স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: ‘১৫ বছরের কিশোরের সঙ্গে ৮ বছরের নাবালিকার যৌনদৃশ্য...’, ছবির স্লটে যে কোনও কিশোর-নাবালিকার ছবি জুড়ে মিনিটের মধ্যে তৈরি অশ্লীল ভিডিও। নেটপাড়া, পর্ণসাইটে নিমিষে আপলোড হয়ে যাচ্ছে সেই ভিডিও। প্রতি মিনিটে হু-হু করে বাড়ছে ‘রিচ’। নেপথ্যের কারিগরের নাম— জেনেরেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (জিএআই) বা উৎপাদক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যার কোপে পড়ছে শৈশব-কৈশোর।
সোশ্যাল মিডিয়ায় টার্গেট নাবালক-নাবালিকাদের প্রোফাইল। প্রথমে বন্ধুত্বের টোপ। তারপর প্রোফাইলে থাকা সব ছবির ‘অনলাইন চুরি’। সোশ্যাল ট্রেন্ডে সদ্যজাত সন্তান এবং কৈশোরকালের ছবিও পোস্ট করেন অভিভাবকরা। সেখান থেকেও অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাচ্ছে নিষ্পাপ চেহারা। প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে খুদেদের মুখের ছবি হাতিয়ে তৈরি হচ্ছে যৌনদৃশ্য। প্রতিদিন ৯৯ হাজার এমন যৌনদৃশ্য বানাচ্ছে ডার্ক ওয়েবের অসাধু ব্যবসায়ীরা। যা মোট অঙ্কের টাকায় বিক্রি হচ্ছে পর্ণসাইটে। চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ করল ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিল্ড্রেন (এনসিএমইসি)। জিএআই ব্যবহার করে তৈরি হওয়ায় এই যৌনদৃশ্যগুলিকে বলা হচ্ছে চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউস মেটেরিয়াল বা শিশুদের যৌন হেনস্তাকারী উপাদান। অভিযোগ, এহেন অশ্লীল ভিডিও তৈরির আতুঁড় ঘর প্রতিবেশী বাংলাদেশ।
এনসিএমইসি জানিয়েছে, ২০২৪ সালে মোট ৭০ হাজার শিশুর অনলাইন যৌন হেনস্তার অভিযোগ আসে। যেখানে দেখা যায়, সবকটি ক্ষেত্রেই সেই শিশুর মুখাবয়ব ব্যবহার করে যৌনদৃশ্য বানানো হয়েছে। এরপরেই ২০২৫ সাল জুড়ে একটি সমীক্ষা চালায় সংস্থা। মূলত পর্ণসাইটগুলি থেকে তথ্য নেওয়া হয়। তাতে যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তাতে চোখ কপালে উঠে যায় আধিকারিক ও শিশুসুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের। এনসিএমইসির রিপোর্ট বলছে, প্রতিদিন ৯৯ হাজার শিশুর মুখাবয়ব ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ছবি বা ভিডিও তৈরি হচ্ছে না। সে সবগুলিকে ‘রিজেক্টেড’ হিসেবে চিহ্নিত করছে। বাকিগুলি বিক্রির চেষ্টা হচ্ছে পর্ণসাইটে। সেখানে বিক্রি না হলে পোস্ট করা হচ্ছে ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম গ্রুপে। যা ভাইরাল হলেই আসছে মোটা টাকা। সমীক্ষা বলছে, কৈশোরকালের যৌনাচারের দৃশ্যের সবচেয়ে বেশি দর্শক ওই বয়সেরই নেটিজেনরা।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শিশু-কিশোরদের ছবি চুরি হওয়ার মূল কারণ কী? সাইবার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মূল্য উদ্দেশ্য অসাধু প্রক্রিয়ায় টাকা রোজগার। কিশোর বয়সি নেটিজেনদের সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন সাইটে প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। যৌনদৃশ্যের ‘ট্রেলার’ দেখিয়ে টোপ দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। সেই ফাঁদে পা দিলে মোটা টাকার বিনিময়ে সরাসরি টেলিগ্রাম গ্রুপ থেকে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে জেনেরেটিভ এআই-তে তৈরি যৌনদৃশ্য। আবার, যাদের ছবি চুরি হচ্ছে, তাদের অভিভাবকদের সঙ্গেই যোগাযোগ করে ব্ল্যাকমেলের মাধ্যম টাকা হাতাচ্ছে কিছু প্রতারক। পাশাপাশি, পর্ণসাইটে ‘হাই-ডিমান্ড’ কিশোর যৌনতার ভিডিও বিক্রি তো চলছেই।
শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিল্ড্রেনের তরফে প্রায় ১০ কোটি ৫০ লক্ষ এমন যৌনদৃশ্য নেটপাড়া থেকে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, প্রতিদিন যে হারে মুখাবয়ব ব্যবহার করে যৌন হেনস্তাকারী উপাদান নেটিজেনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, তা আগামীদিনে নবপ্রজন্মের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে আতঙ্কিত শিশুসুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।