার সুরে বলছিলেন, ‘এসব কী যে হচ্ছে বুঝতে পারছি না! নোটিস আসার পর থেকেই স্ত্রী’র গোমরা মুখ। সে মনে করছে, আমি অন্য কোথাও বিয়ে করে সন্তানের খবর গোপন রেখেছি। আমার ছেলেরাও বিভ্রান্ত। সংসারে তুমুল অশান্তি বাধে। দুপুরের দিকে স্ত্রী অভিমানে বাড়ি চলেও যায়। এরপর আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। প্রতিবাদ জানাতে আমি চারটি ছাগলের গলায় পোস্টার ঝুলিয়ে শুনানিতে হাজির হই।’
হাটপাড়া বুথের শুনানি চলছিল নবগ্রামের মহালন্দি ২ পঞ্চায়েত ভবন সংলগ্ন এলাকায়। সেখানে স্থানীয়রা দেখতে পান, হারু শেখ চারটি বড় ছাগলের গলায় পোস্টার ঝুলিয়ে শুনানিতে আসছেন। কৌতূহলী বাসিন্দারা ছবি ও ভিডিও তুলতে শুরু করে দেন। অনেকেই ঝেঁকে ধরেন প্রৌঢ়কে। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘এই নির্বাচন কমিশন অশিক্ষিত, মুর্খ মানুষ। ওদের ভুলেই ভোগান্তি বাড়ছে। সংসারে অশান্তিও বাধিয়ে দিচ্ছে। আমি চাই, নির্বাচন কমিশনারকে হটিয়ে আমার একটি ছাগলকে ওই পদে বসানো হোক। এর থেকে লজ্জার আর কিছু থাকতে পারে না।’
এরপর তিনি চারজন বালকের হাতে ছাগল চারটির দড়ি ধরিয়ে দিয়ে শুনানিতে হাজির হন। সেখানে সংশ্লিষ্ট বিএলওকে বলেন, ‘আমার বাকি চার ছেলেকে নিয়ে এসেছি। ওদের হিয়ারিং করুন।’ এই কথা শুনে বিএলও সামান্য হেসেও ফেলেন। এরপর নোটিসটি জমা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আপাতত স্বস্তি হারু শেখের। জোড়া লেগেছে সংসারেও। স্ত্রী আরমিনা বিবি বলেন, ‘স্বামীর প্রতি আমার কোনও ক্ষোভ বা অভিমান নেই। কমিশনের উপর রাগ দেখিয়েই বাড়ি ছেড়েছিলাম। প্রৌঢ়ের ছেলে মনিরুল শেখ বলেন, ‘এখন আর বাড়িতে কোন গণ্ডগোল নেই। সব কিছু স্বাভাবিক।’ চারটি ছাগলের গলায় পোস্টার ঝুলিয়ে শুনানিকেন্দ্রে।’-নিজস্ব চিত্র