


ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: ঘটনাস্থল কলকাতার টালা চত্বর। গতবছর কালীপুজোর রাতে একা মা’কে বাড়িতে রেখে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলেন মেয়ে-জামাই। মা ঘুমোচ্ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন যে, মা ঘুম থেকে ওঠার আগেই ফিরে আসবেন। পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে দেখলেন রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘরের মেঝে। ৭৩ বছরের বৃদ্ধাকে মেরে মাথা ফাটিয়ে গয়না লুট করে পালিয়েছে দুষ্কৃতীরা।
ঘটনাস্থল মুকুন্দপুর। বদ্ধ দু’কামরার ফ্ল্যাটে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার ষাটোর্ধ্ব দম্পতির দেহ। অভিযোগ ওঠে তাঁদের খুন করা হয়েছে। ছেলে-বউয়ের সঙ্গে থাকলেও তাঁদের প্রায়ই বিবাদ বাঁধত। শেষমেশ বৃদ্ধ দম্পতি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, না খুন, তা নিয়ে তদন্ত হয়েছে।
ঘটনাস্থল নেতাজিনগর। বাড়িতে একাই থাকতেন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ। তিনদিন আগে তাঁকে পড়শিরা শেষবারের মতো দেখেছিলেন। তারপর একদিন সকালে ঘরের ভিতর সিঁড়ির উপর থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার।
তিনটি ঘটনাই কলকাতার। তবে এই ধরনের অজস্র খবর প্রতিদিনই আমরা সংবাদপত্রে দেখতে পাই। কলকাতা হোক বা দেশের যেকোনো প্রান্ত। একাকী প্রবীণদের করুণ পরিণতির খবর প্রায়শই আমাদের চোখে পড়ে। কখনো সন্তানের সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে একাকিত্ব তো কখনো সন্তানরা চাকরিসূত্রে ভিন রাজ্যে বা ভিন দেশে থাকার কারণে একাকিত্ব। দেশের হাজার হাজার বৃদ্ধ মানুষজনের শেষের দিনগুলি অনেকাংশেরই নিঃসঙ্গ অবস্থায় কাটছে। আর একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে অসুস্থতার জন্য মৃত্যু বা একাকিত্ব কাটাতে আত্মহত্যা।
জীবন প্রবহমান নদীর মতো এগিয়ে চলেছে। আর এই আধুনিকতার স্রোতেই এঁকেবেঁকে চলেছে নিঃসঙ্গতার ঘূর্ণাবর্ত। তবে সব ক্ষেত্রেই যে একাকিত্বর করুণ পরিণতিই আমরা দেখছি তা নয়। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কানেকটেড রেখেছে। কিছুটা সময় সেই ভার্চুয়াল ফ্রেন্ডদের সঙ্গে কথা বলে বা তাঁদের নিত্যদিনের কর্মসূচি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে আমরা একাকিত্ব কাটানোর চেষ্টা করি। তবে এটাও ঠিক যে, সেইসব সোশ্যাল মিডিয়ার বন্ধুদেরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার সময় নেই। তাঁরা ছবি পোস্ট করেই খালাস। বাকি লাইক, কমেন্টের জন্য তো ভার্চুয়াল ফ্রেন্ডরা রয়েছে। নিঃসঙ্গতা কাটাতে সেই মুঠোফোন ধরেই আমরা সারাদিন বসে থাকি। অবশ্য এতদিনে মানুষ এটা বুঝেছে ‘ফ্রেন্ড লিস্ট হাজার ছাড়ালেও অসুস্থ হলে ফোন করার মতো একজনও থাকবে না।’
আমরা প্রতিনিয়ত বলি, ‘সময় নেই, ‘বেশি কাজ, ‘নিজের মতো থাকতে চাই’ — কিন্তু সেই ‘নিজের মতো থাকা-ই ধীরে ধীরে ‘নিজের মধ্যেই আটকে যাওয়া’য় পরিণত হচ্ছে। একাকিত্বর সংজ্ঞা তাই প্রবীণদের কাছে একরকম আর তরুণ প্রজন্মের কাছে আলাদা।
সারাদিন কর্মব্যস্ত জীবনে যান্ত্রিক শহর, স্ক্রিনভিত্তিক জীবন আর পুঁজিবাদী দৌড়ে আমরা ক্রমশই একা হয়ে পড়ছি। সেই একাকিত্ব ভরাট করতে আমরা খুঁজি সঙ্গ। অবশ্য তার ভিত্তি কিন্তু বাস্তব নয়। বলা যেতে পারে বাজারজাত সঙ্গ। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যেন নিঃসঙ্গতাও আধুনিক হয়েছে। নিউক্লিয়ার পরিবার, কর্মব্যস্ততা, নগরায়ণ এবং স্বনির্ভরতার নামে যে সমাজ আমরা গড়ে তুলেছি, তা আসলে মানুষের চারপাশ থেকে মানুষকেই যেন সরিয়ে দিয়েছে। যে বৃদ্ধ দম্পতিরা সন্তানের সান্নিধ্য না পেয়ে একাকীই জীবনের মায়া কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন, তাঁদের সন্তানরাও যে সবাইকে কাছে পেয়ে সমৃদ্ধ রয়েছেন, এমন নয়। পাশাপাশি বসে থাকলেও আজ আধা ঘণ্টার বেশি হয়তো আমরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলি না। লাঞ্চ-ডিনারের সময় খাবার টেবিলে একসঙ্গে কিছুক্ষণ থাকার পর খাওয়া শেষ করেই উঠে যাই মোবাইল ঘাঁটার জন্য। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা বা ভাই-বোন। সম্পর্কের বন্ধনে আমরা আবদ্ধ থাকলেও একে অপরকে সময় দেওয়ার সময় আমাদের হাতে নেই। কারণ হাতে ধরে রয়েছি মোবাইল। তার মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে দিতে আমরা শশব্যস্ত।
সে কারণেই এখন সব বয়সের মানুষের সেই নিঃসঙ্গতা কাটাতে তৈরি হয়েছে বাজার। যার একমাত্র পুঁজি মানুষের একাকিত্ব। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, উন্নত দেশগুলিতে নিঃসঙ্গতার হার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ব্রিটেন ও জাপানের মতো দেশে নিঃসঙ্গতা এত বড়ো সামাজিক সমস্যা হয়ে উঠেছে যে, তা মোকাবিলায় সরকারিভাবে তৈরি হয়েছে কাউন্সেলিং সেন্টার। তার ভার রয়েছে সরকারেরই তাবড় নেতাদের উপর। এঁদের কাজ হল সমাজকে আবার সঠিক সংযোগের রাস্তায় টেনে আনা। তবে সবটাই উন্নয়নের বহিঃপ্রকাশ। আমরা যতই সভ্য হয়েছি, তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারে আরও পারদর্শী হয়ে উঠেছি, ততই আমরা রক্ত-মাংসের সম্পর্ক আর তার প্রথামাফিক সামাজিক নিয়ম থেকে দূরে সরে গিয়েছি। যে দেশ যত সভ্য সেখানকার মানুষের একাকিত্বও তত বেশি। সমীক্ষা বলছে, ব্রিটেনে প্রতি আটজন নাগরিকের একজনের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই। আবার জাপানে তরুণদের মধ্যে ‘হিকিকোমোরি’ নামে এক মানসিক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের বহু মানুষ বছরের পর বছর ঘরে বন্দি থাকছেন কোনোরকম সামাজিক সংযোগ না রেখেই। আধুনিক সমাজে বেড়ে ওঠা এক ধরনের অদ্ভুত মানসিক প্রতিক্রিয়া। যেখানে প্রযুক্তি, প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ভারে মানুষ নিজেকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আর সেটাও একেবারে অল্প বয়সেই। জাপানের পাশাপাশি বিশ্বের নানা দেশে শহরকেন্দ্রিক সভ্যতার মাঝে দেখা দিচ্ছে এই হিকিকোমারি। সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, জাপানে আত্মহত্যার পিছনে অন্যতম বড়ো কারণ এই নিঃসঙ্গতা। অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত একাকিত্বে ভোগেন।
এই নিঃসঙ্গতা আর একাকিত্বকেই পুঁজি করে আখের গোছাতে নেমেছে ভার্চুয়াল মার্কেট। সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুত্ব পাতানো এখন পুরানো। নিঃসঙ্গতা কাটাতে এখন আমরা খুঁজে বেড়াই অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর সঙ্গী। যা সহজেই মিলছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে। জাপানে তো ‘ফ্যামিলি রোমান্স’ নামে এক সংস্থাই রয়েছে, যেখানে আপনি চাইলে ঘণ্টা বা দিন হিসেবে গোটা পরিবার ভাড়া করতে পারেন। এই ভাড়াটে মানুষগুলো আপনার জীবনের গল্প মুখস্থ করে নেয়, আপনার সামনে নিখুঁত অভিনয় করে যায়। যেন তারা সত্যিকারের মা, স্ত্রী, স্বামী। একই চিত্র নিউ ইয়র্কের ‘রেন্ট এ ফ্রেন্ড’ বা ফ্লোরিডার ‘পাপা’ অ্যাপে। এরাও আপনাকে ঘণ্টা হিসেবে বন্ধু বা সঙ্গী ভাড়া দেয়। ঠিক যেমন বন্ধু, প্রেমিকা বা স্ত্রীর সঙ্গে সাধারণ সময় আপনি কাটান। এই ভাড়া করা সঙ্গীও আপনার সঙ্গে গল্প করে, বেড়াতে বেরিয়ে, সিনেমা দেখে একাকিত্বকে দূর করে। আমেরিকায় তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের নিঃসঙ্গতা কাটাতেও রয়েছে দরাজ ব্যবস্থা। ‘রেন্ট এ গ্রান্ডকিড’ অ্যাপের মাধ্যমে টাকা দিয়ে নাতি-নাতনিও ভাড়া পাওয়া যায়। ভেবে দেখুন। সভ্যতা আমাদের কোন সমাজে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে। একসময় ছিল একান্নবর্তী পরিবার। যেখানে বাবা-মা, দাদা-ভাই সবাই মিলে একসঙ্গে থাকত। তাদের রান্নাও হবে এক হাঁড়িতে। খাওয়া-দাওয়াও একসঙ্গে। সেটা ভেঙে হল নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। মানে যেখানে দুই ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গেলে তাঁরা আলাদা হয়ে যাবে। একে-অপরের পারিবারিক নিয়মে কোনো হস্তক্ষেপ নেই। অবশ্য বর্তমান যুগে দাদুর পুরানো বাড়িতে থাকার রেওয়াজ প্রায় নেই বললেই চলে। পুরানো বাড়ি ভেঙে হয়েছে নতুন বাড়ি। তারপর আবার সেই বাড়ির সন্তান গিয়ে কিনছে আলাদা ফ্ল্যাট। এই জায়গা থেকেই হয়তো একাকিত্বের সংজ্ঞা শুরু। দাদু-ঠাকুমা নিঃসঙ্গ হচ্ছেন। নিঃসঙ্গ হচ্ছেন বাবা-মা। আর যে নবপ্রজন্ম নতুন ফ্ল্যাট কিনে আলাদা সংসার পাতলেন, তাঁরাও আধুনিকতার কোপে আদতে একাই হচ্ছেন। কারণ স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করেন। দিনের শেষে ঘরে ফিরে খাবার টেবিলে হয়তো বসলেন। তবে একে অপরের সঙ্গে কথা বলার থেকে মন পড়ে থাকে কখন খাবার শেষ করে একটু নিভৃতে ওয়েব সিরিজের পরের এপিসোডটা দেখব। জেগে আছি, রাত দেড়টা দু’টো পর্যন্ত। কিন্তু জেগে জেগে স্ত্রী বা স্বামীর সঙ্গে কথা বলছি না। দেখছি ওয়েব সিরিজ। একে অপরের পাশে বসেও চাইছি নিভৃতযাপন। গভীর সামাজিক শূন্যতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেখানে এই নিঃসঙ্গতাকেই পণ্য করেছে ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড। বা হয়তো এই ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডই আমাদের আরও বেশি করে একা হতে বলছে, যাতে তাদের আখেরটা ঠিকঠাক থাকে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডলার খরচ হচ্ছে সঙ্গ, ভালোবাসা, বন্ধুত্বের অনুকরণ কিনতে। আবার কোথাও জোর করে একাকী হয়ে আমরা চাইছি মোবাইলে নিজের আনন্দ খুঁজে বেড়াতে। তাই একাকিত্বের সংজ্ঞা এখন এক একজনের কাছে এক একরকম। কেউ কাউকে কাছে না পেয়ে একা, তো কেউ কেউ পাশাপাশি বসে থেকেও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে একা।
তবে শুরুটা হয়েছিল প্রবীণদের একাকিত্ব নিয়ে। কৃত্রিম সম্পর্ক অনেক প্রবীণ ও নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে এক ধরনের আশ্রয় হয়ে উঠছে। যারা পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্ন, তাদের জন্য এইসব পরিষেবা যেন সমাজের নির্মম অবহেলার এক অন্তর্বর্তী সমাধান। তবে এর সঙ্গেই আরও এক নয়া চক্র গজিয়ে উঠেছে। ডিজিটাল অ্যারেস্ট। এক অনলাইন জালিয়াতি। নিঃসঙ্গতার সুযোগে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ব্যক্তিগত তথ্য জেনে নিয়ে অভিনব কায়দায় চলছে ব্ল্যাকমেল। এই প্রতারণার জালে জড়ানোর পিছনেও রয়েছে একাকিত্বের সঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়া মোবাইল ফোন। যার মাধ্যমেই আমাদের সব নথি চলে যাচ্ছে জালিয়াতদের হাতে। এই ডিজিটাল অ্যারেস্টের ফাঁদে পড়ে এক কোটি টাকা খোয়ালেন হাওড়ার জগাছার এক বৃদ্ধা। এখন প্রশ্ন হল, আমরা কি এমনই এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি। যেখানে অসুস্থ হলে দেখতে আসার বদলে ফোনে একটি মেসেজ আসবে, ‘এখন কেমন আছো?’ এই যন্ত্র সভ্যতার হাত ধরে, উন্নয়নের রথে চেপে আমরা কি এমন পথে পাড়ি দিয়েছি, যেখানে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনগুলি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। একটু ভেবে দেখুন। আত্মকেন্দ্রিকতা, প্রতিযোগিতা, অর্থ আর পদমর্যাদার মোহে আমরা চারপাশের মানুষদের হারিয়ে ফেলেছি। কারো সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে ভাবছি, একে একথা বলা কি ঠিক হবে? বন্ধু, আত্মীয় বা সহকর্মী — এঁদের সঙ্গে নিজেদের জীবনের বিভিন্ন সমস্যা বা সম্ভাবনার কথা আলোচনা করতে হয়তো বাধা থাকতে পারে। তবে নিজের সন্তানের সঙ্গেও আমরা এখন ভেবে-চিন্তে কথা বলি। এমনকি স্ত্রী বা স্বামীর ক্ষেত্রেও মেপে কথা বলা এখন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যস্ত জীবনে সঙ্গ পাওয়াই তো কঠিন। আর সঙ্গীর একাত্মতা না থাকলে বাড়ে সন্দেহ। সেই থেকেই আপনজনকে আর পাঁচজন গড়পরতা বন্ধুদের মতোই মনে হচ্ছে। ভাবুন তো একাকিত্বের নাগপাশে আমরা এমনভাবে বাঁধা পড়েছি, যে উন্নয়নের স্রোতে গা ভাসাতে গিয়ে আপনজনকেই পর করে দিয়েছি। এর জেরেই আরও একা হয়ে পড়ছি। তারই সুযোগ নিচ্ছে ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড।