Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের একটি মামলা

একটি বদ্ধমূল ধারণা আছে যে, জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানকারী সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ‘বাতিল’ করার ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপের প্রতি সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন রয়েছে।

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের একটি মামলা
  • ২৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: একটি বদ্ধমূল ধারণা আছে যে, জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানকারী সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ‘বাতিল’ করার ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপের প্রতি সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন রয়েছে। সরকার দাবি করেছে যে, ৩৭০ অনুচ্ছেদ ‘বাতিল’-এর সিদ্ধান্তকে আদালত বৈধতা দিয়েছে। এমনকী, কিছু পণ্ডিত ব্যক্তিও সরকারের এই দাবি মেনে নিয়েছেন বলে মনে হয়। এই ধারণা ‘ভুল’, যেমনটি আমি একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছিলাম (‘এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে’, বর্তমান, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৩)। ‘বাতিল’ ইস্যুতে প্রকৃতপক্ষে সুপ্রিম কোর্ট উল্টো রায়ই দিয়েছে।
বাতিল অবৈধ, কিন্তু ...
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সরকার তিনটি পদক্ষেপ করেছিল:
সংবিধানের ইন্টারপ্রিটেশন ক্লজে (অনুচ্ছেদ ৩৬৭) ক্লজ (৪) যোগ করার জন্য ৩৭০(১) অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করেছিল;
বর্ধিত ব্যাখ্যামূলক ক্লজ বা ধারা ব্যবহার করেছিল ৩৭০(৩) অনুচ্ছেদের শর্তাবলি ‘সংশোধন’ করার উদ্দেশ্যে;
‘সংশোধিত’ অনুচ্ছেদ ৩৭০(৩) এবং তার শর্তাবলি ব্যবহার করেছিল ৩৭০ অনুচ্ছেদকেই ‘বাতিল’ করার উদ্দেশ্যে।
সুপ্রিম কোর্ট তিনটি পদক্ষেপকেই অগ্রহণযোগ্য এবং অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে।
তা সত্ত্বেও, সুপ্রিম কোর্ট যুক্তি দিয়েছে যে সংবিধানের সমস্ত বিধান জম্মু ও কাশ্মীরে প্রয়োগ করে ৩৭০(১) অনুচ্ছেদের অধীনে ক্ষমতা প্রয়োগ বৈধ এবং এর প্রভাব ৩৭০ অনুচ্ছেদ ‘বাতিল’ করার মতোই।
আইনি অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্টতা থাকা দরকার: অনুচ্ছেদ ৩৭০-এর তথাকথিত বাতিলকরণ সম্পন্ন হয়েছিল অতিশয় চালাকিপূর্ণ এক পদক্ষেপের মাধ্যমে। ব্যাপারটা অগ্রহণযোগ্য বলেই রায় দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের ৩৭০(১) অনুচ্ছেদের অধীনে জম্মু ও কাশ্মীরের উপর সংবিধানের সমস্ত বিধানের প্রয়োগ বা সম্প্রসারণ বহাল রাখা হয়েছিল।
বিষয়টি বন্ধ নয়
যাই হোক, আসুন মেনে নিই যে, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা হয়েছে। তবে, এটা অস্বীকার করা যাবে না যে বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার ঘটনাটি জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করেছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিষয়টি ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলেই শেষ হয়ে যায়নি। অন্তর্ভুক্তির পর থেকেই যে জম্মু ও কাশ্মীর একটি ‘রাজ্য’ ছিল সেটি ৫ আগস্ট ‘দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত’ হয়ে গিয়েছে। এটি কি আদৌ অনুমোদনযোগ্য এবং আইনসঙ্গত? আবেদনকারীদের আর্জি ছিল যে, সুপ্রিম কোর্ট এই প্রশ্নটিও পরীক্ষা করে দেখুক। আদালত তা প্রত্যাখ্যান করেছে, এই যুক্তিতে যে, কেন্দ্রীয় সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের (লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটি বাদ দিয়ে) মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইচ্ছা পোষণ করে। এই আবেদন গ্রহণসহ আদালত আইনি প্রশ্নটি ‘উন্মুক্ত’ রেখেছিল। একইসঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের এক সময়সীমাও নির্ধারণ করে দিয়েছিল। সেখানে সত্যিই ভোট নেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু ‘জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা’ আজও পর্যন্ত ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। এটি নিঃসন্দেহে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের একটি দৃষ্টান্ত।
জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা ফেরানোর ব্যাপারটি পিছিয়ে যাওয়ার জন্য বিজেপি এবং এনডিএ সরকারই দায়ী। এই প্রশ্নে সমান দায়ী এনডিএ’র অন্যান্য দলগুলিও। কেননা, তারা কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিসভা এবং মন্ত্রী পরিষদের সদস্য।
ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) নির্বাচনে জিতে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীরে সরকার গঠন করেছে। এটা স্বাভাবিক যে ন্যাশনাল কনফারেন্স সরকার পরিচালনা করতে এবং জনগণকে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার দিতে চেয়েছিল, যা ২০১৭ সালের জুন থেকে অস্বীকার করা হয়েছিল। সম্ভবত, কৌশলগত কারণে ন্যাশনাল কনফারেন্স রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের বিষয়ে সোচ্চার ছিল না। রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের তীব্র দাবিই প্রত্যাশিত। কিন্তু তার বিস্ময়কর অনুপস্থিতি কেন্দ্রীয় সরকারকে এই ভরসা দিয়েছে যে রাজ্যের মর্যাদা অর্জন জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের কাছে কোনও অগ্রাধিকার নয়। বিপরীতে, রাজ্যের মর্যাদা প্রদানের প্রশ্নে বঞ্চনা কাশ্মীরি জনগণের মূল ক্ষোভ। রাজ্য সরকার যাই করুক না কেন, গত দশমাসে তারা যেভাবে কাজ করেছে, তাতে মনে হচ্ছে না যে এই সরকার জনগণের থেকে ‘শুভেচ্ছা’ বলে কিছু পেয়েছে। তাদের কৃতকর্মের কথা ভেবে দেখলে, ন্যাশনাল কনফারেন্স হয়তো বুঝতে পারে যে তারা রাজ্যের মর্যাদার পক্ষে সোচ্চার না-হয়ে কৌশলগত ভুলই করেছে।
পহেলগাঁও এবং রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধার
পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলা সবাইকে নাড়া দিয়েছে। আমি আগেই বলেছিলাম যে, পাকিস্তান থেকে অনুপ্রবেশ করা সন্ত্রাসবাদীদের পাশাপাশি ভারত-ভিত্তিক সন্ত্রাসীরাও রয়েছে। কে কোথায় আক্রমণ করে এবং দুটি দল সন্ত্রাসবাদী হামলায় সহযোগিতা করে কি না, তা ঘটনা এবং সুযোগের উপর নির্ভর করে। পহেলগাঁওয়ে এমন দু’জন ভারতীয়কে এনআইএ গ্রেপ্তার করেছে, যাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান-ভিত্তিক তিনজন সন্ত্রাসবাদীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে ছিল। অপারেশন সিন্দুরের পরে এবং গত ২৮-২৯ জুলাই একটি এনকাউন্টারে তিনজন বিদেশি সন্ত্রাসবাদীকে নির্মূল করার পরে, সরকার মনে হচ্ছে পহেলগাঁওয়ের উপর যবনিক টেনে দিয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তির ভাগ্যে কী আছে, সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরবতা লক্ষ করছি। তারা কি এখনও হেপাজতে আছে নাকি তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে? তাদের মামলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কি? পুরো ব্যাপারটাই একটি রহস্য।
কিন্তু মানুষ সবকথা মনে রাখে। তারা ভোলেনি যে, জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি আজও পূরণ হয়নি। প্রতিশ্রুতি পূরণের ব্যাপারে কিছু আবেদনকারীর আর্জি গ্রহণের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট তাদের মৌখিক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল যে, পহেলগাঁওয়ে যা ঘটেছিল তা উপেক্ষা করা যাবে না। এই পর্যবেক্ষণ জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণকে আরও হতাশ করতে পারে। পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত হয়েছে প্রায় আট সপ্তাহ পরে।
আমার মতে, সুপ্রিম কোর্টকে আইনি বিষয়টিতেই মনোযোগী হতে হবে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুর দোহাই দিয়ে আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার প্রদান এড়িয়ে যাওয়া অনুচিত। আইনি বিষয়টি শীর্ষ আদালতের সামনে স্পষ্টভাবেই উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিরত ছিল আদালত। ২০ মাসেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়নি। এখনই প্রতিশ্রুতি পূরণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা, নাকি বিদ্যমান আইনি বিষয়ে রায় প্রদান—এই দুটি পছন্দের মধ্যে একটি বেছে নেওয়া উচিত। আমি বিশ্বাস করি, সাংবিধানিক আদালত ন্যায়বিচার প্রদান করবে।

Advertisement

-লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। (মতামত ব্যক্তিগত)

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ