শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: জেলায় কিশোরীদের গর্ভধারণের হার আগের তুলনায় কমেছে। কিন্তু মাথা খারাপ করার মতো তথ্য মিলেছে চলতি বছরের তিন মাসে। এপ্রিল থেকে জুন— এই তিন মাসে উত্তর ২৪ পরগনায় ৯৮৬ জন কিশোরী গর্ভবতী হিসাবে নথিভুক্ত হয়েছেন। এক বছর আগে এই সময়ে সেই সংখ্যা ছিল ১,১৬০। জেলার গড় এক বছরে কিছুটা নিম্নমুখী হলেও পাঁচটি ব্লকে কিশোরীদের গর্ভধারণের হার ১০ শতাংশের বেশি। এই তালিকায় শীর্ষে দেগঙ্গা। এখানে তিন মাসে ১৬৭ জন কিশোরী গর্ভবতী হিসাবে নাম নথিভুক্ত করেছেন। বনগাঁয় এই সংখ্যা ১৬১।
দেগঙ্গার হাদিপুর-ঝিকড়ার মতো গ্রামীণ এলাকায় অল্প বয়সে বিয়ে, স্কুলছুট হওয়া, পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি— কিশোরীদের গর্ভধারণের পিছনে এই সামাজিক কারণগুলির ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। হাদিপুরের আশাকর্মী সোমা দাসের (নাম পরিবর্তিত) কথায়, এখনও অনেক পরিবারে মেয়েদের স্বাস্থ্য নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হয় না। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি বনগাঁ ব্লকে। সরকারি নথি অনুযায়ী, তিন মাসে ১,৩৭৯ জন নতুন গর্ভবতীর মধ্যে ১৬১ জনই কিশোরী। দেগঙ্গায় ১,৫৫৫ জন গর্ভবতীর মধ্যে ১৬৭ জন কিশোরী। বাগদাতে ৮৬৯ জনের মধ্যে ৮৮ জন, আমডাঙায় ৯৩৩ জনের মধ্যে ৯০ জন, এবং বারাসত ১ নম্বর ব্লকে ১,১৭৯ জনের মধ্যে ১০৪ জন কিশোরী। তবে স্বস্তির ছবি হাবড়ার দু’টি ব্লক ও গাইঘাটায়। আশাব্যঞ্জক ছবি ধরা পড়েছে বারাকপুর ২ নম্বর ব্লকে। এখানে ৬৯৮ জন গর্ভবতীর মধ্যে মাত্র ৩১ জন কিশোরী। আমডাঙার রাবিয়া খাতুন (নাম পরিবর্তিত) বলেন, মেয়ে পালিয়ে গিয়ে প্রেম করে বিয়ে করেছে। ওরা মুম্বইয়ে গিয়েছিল। এখন বাড়িতে ফিরেছে গর্ভবতী হয়ে। জামাই সোনার কারিগরের কাজ করে।
এনিয়ে বিশিষ্ট গাইনোকোলজিস্ট ডাঃ প্রজ্ঞা পারমিতা ঘোষ বলেন, সচেতনতার অভাব এর মূল কারণ। যে সব পরিবার কিশোরী অবস্থায় মেয়ের বিয়ে দিচ্ছে, পুলিশ বা প্রশাসনের উচিত এমন পরিবারের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা, তাহলেই মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হবে। আমাদের কাছে অনেক সময় সন্তানসম্ভবা কিশোরীরা আসে। তাদের কাছে জানতে চাই এর কারণ। অনেকেই বলে, পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিলাম। তার পরেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছি। এই প্রবণতা কমাতে হবে। সাইক্রিয়াটিস্ট ডাঃ হিরণ্ময় সাহার বক্তব্য, এটা সামাজিক ব্যাধি। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাপক প্রভাব ফেলছে কিশোর মনে। অনলাইনে বিভিন্ন তথ্য দেখে উৎসাহিত হয়ে অল্প বয়সে বিয়ে করছে তারা। সবার আগে পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে।
বনগাঁর বিডিও রত্নেশ গুপ্তার কথায়, আগের তুলনায় সংখ্যাটা কমেছে। ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে এই সংখ্যাকে কমিয়ে আনাই লক্ষ্য। এ নিয়ে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সভাধিপতি নারায়ণ গোস্বামী বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই, তবে উদ্বেগজনক। সরকারিভাবে এনিয়ে পদক্ষেপ করতে হবে। জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, সামগ্রিক ছবি ইতিবাচক হলেও আত্মতুষ্টির জায়গা নেই। কিশোরীদের স্কুলে ধরে রাখা, অল্প বয়সে বিয়ে আটকানো এবং পরিবারগুলিকে সচেতন করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।