রাজ্যে ভোটের দামামা বেজে গেল। ‘খেলা’ শুরু। আর ভোট এলেই রাজনৈতিক দলগুলির অন্যতম ‘টার্গেট’ হয়ে ওঠে শিক্ষিত বেকার যুব সমাজ। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হবে এপ্রিলে। ভোটের দিন ঘোষণাও হয়ে গিয়েছে। দু’ দফায় নির্বাচন। স্বভাবতই এবার রাজ্যের দখল নিতে মরিয়া বিজেপি। কিন্তু সোজা পথে সেই কাজ যে প্রায় অসম্ভব, তা বুঝেই ইতিমধ্যে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিতে শুরু করেছে বিজেপি নেতৃত্ব। এই লেখার আগে পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপির ‘সংকল্পপত্র’ (ইস্তাহার) ঘোষিত হয়নি। কিন্তু দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অমিত শাহ রাজ্যে এসে প্রতিশ্রুতি বিতরণের কাজটা শুরু করে দিয়েছেন অনেক আগেই। গত কয়েক বছরে এ রাজ্যে সরকারি চাকরি, বিশেষত শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রাজ্য সরকারের তরফে সেই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজ্যের শাসক দলকে এই নিয়োগের ইস্যুতে কোণঠাসা করে বেকারদের স্বপ্ন দেখাতে সরকারি চাকরিকেই পাখির চোখ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। চলতি মাসের প্রথম দিকে রাজ্যে প্রচারে এসে শাহ প্রতিশ্রুতি দেন, বাংলায় বিজেপি সরকার এলে ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারি কর্মচারীরা সপ্তম বেতন কমিশন পাবেন। তাঁর দ্বিতীয় ঘোষণা ছিল, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সব শূন্য সরকারি পদে নিয়োগ হবে। সরকারি পদ তথা চাকরির সংখ্যাও বাড়ানো হবে। ফিরিয়ে আনা হবে অবলুপ্ত পদ। পাশাপাশি, চাকরি পাওয়ার বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
আদৌ রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বিজেপি সরকার শাহের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণ করবে কি না— তা তো ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু এই কর্মসংস্থান বা সরকারি শূন্যপদ পূরণ নিয়ে মোদি সরকারের যা পারফরম্যান্স, তার হিসেব দিতে বসলে বিজেপি নেতাদের মুখ দেখানো দায় হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমতায় এসে বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই হিসাবে গত এগারো বছরে দেশে ২২ কোটি বেকার যুবক-যুবতীর চাকরি হওয়ার কথা। কিন্তু গত বছরের শেষের দিকে সংসদে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের মন্ত্রীই জানিয়েছেন, এগারো বছরে সরকারি চাকরি হয়েছে মোট ২২ লক্ষের। এর মধ্যে ১০ লক্ষ নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে ‘মেলা’ থেকে। যদিও বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া প্রকৃত তথ্য অনুযায়ী, চাকরি হয়েছে ১২ লক্ষের।
ছবিটা একইরকম ভয়াল শূন্যপদের ক্ষেত্রেও। সরকারি তথ্য বলছে, কেন্দ্রের সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও দপ্তরে মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৪০ লক্ষের কিছু বেশি। এর মধ্যে নিয়োগ হয়নি বা শূন্যপদের সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ। এই সংখ্যা ২০২৩ সাল পর্যন্ত। তারপরের তিন বছরে শূন্যপদের সংখ্যা আরও খানিক বেড়েছে বলেই অনুমান। সবচেয়ে বেশি শূন্যপদ রয়েছে রেলে, ৩ লক্ষের বেশি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যেখানে যাত্রীদের নিরাপত্তা জড়িত সেখানে ট্রেন চালকের অভাবের কথা সংসদে স্বীকারও করেছেন খোদ রেলমন্ত্রী। বাস্তব পরিস্থিতি হল, ট্রেন চালকদের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপে প্রায়শই। একজন ট্রেন চালককে ১১ ঘণ্টার বেশি ডিউটি দেওয়াই যায় না। রেল আইনেই তা স্পষ্ট। শূন্যপদের কারণে তাই প্রশ্ন উঠছে, আইন তো রয়েছে, কিন্তু তার পালন ঠিকমতো হচ্ছে কি? অন্যদিকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে শূন্যপদ প্রায় আড়াই লক্ষ। যে অমিত শাহ বাংলায় এসে এ রাজ্যের সরকারি দপ্তরে শূন্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁর নিজের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে শূন্যপদের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার! তথ্য বলছে, মোদি জমানার শুরুতে ২০১৪-১৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারে শূন্যপদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লক্ষ ২২ হাজার (১১.৫৭ শতাংশ)। ২০২২-২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৯ লক্ষ ৮০ হাজার (২৪.১১ শতাংশ)। অর্থাৎ, এগারো বছরে শূন্যপদের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এর থেকে যা দাঁড়ায় তা হল, বর্তমানে কেন্দ্রে প্রতি চার জন কর্মী পিছু একটি পদ খালি। এই তথ্য বলে দেয়, দেশজুড়ে তীব্র বেকার সংকট থাকলেও কেন্দ্রের চাকরি দেওয়ার সদিচ্ছা নেই। নতুন নিয়োগ দূর অস্ত, শূন্যপদের সংখ্যাই ১০ লক্ষ ছুঁয়েছে! সুতরাং ন্যূনতম লজ্জা, সংকোচ, আত্মসম্মানবোধ থাকলে বিজেপি শিবির কাজ, শূন্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে একবার অন্তত আয়নায় নিজেদের মুখ দেখবেন— এই আশা করাই যায়। কারণ কেন্দ্রীয় সরকারে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা দেখার পর এ রাজ্যে এসে প্রতিশ্রুতির কথা শুনলে বলতেই হয়, ফাঁকা কলসির আওয়াজ বেশি।