সৌম্যজিৎ সাহা, গঙ্গাসাগর: যে রাঁধে সে চুল বাঁধে। যে চুল বাঁধে সে চুল কাটেও। মৌমিতা মান্নাকে দেখলে এই প্রবাদের কথাই প্রথমে মনে পড়ছে সবার। এই মহিলা গঙ্গাসাগরে এখন বেশ ফেমাস। পুণ্যার্থীরা বলছেন, ‘উনকা হাত নরম হ্যায়। একদম দর্দ লাগে না। উনসেহি মুণ্ডন করানা হ্যায়।’
তাঁর স্বামীও ক্ষৌরকার। মৌমিতা মান্নাও পেশায় নাপিত। স্ত্রীর দৌলতে স্বামীর ব্যবসা মাছি তাড়াচ্ছে। ভিড় হচ্ছে মৌমিতাদেবীকে ঘিরেই। তার ফাঁক গলে উঁকি দিলে নজরে আসবে, এক হাতে ক্ষুর, অন্য হাতে জলের পাত্র। সামনে বসে কেউ না কেউ। মৌমিতা মাথায় জল ঢালছেন। তারপর নিপুণ হাতে এক টানে মাথার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত চালিয়ে দিচ্ছেন ক্ষুর। লহমায় লোকটির মাথা সাফ। হাত নরম বলে ব্যথা লাগে না। গঙ্গাসাগরের চার নম্বর বিচ। ছোট মাঝারি দলে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তীর্থযাত্রীদের ভিড়। একটি আলোর টাওয়ারের নীচে জটলা। সেখানেই দাঁড়িয়ে সাগরের মহিলা নাপিত মৌমিতা। তিনি সাগরেরই বামনখালির বাসিন্দা। ২২ বছর হয়ে গেল চুল দাড়ি কেটে দিচ্ছেন মানুষের। এখন মেলা হচ্ছে বলে বিচের এক ধারে বসেছেন সাজ সরঞ্জাম নিয়ে। তিনি বলেন, ‘স্বামীর কাছেই কাজ শিখেছি। বাড়তি রোজগারের জন্যই এই কাজে নামা। পেশা কখনও ছোট বা বড়ো হয় না। চুল দাড়ি শুধু পুরুষরাই কাটতে পারে সেই ভাবনা ভুল। মহিলারাও চাইলে করতে পারেন।’ স্ত্রীকে সমর্থন দেন স্বামী ভাস্কর মান্না। তিনি হেসে বলেন, ‘মেলায় মাথা কামাতে এসে ওরই দেখছি প্রশংসা করছেন সবাই।’
অনেক প্রবীণ মানুষ বলেন, একসময় পাড়ায় পাড়ায় ‘আলতা মাসি’দের দেখা যেত। ক্ষুর, নরুন, আলতার শিশি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরতেন। মহিলাদের নখ কেটে দিতেন। পায়ে আলতা পরিয়ে দিতেন। তাঁরা মূলত নাপিত গোষ্ঠীরই। কিন্তু তাঁরা কখনও মাথা মুড়োতেন না। তাই মহিলা নাপিত পেশা প্রাচীন হলেও মস্তক মুণ্ডনের কাজ তাঁরা করতেন না কখনও। সেই ট্রেন্ড ভাঙতে দেখা যাচ্ছে।
মৌমিতাদেবী সে কাজটিই করছেন। বিহার, উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা তীর্থযাত্রীরা সাগরে মহিলা নাপিতকে দেখে তাজ্জব। তাঁরা বলছেন, আমাদের ওখানে নিম্ন বা মধ্যবিত্ত বাড়ির বউদের ঘরের কাজেই বেধে রাখা হয়। এখানে তো দেখছি পুরুষদের চুল কাটছেন একজন গৃহবধূ। আগে কখনও এমন দেখিনি। প্রথা ভেঙে নজির গড়েছেন মৌমিতা ম্যাডাম। নিজস্ব চিত্র